হযরত মু'আবিয়া রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু : মুসলিম বিশ্বাসের পূণরুদ্ধারকারী
মূল: মোহতারামা আয়েশাহ বিউলী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
[Bengali translation of Aisha Bewley’s booklet ‘Mu’awiya: Restorer of the Muslim Faith]
সূচিপত্র
মুখবন্ধ
হযরত মু’আবিয়া (রা:)’এর প্রাথমিক জীবন
সিরিয়ার গভর্নর
ফিতনা (গৃহযুদ্ধ):
(ক) সিফফীনের যুদ্ধ
(খ) আল-হাসান ইবনে আলী (রা:)
সকল মুসলমানের খলীফা:
(ক) দাহা’ - রাজনৈতিক সূক্ষ্ম কৌশল
(খ) তাঁর সমসাময়িকদের অভিমত
হযরত মু’আবিয়া (রা:)’এর অর্জন:
(ক) সামরিক
(খ) রাজনৈতিক
পর্যবেক্ষণ:
(ক) বিজয় ও সম্প্রসারণের পরিসমাপ্তি
(খ) রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে দ্বীনের সম্পর্ক কর্তন
(গ) স্বৈরাচারী কেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ
(ঘ) ফেক্বাহ’র স্থান সম্রাটের অধীনে পরিণত
(ঙ) হযরত আলী (রা:)’এর বংশধর ও হাশেমীদের অবমাননাহীনতা
উপসংহার
মুখবন্ধ
বর্তমানকালে প্রাথমিক যুগের ইসলাম সম্পর্কে আমাদের ধারণা বিকৃত করা হয়েছে, যার চিত্র পরবর্তী মুসলিম প্রজন্মগুলোর চশমা দ্বারা আমাদের দেখতে হয়েছে; বিশেষ করে (কথিত) ‘স্বর্ণযুগের’ আব্বাসীয় শাসনামলের সোনালী মোড়ক যে চিত্র দেখতে আমাদের কিছুটা দৃষ্টিভ্রম ঘটিয়েছে। কেননা, আব্বাসীয় আমল ‘ইসলাম’কে প্রকৃতপক্ষে কঠিন বা (গতানুগতিক) ধ্যান-ধারণায় আবদ্ধ করে ফেলেছিলো; আর এটা অনেকাংশেই পারসিক প্রভাবের ফল ছিলো, যা পারসিকসমর্থিত আব্বাসীয় বংশের বিজয় ও মুসলমানদের রাজধানী ইরাক্বে স্থানান্তর দ্বারা অর্জিত হয়েছিলো।
বস্তুতঃ এই কঠিনতার একটি ফল ছিলো ‘ইসলামী’ সব বিষয়ের ‘ধর্মীয়করণ।’ উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়া শাসনামলে জামে’ মসজিদ সম্প্রদায়গত (সম্মিলিত) নামাযের পাশাপাশি একটি টাউনহলের মতো কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর ছিলো, যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদি ভীষণভাবে আলোচিত ও তর্কিত হতো এবং যেখানে নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো ঘোষণা করতেন। কিন্তু আব্বাসীয় আমলে এটা কেবল মাত্র নামায ও ধার্মিকতার স্থানে পরিণত হয়, যার দরুন ভিন্নমত পোষণের সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম অপসারিত হয়।
আমরা দেখতে পাই, আব্বাসীয় বংশ যে রীতি প্রচলন করেন তা ছিলো ইসলাম ধর্মের ব্যক্তিগতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় মঞ্জুরিপ্রাপ্ত ‘উলামা’দের একটি অফিসিয়াল ক্যাডার গঠন। আলেম-উলামা হয় শাসকবর্গের ধামা ধরেন, না হয় দৃঢ়ভাবে তাঁদেরকে অবহেলা করেন এবং এড়িয়ে চলেন; যার ফলশ্রুতিতে উলামাবৃন্দ নিজেদেরকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে অপসারণ করেন। ‘ধর্ম’কে ব্যক্তিগত ধার্মিকতায় একঘরে করা হয়।
এই ব্যবস্থাগত ক্রমাবনতিশীল পক্ষাঘাত বা উদ্যমহীনতার দরুন ইসলামের ইতিপূর্বেকার ধারাবাহিক সম্প্রসারণ ও বহির্মুখী অগ্রযাত্রা থমকে যায়। শক্তি (রাষ্ট্রের) অভ্যন্তরমুখী হয়। বস্তুতঃ ওই সময়েই সূফী তরীক্বাগুলোর স্ফূরণ ঘটে এবং ফলতঃ ইসলাম ধর্মের চলনের ও সম্প্রসারণের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায়, যতোক্ষণ না তুর্কী জাতি ইসলাম গ্রহণ বা ধারণ করেন এবং অগ্রযাত্রার সূচনা করেন।
বাস্তবতা হলো, আব্বাসীয় প্রচার-প্রপাগান্ডা উমাইয়া যুগ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভ্রম ঘটিয়েছে, আর তাই আমরা তাঁদের কীর্তিগুলো ভুলে গিয়েছি। দামেশকে নিজেদের ভিত্তি হওয়ায় তাঁরা ছিলেন ভূমধ্যসাগর-ওরিয়েন্টেড এবং অবশেষে ভূমধ্যসাগরকে তাঁরা একটি ‘মুসলমান হ্রদে’ পরিণত করেছিলেন। আর এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, উমাইয়া বংশের শেষ তরুণ-বংশধর আবদুর রহমান দাখিল, যিনি আব্বাসীয়দের হাত থেকে লোমহর্ষক রেহাই পান, তিনি-ই আন্দালুসীয় (স্পেনের) খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা উমাইয়াদের মাঝেই দেখতে পাই ইসলামের আলোকিত আদর্শ, আরব গণতান্ত্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বাইজেন্টাইন উত্তরাধিকারের ধারায় ইউরোপীয়/পশ্চিমা ব্যবস্থাসমূহের গলিত মিশ্রণ।
এই ব্যবস্থার মহান প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর সাহাবী হযরত মু’আবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (رضي الله عنه)। খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর শাহাদাতের পরে মুসলিম উম্মাহ’র অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নৈরাজ্য ও গৃহযুদ্ধে অবনতি ঘটে। বহির্দিকে সম্প্রসারণ মুখ থুবড়ে পড়ে। সব কিছুই স্থবির হয়ে যায়। মানুষেরা বহুধা বিভক্ত হন, যার অধিকাংশেরই ভিত্তি হয় প্রাচীন মৈত্রী ও বৈরিতা। পরিস্থিতি ছিলো সত্যি ভয়ানক।
এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আবির্ভূত হন রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর সাহাবী ও কাতেব (-এ-ওহী) এবং সম্মুন্দি হযরত মু’আবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (رضي الله عنه)। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর দৌহিত্র ইমাম হাসান ইবনে আলী (رضي الله عنه) যে বছর হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর বরাবর আপন খেলাফতের দাবি সমর্পণ করেন, তাকে বলা হয় ‘জামা’আ’র বছর’ তথা মুসলিম সমাজের ঐক্যের সাল - মুসলিম ঐক্য পুনরুদ্ধারের সাল।
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর মাঝে আমরা পাই এক পণ্ডিত রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক, যিনি এমন এক ব্যবস্থা চালু করেন যেটা কার্যশীল; স্থান ও কালের পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী যার মাধ্যমে ইসলাম নিজেকে প্রকাশ করেছিলো; যে ব্যবস্থায় নাগরিক কলহের পরিণতি ব্যতিরেকে ক্ষোভ বা নালিশ ব্যক্ত হতে পেরেছিলো। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ইসলাম ধর্ম সাফল্য ও সমৃদ্ধি লাভ করেছিলো ওই শাসনামলে।
আর এটা ছিলো প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর একটা মো’জেযা (অলৌকিক কর্ম) ও (সত্যতার) প্রমাণ, কেননা এতে ছিলো তাঁরই দুআ’ পূরণের বহিঃপ্রকাশ, যা তিনি হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর প্রতি করেছিলেন এই বলে:
” اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًّا وَاهْدِ بِهِ “.
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ, তাকে (সরল) পথপ্রদর্শক করুন, যে (নিজে ওই) পথ-প্রদর্শিত এবং তার মাধ্যমে অন্যদেরকেও পথের দিশা দিন! তাকে পথপ্রদর্শন করুন!” [ইমাম বুখারী কৃত ‘তারীখুল কবীর, ৫:২৪০ ও সহীহ তিরমিযী ৩:২৩৬]
হযরত মু’আবিয়া (রা:)’এর প্রাথমিক জীবন
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর পিতা হযরত আবূ সুফিয়ান ইবনে হার্ব এবং মাতা মোহতারামা হিন্দ (رضي الله عنهما)। এরই ফলশ্রুতিতে তিনি বনূ উমাইয়া গোত্রের একজন সদস্য হন; এই পরিবারটি মক্কা মোয়াযযমার নেতৃস্থানীয় বণিক পরিবারগুলোর একটি। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর প্রতি ওহী/ঐশী বাণী অবতীর্ণ হওয়ার পাঁচ বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বোন উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها) ইতিপূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং মক্কায় মুসলিম নিপীড়ন-নিগ্রহ এড়াতে নিজ স্বামীসহ আবিসিনিয়ায় (আফ্রিকায়) হিজরত করেছিলেন। তিনি পরে প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’কে বিয়ে করেন, আর তাই হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে কখনো কখনো ‘ঈমানদারবৃন্দের মামা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যদিও অধিকাংশ সূত্র বিবৃত করে যে তিনি মক্কা বিজয়ের আগে মুসলমান হন নি, তবু ইবনে সা’আদ প্রণীত ‘তাবাক্বাত’ গ্রন্থ অনুযায়ী তিনি মুসলমান হন হুদায়বিয়া’র সন্ধির বছর (জুন, ৬২৮ খৃষ্টাব্দ); তবে তিনি তাঁর পিতার কাছে এই তথ্য গোপন করে রেখেছিলেন। কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কায় ফিরতে পারবেন এবং অভিভাবকের অনুমতি ব্যতিরেকে মদীনায় বসতি স্থাপন করতে পারবেন মর্মে উক্ত সন্ধির শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর ধর্মান্তরের বিষয়টি সবাইকে জানানোর প্রয়োজন ছিলো না। মক্কা বিজিত হলে তাঁর পিতা, মাতা ও বড় ভাই এয়াযীদ (رضي الله عنهم) ইসলাম ক্ববূল করেন; আর তখনই তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন এবং প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) তাঁকে স্বাগত জানান।
হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) যদিও (ইতিপূর্বে) সে সব ক্বুরাইশ নেতৃবর্গের একজন ছিলেন যারা প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর বিরোধিতা করতো, তথাপিও আমরা দেখতে পাই তিনি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর যোগ্যতা এমন কী তাঁর ইসলাম ধর্ম ক্ববূলের আগেও স্বীকার করতেন; যেটা অন্যান্য ক্বুরাইশ নেতৃবর্গের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় নি; কেননা তারা বেশির ভাগ সময়ই নবী করীম (صلى الله عليه وسلم)’এর প্রতি গালাগাল করতো এবং তাঁকে হেয় করতো। একবার হযরত আবূ সুফিয়ান, স্ত্রী হিন্দ ও কিশোর পুত্র মু’আবিয়া (رضي الله عنهم) গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে দামেশক্ব সফরশেষে ফিরছিলেন; এমনি সময় প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর সাথে পথে তাঁদের দেখা হয়। হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) পুত্রকে বলেন, “নামো (সওয়ার থেকে) এবং মুহাম্মদ (صلى الله عليه وسلم)’কে চড়তে দাও।” হিন্দ (رضي الله عنها) চিৎকার করে বলেন, “তুমি কি তোমার পুত্রকে এই ধর্মত্যাগীর জন্যে সওয়ার থেকে নামাবে?” এমতাবস্থায় তিনি উত্তর দেন, “হ্যাঁ, তিনি তোমার, আমার ও তোমার পুত্রের চেয়েও শ্রেয়তর।” রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তাঁকে বলেন, “হে আবূ সুফিয়ান, মুসলমান হোন! আর হে হিন্দ্ আপনিও মুসলমান হোন! আর আমি আপনাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাযত করবো!” [আল-বালাযুরী]
আরেকটি ঘটনায় ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর ঘোর বিরোধী দুশমন আবূ জাহল নবী পাক (صلى الله عليه وسلم)’এর কন্যা হযরত মা ফাতিমা (رضي الله عنها)’কে একটা চড় মারে। তিনি হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’কে দেখতে পেয়ে তাঁর কাছে আবূ জাহল যা করেছে সে ব্যাপারে অভিযোগ দেন। তিনি মা ফাতিমা (رضي الله عنها)’কে সাথে নিয়ে আবূ জাহলের কাছে যান এবং হযরত ফাতিমা (رضي الله عنها)’কে বলেন, “তাকে পাল্টা চড় মারো, আল্লাহ যেনো তাকে বিশ্রী করে দেন!” এমতাবস্থায় মা ফাতিমা (رضي الله عنها) থাপ্পড় মারেন। আবূ জাহল চিৎকার করে বলে, “মানাফিয়্যা (আবদে মানাফ গোত্রীয়) প্রবল উদ্দীপনা কি আবূ সুফিয়ানের ওপর ভর করেছে?” অতঃপর মা ফাতিমা (رضي الله عنها) প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর কাছে যান এবং তাঁকে আবূ জাহল ও আবূ সুফিয়ানের মধ্যকার ওই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেন, “এয়া আল্লাহ, এর জন্যে আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’কে ভুলে যাবেন না!” [আল-বালাযুরী]
এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’এর ইসলামের প্রতি (ইতিপূর্বেকার) বিরোধিতা ছিলো তাঁরই পদমর্যাদা ও প্রতিপত্তি হারাবার শঙ্কা হতে নিঃসৃত; আর এটা আবূ জাহল ও আবূ লাহাবের মতো লোকদের ঐশী বাণীর প্রতি ঘোর বিরোধিতার অনুরূপ কিছু ছিলো না। তিনি নিশ্চিতভাবে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ও মুসলমানদের প্রতি সেসব অত্যাচার-অবমাননার কোনোটি-ই করেন নি, যা তাঁদের সবচেয়ে মন্দ বিরোধিতাকারীরা করেছিলো।
উমাইয়া গোত্রের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের ইঙ্গিত হয়তো পরিলক্ষিত হয় এই বাস্তবতার আলোকে যে, মহানবী (صلى الله عليه وسلم) যখন মক্কা জয় করেন, তখন তিনি আল্লাহর ঘর (কা’বা) ও হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’এর গৃহকে আশ্রয়স্থল হিসেবে সমান করে দেন, যা এক অতুলনীয় সম্মান বটে; আর এ কাজের দরুন হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’এর পদমর্যাদা হারাবার শঙ্কা প্রশমিত হয়। এই বিচক্ষণ বা কৌশলী কাজ দ্বারা রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’কে সম্মানিত করেন এবং ক্বুরাইশ গোত্রের ওপর তাঁর নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেন। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’এর আপন গুরুত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তিনি সেটাকে যথাবিহিত বিবেচনা প্রদান করেন। এটা আরো সম্ভাব্য ইঙ্গিত এই মর্মে যে, ক্বুরাইশদের শান্তিপূর্ণ আত্মসমর্পণে উৎসাহিত করার ব্যাপারে হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) কর্তৃক ইসলাম গ্রহণের পরবর্তীকালে হুনায়নের যুদ্ধে আমরা দেখতে পাই তিনি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর পাশে সুদৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, যখন অনেক মুসলমানই পশ্চাদপসরণ করেন। বনূ উমাইয়া যখন ইসলাম ক্ববূল করেন, তখন তাঁরা তা পুরোপুরি ক্ববূল করেছিলেন, আর তাঁরা সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ এটাই ছিলো অনেক সাহাবা কেরাম (رضي الله عنهم)’এর নীতি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (صلى الله عليه وسلم)’এর প্রতি তাঁদের পরবর্তীকালের অটল-অবিচল আনুগত্য/বিশ্বস্ততা ও ভক্তি/নিষ্ঠা তাঁদেরই ইতিপূর্বেকার ইসলাম-বিরোধিতাকে অপনোদন করেছিলো।
রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’কে দক্ষিণ-পশ্চিম আরবের নাজরান অঞ্চলের গর্ভনর বা প্রাদেশিক শাসনকর্তাও নিয়োগ করেছিলেন। একটি সূত্র বিবৃত করে যে, তাঁকে তা‘য়েফ নগরীর যাকাত তহবিলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তা’য়েফ অবরোধ করলে হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) সেই যুদ্ধে এক চোখ হারান; অতঃপর প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) তাঁকে বলেন, “এর বিনিময়ে বেহেশতে আপনাকে একটি চোখ (প্রদান করা) হবে।” হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) তা’য়েফ নগরীতে আল-লাত মূর্তি ধ্বংসে অংশ গ্রহণ করেন। একই প্রসঙ্গে তাঁর স্ত্রী হিন্দ (رضي الله عنها)-ও নিজ গৃহে একটি প্রতিমা ভেঙ্গে বলেন, “আমরা তোমাকে নিয়ে ছিলাম বিভ্রান্ত!”
হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) ইয়ারমুকের যুদ্ধে অপর চোখটি হারান। এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিলো ১৩ হিজরী/৬৩৪ খৃষ্টাব্দ সালে; এটা ছিলো মুসলমানদের জন্যে সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। বাইজেনটাইনীয় সম্রাট হেরাক্লিয়াস্ নিজের সেরা সেনাপতিদের অন্যতম সৈন্যাধ্যক্ষ থিওডোরের অধীনে ২,০০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনি প্রেরণ করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান আনুমানিক ২৪০০০ সৈন্যের মুসলমান বাহিনি। বাইজেন্টাইনীয় বাহিনি ছিলো প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল, রণ-অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ও পারসিক সাম্রাজ্যের ওপর সাম্প্রতিক বিজয়গর্বে উল্লসিত। পিছু না হটার জন্যে তারা নিজেদেরকে শেকলাবদ্ধ করেছিলো। মুসলমান অগ্রাভিযান রোধ করতে হেরাক্লিয়াস ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দুই মাস বিক্ষিপ্ত খণ্ডযুদ্ধের পর বাইজেন্টাইন বাহিনি অগ্রসর হয় এবং সমভূমিগুলো তাদের সংখ্যা দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) যদিও তখন বয়োবৃদ্ধ, তবুও তাঁকে দেখা যাচ্ছিলো সৈন্যদেরকে যুদ্ধের জন্যে সমবেত করতে এই উৎসাহ দিয়ে: “হে আল্লাহর বিজয়, আগমন করো!” হযরত হিন্দ্ (رضي الله عنها)-ও সেখানে ছিলেন। সেনাবাহিনির এক প্রান্তের অধিনায়ক ছিলেন এয়াযীদ ইবনে আবী সুফিয়ান (رضي الله عنه) এবং তাঁর সহ-অধিনায়ক ছিলেন হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)। এই তীব্র ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০০০ মুসলমান যোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করেন। কথিত আছে যে, এর বিপরীতে ৭০,০০০ হতে ১০০,০০০ বাইজেন্টাইনীয় গ্রীক সৈন্য নিহত হয়েছিলো, যার অধিকাংশই মুসলমান আক্রমণের প্রাবল্যে খাড়া গিরিধার হতে নিচে পড়ে মারা গিয়েছিলো। অতএব, ইসলামের প্রতি হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) ও তাঁর পরিবার-সদস্যবৃন্দের পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধতা আমরা এতে দেখতে পাই।
মক্কা বিজয়ের পরে প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) কপর্দকহীন অথচ উচ্চশিক্ষিত হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে তাঁর কাতেব তথা লেখকদের একজন হিসেবে কাজ করার জন্যে নিযুক্ত করেন। তাঁর কাজ ছিলো ওহী লিপিবদ্ধ করা এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর পক্ষে চিঠিপত্র লেখা। তাঁকে এ দায়িত্বে নিযুক্ত করা হতো না, যদি তিনি মহানবী (صلى الله عليه وسلم)’এর পূর্ণ আস্থাভাজন না হতেন। কখনো কখনো তাঁকে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর নানা কাজে পাঠানো হতো। নবী পাক (صلى الله عليه وسلم) তাঁর জন্যে দুআ’ করেন:
” اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًّا وَاهْدِ بِهِ “.
অর্থাৎ, “হে আল্লাহ, তাকে (সরল) পথপ্রদর্শক করুন, যে (নিজে ওই) পথ-প্রদর্শিত এবং তার মাধ্যমে অন্যদেরকেও পথের দিশা দিন! তাকে পথপ্রদর্শন করুন!” [ইমাম বুখারী কৃত ‘তারীখুল কবীর, ৫:২৪০ ও সহীহ তিরমিযী ৩:২৩৬]
প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) আরো দুআ’ করেন:
حدثنا أبو المغيرة ، ثنا صفوان قال : حدثني شريح بن عبيد أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – دعا لمعاوية بن أبي سفيان: ( اللهم علمه الكتاب والحساب وقه العذاب ) .
অর্থ: হে আল্লাহ, তাকে (মু’আবিয়াকে) ক্বুরআন ও (বিচার দিবসের) হিসাব (সম্পর্কে) শিক্ষা দিন এবং (ওই দিনের) শাস্তি থেকে রক্ষা করুন! [ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রচিত ‘ফাযায়েলে সাহা’বা’, ‘ফাযায়েলে মু’আবিয়া’ অধ্যায়, হাদীস নং ১৭৪৯]
আরেকটি দুআ’য় তিনি বলেন:
“এয়া আল্লাহ, তাকে (মু’আবিয়াকে) ক্বুরআনের জ্ঞান শিক্ষা দিন এবং রাজ্যসমূহের নেতৃত্ব দান করুন।” [আল-তাবারানী]
হযরত উরওয়াহ ইবনে আল-যুবায়র (رحمة اللّٰه عليه) তাঁর পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত মা আয়েশাহ (رضي الله عنها) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর কাছে যাই, যিনি তখন হযরত উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها)’এর ঘরে অবস্থান করছিলেন তাঁরই (জন্যে বরাদ্দ) দিনে। মু’আবিয়া (رضي الله عنه) দরজায় টোকা দিলে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তাঁকে ঘরে ঢোকার অনুমতি দেন, আর তিনি ঘরে প্রবেশ করেন। তাঁর কানের পেছনে একটি কলম ছিলো, যা ছিলো অব্যবহৃত। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) জিজ্ঞেস করেন, “তোমার কানের ওপরে ওটা কী?” তিনি উত্তর দেন, “একটি কলম যা আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (صلى الله عليه وسلم)’এর জন্যে প্রস্তুত রেখেছি।” এমতাবস্থায় মহানবী (صلى الله عليه وسلم) ফরমান: আল্লাহ যেনো তোমাকে তাঁরই রাসূলের খাতিরে উত্তম প্রতিদান মঞ্জুর করেন। আল্লাহর কসম, আমি শুধু আসমানী ওহী লিপিবদ্ধ করার জন্যে তোমার প্রতি আদেশ করবো” [আল-বালাযুরী]। এই হাদীসটি সেসব লোকের দাবিকে সমূলে উৎপাটিত করে, যারা দাবি করে যে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে শুধু বিভিন্ন গোত্রের কাছে চিঠিপত্র লেখার জন্যে নিয়োগ করা হয়েছিলো। গভর্নর ও পরে খলীফার দায়িত্ব পালনকালে তাঁর পরবর্তী খুতবাগুলোতে তিনি প্রচুর ক্বুরআনের আয়াত ব্যবহার করতেন বলে সর্বজনবিদিত ছিলো, যা ওই সময়কার সরকারে জড়িতদের জন্যে অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো।
আরেক বার প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) হযরত উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها)’এর ঘরে গেলে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে তাঁর বোনের সাথে দেখতে পান। তিনি হযরত উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها)’কে জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর ভাইকে ভালোবাসেন কি না। হযরত উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها) ভালোবাসেন বলে জানালে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) ফরমান: “নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মু’আবিয়াকে ভালোবাসেন।” [আল-তাবারানী]
আরেকটি ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে হাদরামাওত (ইয়েমেন) অঞ্চলের এক বড় সরদারের সাথে সঙ্গি হিসেবে প্রেরণ করেন। দিনটি ছিলো তীব্র গরমের; এমতাবস্থায় তারুণ্যময় হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) সরদারকে তাঁর উটের পেছনে চড়তে দিতে অনুরোধ করেন, যাতে তপ্ত বালুতে তাঁর পা না পোড়ে। কিন্তু ওই অনুরোধ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর তিনি অনুরোধ করেন যেনো সরদারের চপ্পল জোড়ার অন্তত একটি তাঁকে দেয়া হয়, কিন্তু তাঁকে বলা হয়, “তোমার মতো খালি পায়ের মানুষের জন্যে আমার উটের ছায়াতে হাঁটাই যথেষ্ট সম্মান।” হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) যখন খলীফা হন, ওই একই সরদার তখন নিজের কোনো আরজি পূরণের উদ্দেশ্যে দামেশকে তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। খলীফা অনতিবিলম্বে তাঁর আরজি মঞ্জুর করেন, ইতিপূর্বেকার ঘটনা উল্লেখ না করেই।
প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর অযূর পানি আনার কাজও করতেন হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)। এই সেবা করার সূত্রেই তিনি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর জামা লাভ করেছিলেন, যে জামাসহ তিনি বেসালের পরে দাফন হন। তিনি বর্ণনা করেন, “আমি প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর জন্যে অযূর পানি আনতাম। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাকে একটি জামা দ্বারা বস্ত্রাচ্ছাদিত করবো না?’ আমি উত্তরে বলি, ‘জি, অবশ্যই, আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্যে ক্বুরবান হোন!’ অতঃপর নবী করীম (صلى الله عليه وسلم) নিজের পরনের জামা খুলে তা আমার গায়ে পরিয়ে দেন।” হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) ওই জামা নিজের দাফনের জন্যে সংরক্ষণ করেন।
হযরত আবূ হুরায়রাহ (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন যে একবার তিনি প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর দরবারে উপস্থিত হন, যখন রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর পবিত্র দু হাতে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) অযূর পানি ঢালছিলেন। অযূ শেষে তিনি তাঁর মোবারক দু হাত পানিতে পূর্ণ করে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর মুখমণ্ডলে ছিটিয়ে দেন এবং এরপর বলেন, “ওহে আবূ সুফিয়ানের পুত্র! আমি যেনো তোমাকে বেহেশতের বাগানে দেখতে পাচ্ছি।”
হযরত আবূ হুরাইরাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (صلى الله عليه وسلم) এরশাদ ফরমান: “জিবরীল (عليه السلام) আমার কাছে এসে বলেছেন, ‘হে রাসূল, আল্লাহতা’লা আমাকে তাঁর ওহী/ঐশীবাণী হেফাযতের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন আপনারই হেফাযত দ্বারা, এবং মু’আবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ানের হেফাযত দ্বারা’।”
মহানবী (صلى الله عليه وسلم) যে আস্থা হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর প্রতি স্থাপন করেছিলেন, তা প্রতীয়মান হয় আরেকটি ঘটনায়, যা সর্ব-ইমাম তাবারানী ও আল-বাযযার কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। কোনো এক সুনির্দিষ্ট বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) সর্ব-হযরত আবূ বকর ও উমর (رضي اللّٰه عنهما)’এর সাথে পরামর্শ করছিলেন, কিন্তু তাঁরা কোনো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় হুযূর পূর নূর (صلى الله عليه وسلم) হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে ডেকে পাঠান এ কথা বলে: “তোমাদের বিষয়াদিতে মু’আবিয়ার সাথে পরামর্শ কোরো, কেননা সে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য।”
হযরত জা’ফর ইবনে আবী তালেব (رضي الله عنه) প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’কে চারটি নাশপাতি (-জাতীয় ফল) দিয়েছিলেন; আর হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে দিয়েছিলেন তিনটি এই কথা বলে, “এগুলো জান্নাতে আমাকে দেবেন।”
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) নিজের যৌবন সম্পর্কে বলেন, “আমার যৌবনকাল ছিলো রোমাঞ্চকর, কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমি এড়িয়ে চলেছি ঝগড়া-বিবাদ, লাম্পট্য ও মন্দ ভাষার প্রয়োগ।” তিনি মদ হারাম হওয়ার আগে থেকেই তা এড়িয়ে চলতেন। আর সঙ্গীত শুনতেও তেমন আগ্রহী ছিলেন না সেটার বাজে পরিবেশে শ্রুত হওয়ার কারণে। ওই যুগে গান-বাজনা বেশ্যা ও মদ্যপানসহ শোনা হতো। তাঁর চরিত্রের প্রতি এতদসংক্রান্ত কোনো নিন্দারোপ কখনোই হয় নি, এমন কী তাঁর শত্রুদের তরফ থেকেও না। বরঞ্চ তাঁর শত্রুদেরকে (এ ব্যাপারে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর প্রশংসা করতে হয়েছে।
হযরত আবূ বকর (رضي الله عنه)’এর খেলাফত আমলে সিরিয়া জয়ের জন্যে চারটি বাহিনি প্রেরণ করা হয়েছিলো। সেগুলোর একটির নেতৃত্বে ছিলেন হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর ভাই এয়াযীদ ইবনে আবী সুফিয়ান (رضي الله عنه)। আর সহ-অধিনায়ক ছিলেন হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)। হযরত এয়াযীদ (رضي الله عنه) তাঁর ভাইয়ের হাতে পতাকা তুলে দেন, যা হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) মুসলিম বাহিনির অগ্রভাগে বহন করেন। অধিকন্তু, ইয়ারমুকের যুদ্ধে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) সামগ্রিক লড়াইয়ে নিজের পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য মেলে ধরেন এবং দীপ্তিমান সামরিক কৌশলবিদ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে কায়সারিয়া, ত্রিপোলী ও অন্যান্য শহর জয় করে নেন।
সিরিয়ার গভর্নর
খলীফা হযরত আবূ বকর (رضي الله عنه)’এর বেসাল (পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলিত) হওয়ার পরে মনোনীত খলীফা হযরত উমর (رضي الله عنه) হযরত এয়াযীদ ইবনে আবী সুফিয়ান (رضي الله عنه)’কে সিরিয়া অঞ্চলের কর্তৃত্ব দান করেন। অতঃপর ১৮ হিজরী মোতাবেক ৬৩৯ খৃষ্টাব্দে হযরত এয়াযীদ (رضي الله عنه)’এর বেসাল হলে খলীফা উমর (رضي الله عنه) হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে সিরিয়া ও এর আওতাধীন প্রদেশসমূহের কর্তৃত্ব দান করেন। খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর খেলাফত আমলেও তিনি সিরিয়ার গর্ভনর পদে বহাল থাকেন। ইতিপূর্বে খলীফা উমর (رضي الله عنه) দু জন সাহাবীকে নামাযের ইমাম ও কাজী পদে নিয়োগ করেছিলেন। হযরত আবূদ্ দার্দা (رضي الله عنه) ছিলেন দামেশক্বে কাজী ও ইমাম, আর হযরত উবাদা ইবনে সামিত (رضي الله عنه) ছিলেন হোমস্ ও ক্বিন্নাসরিন এলাকায় একই পদে আসীন।
উমাইয়াবৃন্দ ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে সিরিয়ার সাথে ইতিপূর্বেই সম্পৃক্ত ছিলেন এবং হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه) ছিলেন দামেশক্বের সন্নিকটে একটি খামারের মালিক। এমতাবস্থায় তাঁরাই সেখানকার শাসনের জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন। সিরিয়ার সাথে তাঁদের পূর্ববর্তীকাল হতে চলে আসা বাণিজ্যের সূত্রে তাঁরা ইতোমধ্যেই বিদ্যমান বাইজেন্টাইনীয় অবকাঠামোর সাথে সুপরিচিত হয়েছিলেন; আর তাঁরা জানতেন কীভাবে স্থানীয় নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়ার জন্যে দরবার করতে হয়। আরেক কথায়, তাঁরা এতদসংক্রান্ত সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ছিলেন। সিরিয়া ও বিশৃঙ্খল ইরাক্বের মধ্যকার পরিস্থিতিগত অতীব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিলো নেতৃত্বের প্রতি স্থানীয় সর্বসাধারণের সহযোগিতা ও আনুগত্য। তদানীন্তন ইরাক্বে বিরাজমান টালমাটাল পরিস্থিতি, বিশেষ করে কুফায় বিদ্যমান অবিরত অশান্তির জন্যে অনেকগুলো কারণ দায়ী ছিলো, কিন্তু এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সিরীয় জনগণের মন জয় করা হয়েছিলো। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পরে সিরীয় নগরীগুলো আত্মসমর্পণমূলক চুক্তির শর্তে জয় করা হয়, সামরিক আক্রমণ দ্বারা নয়।
সিরিয়ার (ভৌগোলিক) অবস্থান ছিলো গুরুত্ববহ, কেননা এটা ছিলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) যখন সর্বপ্রথম আরব উপদ্বীপ হতে দূরবর্তী অঞ্চলে সামরিক অভিযানে সেনা প্রেরণ করেন, তা ছিলো সিরিয়া অভিমুখী, ইরাক্ব অভিমুখী নয়। তিনি দুআ’র মধ্যে আরজ করতেন - اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا - “হে আল্লাহ, আমাদের শা’ম দেশে বরকত/আশীর্বাদ দিন।” অসংখ্য হাদীস শরীফে শা’ম অঞ্চলের খায়র-বরকত ও গুরুত্বের প্রতি সাক্ষ্য বিদ্যমান [শা’ম হচ্ছে বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্দান ও ফিলিস্তিনের সমষ্টি]। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) একজন সাহাবী (রা:)’কে বলেন:
عَلَيْكَ بِالشَّامِ فَإِنَّهَا خِيَرَةُ اللَّهِ مِنْ أَرْضِهِ يَجْتَبِي إِلَيْهَا خِيَرَتَهُ مِنْ عِبَادِهِ ... فَإِنَّ اللَّهَ تَوَكَّلَ لِي بِالشَّامِ وَأَهْلِهِ
“সিরিয়া গমন করো, কেননা এটা আল্লাহতা’লার পছন্দকৃত রাজ্য, যেখানে তাঁর সেরা বান্দাদেরকে সমাবিষ্ট করা হবে….আল্লাহতা’লা আমার ওয়াস্তে সিরিয়া ও তার জনসাধারণের ভার বিশেষভাবে গ্রহণ করেছেন” [আবূ দাউদ ও ইবনে হাম্বল]।
সিরিয়া নিশ্চয় একটা বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে; আর এটা একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে পয়গাম্বর ইবরাহীম (عليه السلام) বসতি স্থাপন করেছিলেন; আর এখান থেকেই শেষ বিচার দিবসে চূড়ান্ত সমাবেশের জন্যে মানুষকে পরিচালিত করা হবে। আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এরশাদ ফরমান: “যখন সিরিয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, তখন আর আমার উম্মতের মাঝে ভালো কিছু থাকবে না।”
সিরিয়া রাজ্যের কৌশলগত গুরুত্ব ছিলো ব্যাপক। ইসলাম ধর্মের অগ্রযাত্রা যদি পশ্চিম দিকে হতে হতো, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)‘এর কাজে ইঙ্গিত করা হয়েছিলো, তাহলে সিরিয়ার গুরুত্ব ছিলো অত্যাবশ্যক। ইরাক্ব ছিলো গুরুত্বপূর্ণ কেবল পূর্বদিকে অভিযানের ক্ষেত্রে। প্রাথমিকভাবে সর্ব-হযরত আবূ বকর ও উমর (رضي الله عنهما)’এর খেলাফত আমলে তাঁরা পশ্চিম দিকের বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধার আগে পূর্বদিকে অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে অনিচ্ছুক বা গররাজি ছিলেন। বস্তুতঃ পূর্ব দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন আরবের পূর্বদিকের অংশে বসবাসকারী মানুষ, মদীনা মনোওয়ারায় অবস্থানকারী খলীফা নন।
সিরিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব ও অবস্থানের আরেকটি ইঙ্গিত ছিলো এই যে, প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর বেসাল শরীফের পরে হযরত খলীফা আবূ বকর (رضي الله عنه)’এর শাসনকালে যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী বিদ্রোহী রিদ্দাহ গোত্রীয় লোকদের কাউকেই সিরিয়া বিজয়ে অংশগ্রহণ, বা সেখানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়নি। কেবল একটি রিদ্দা দলকে একবার পাঠানো হয়েছিলো, কিন্তু পরে তাদেরকে ইরাক্বে পাঠানো হয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষাব্যূহ রচনা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, আর তাই কিছুটা সন্দেহভাজন রিদ্দাহ গোত্রীয়দের তা থেকে নিবারণ করা হয়েছিলো। সর্ব-হযরত আবূ বকর ও উমর (رضي الله عنهما) কর্তৃক সিরীয়দের সাথে সমঝোতার জন্যে হযরত আবূ সুফিয়ান (رضي الله عنه)’এর সামর্থ্যবান পুত্রদেরকে বেছে নেয়ার পেছনে এটাও একটা আংশিক কারণ ছিলো বটে। কেননা বাইজেন্টাইন রাষ্ট্র সর্বদা মুসলমানদের দুর্বলতা খুঁজে বেড়াচ্ছিলো।
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর সক্ষম ও দক্ষ গর্ভনর হিসেবে বিশ বছরের শাসনামলে সিরিয়া একটি অনুসরণীয় মডেল প্রদেশে পরিণত হয়; আর তাঁকে প্রদত্ত - “তুমি যখন শাসন করবে, তখন ভালোভাবে তা করবে” - প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর এ উপদেশটি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারের ব্যাপারে নীতিপরায়ণ এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রতি উদার ও ন্যায়বান। যোগ্যতাসম্পন্ন ও প্রতিভাবান মানুষদের তিনি সম্মান করতেন এবং তাঁদের গোত্রীয় পরিচয় নির্বিশেষে আপন আপন প্রতিভা বিকাশে তিনি সহায়তা করতেন। তিনি অজ্ঞ লোকদের হঠকারিতার প্রতি অসীম ধৈর্য-সহ্য প্রদর্শন করতেন এবং অসহায়দের প্রতি ছিলেন মহা উদার। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধিবিধান প্রয়োগে তিনি ছিলেন দৃঢ়, করুণাশীল ও নিরলস। মানুষের জামাআতে নামায আদায়ে তিনি ইমামতি করতেন এবং তাঁদেরকে (খুতবায়) দিকনিদের্শনা প্রদান করতেন। তিনি তাঁদেরকে জ্বেহাদেও নেতৃত্ব দিতেন। সংক্ষেপে, তিনি নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ ও অনুকরণীয় মডেল শাসক হিসেবে প্রমাণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) ব্যক্ত করেন তিনি শাসনের জন্যে উপযুক্ত হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর মতো আর কাউকেই দেখেন নি।
আয্ যুহরী বলেন: “হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) দুই বছর (সিরিয়ায়) সেভাবে শাসন করেন, যেমনিভাবে খলীফা উমর (رضي الله عنه) তা (নিয়োগ) পরিবর্তন না করতে সিদ্ধান্ত নেন।” হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) নিজেই বলেছেন যে তিনি সর্ব-হযরত আবূ বকর ও উমর (رضي الله عنهما)’এর আচার-আচরণ অনুসরণে সর্বাত্মক করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন বুঝতে পারেন যে সিরিয়ার পরিবেশ ও পরিস্থিতি মদীনার পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে ভিন্নতর, আর সেখানে বিরাজমান সংস্কৃতি ও জনগণও আলাদা, তখন তিনি সেই অনুযায়ী শাসনের ধরনেও পরিবর্তন আনেন। তিনি নিজেই এই ওজর ব্যবহার করেছিলেন যখন খলীফা উমর (رضي الله عنه) ১৮ হিজরী সালে সিরিয়া সফরে আসেন; তিনি অনেক লোকলস্কর নিয়ে খলীফার সাথে দেখা করেন। খলীফা এটা অপছন্দ করলে আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) অজুহাত দেখিয়ে বলেন, “আমরা এমন এক দেশে আছি যেখানে অনেক শত্রু গুপ্তচর রয়েছে। আমাদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের শক্তিমত্তা প্রদর্শিত হয় এমন ক্ষমতা দেখাতে হবে। তা দ্বারা আমরা তাদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলবো।” খলীফা উমর (رضي الله عنه) এই উত্তরে সন্তুষ্ট হন।
মহানবী (صلى الله عليه وسلم)’এর মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল হাবাশী (رضي الله عنه) বিজয়ী বাহিনির সাথে সিরিয়ায় আগমন করেছিলেন এবং বসতি স্থাপন করেছিলেন। খলীফা হযরত উমর (رضي الله عنه) সিরিয়া সফরশেষে বিদায় নেয়ার সময় দামেশকবাসী তাঁর প্রতি আবেদন করেন যেনো হযরত বেলাল (رضي الله عنه) আরেকবার আযান দেন। তিনি সম্মত হন এবং দামেশক্বের মসজিদে হযরত বেলাল (رضي الله عنه) আযান দেন। প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)’এর বেসাল শরীফের পরে এই একবারই তিনি আযান দিয়েছিলেন। এতে মহা কান্নার রোল পড়ে যায়।
এই আড়ম্বরের মানে এ নয় যে, হযরত আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) নিজের সম্পদ দ্বারা বাইজেন্টাইনদের চমৎকৃত করার অজুহাতের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়েছিলেন। আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে দেখা যেতো দামেশক্বীয় মসজিদের মিম্বরে জোড়াতালি দেয়া জামা পরে খুতবা দিতে। ইউনুস ইবনে মায়সার আল-হিমইয়ারী আয-যাহেদ বলেন: “আমি দেখেছি আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে দামেশক্বের বাজারে সওয়ারে চড়ে আসতে; তাঁর সওয়ারের পেছনে তাঁরই সেবক/গোলাম উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর পরনে ছিলো একটা জামা, যেটার পকেট ছিলো জোড়াতালি দেয়া। সে সময় তিনি দামেশক্বের বাজারে এসেছিলেন।”
আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসেবে রাজ্য পরিচালনা কালে সিরীয় বাহিনি একটি প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি বিভিন্ন গোত্র হতে সেরা নেতৃবৃন্দকে বেছে নেন। সৈন্যদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও অস্ত্রশস্ত্র-সরঞ্জামাদি নিশ্চিতকরণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করেন; তাঁদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেন, আর কর্তব্যরত অবস্থায় নিয়মিত তাঁদের বেতন পরিশোধ করেন। প্রতি বছর বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে একটি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তিনি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করেন; আর বাইজেন্টাইনদেরকে অবিরাম অস্বস্তিতে রেখে তিনি উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তও নিরাপদ রাখেন। তিনি ১৯ হিজরী সালে ক্বায়সারিয়্যা জয় করেন, যা (পতনের আগে) সাত বছর ধরে প্রতিরোধ গড়েছিলো।
মুসলমান নৌবাহিনি গড়ার ক্ষেত্রে আমীরে মু’আবিয়া বহুলাংশে দায়ী ছিলেন; কেননা অ-সমুদ্রগামী এক জাতির দ্বারা সমুদ্র অভিযানের ধারণাটির ব্যাপারে প্রথমাবস্থায় বড় ধরনের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো তাঁকে। তিনি (ওই বাধা পেরিয়ে) ২৮ হিজরী সালে রোডস্ ও ২৯ সালে সাইপ্রাস জয় করেন। তাঁর স্ত্রী কাতওয়া (رضي الله عنها)-ও সাথে ছিলেন, তবে অভিযান চলাকালে তিনি ইন্তেক্বাল করেন। মুসলমানদের ভূ-মধ্যসাগর জলযাত্রার এটাই ছিলো প্রথমবার। এই ধরনের নৌ-অভিযানের অনুমতি তিনি খলীফা উমর (رضي الله عنه)’এর কাছে একবার এবং খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর কাছে দু বার চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বারের সময় খলীফা উসমান (رضي الله عنه) বলেন, “তুমি যদি তোমার স্ত্রীসহ (সমুদ্র) পাড়ি দাও, তাহলে আমরা তোমাকে তা করার অনুমতি দিতে পারি।” এমতাবস্থায় তিনি স্ত্রীসহ অনেকগুলো জাহাজ নিয়ে নৌ-অভিযান পরিচালনা করেন। হযরত উবাদা ইবনে সামিত (رضي الله عنه)-ও তাঁর স্ত্রী হযরত উম্মে হারাম (رضي الله عنها)’কে সাথে নিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) আগাম এক স্বপ্নে দেখেছিলেন, যার বর্ণনা তিনি দেন এভাবে: “আমার উম্মতের কিছু মানুষ আল্লাহর পথে (জ্বিহাদে) সবুজ সাগরের ওপরে যেনো রাজ সিংহাসনে বসে জলযাত্রা করছে।” অতঃপর সাইপ্রাসের অধিবাসীবর্গ সন্ধিচুক্তির ভিত্তিতে আত্মসমর্পণ করেন।
সাইপ্রাস ৩২ হিজরী সালে চুক্তি ভঙ্গ করে বাইজেন্টাইনদের সাহায্য করে। এমতাবস্থায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) পরবর্তী বছর ৫০০ জাহাজসহ দ্বীপটি আক্রমণ করেন এবং তা জয় করে নেন। তিনি সেখানে সেনা (ঘঁটি) স্থাপন করেন এবং মসজিদসমূহ নির্মাণ করেন। দ্বীপের সমুদ্র সৈকতঘেঁষে কিছু নির্দিষ্ট কারিগর ও কাঠমিস্ত্রিকে তিনি বসতি স্থাপন করতে আদেশ দেন, যাতে জাহাজগুলো সহজে মেরামত করা যায়।
সিরীয় সেনাবাহিনী এতো অনুগত ছিলো যে, হযরতে ইমামে আলী ইবনে আবী তালেব (رضي الله عنه) তাঁদের সম্পর্কে বলেন, “সিরীয় বাহিনি বেতন দাবি না করেই (যুদ্ধের) ময়দানে গমন করে; বছরে কেবল দু বার বা তিনবার নয়, বরঞ্চ তাদের নেতৃবৃন্দের সন্তুষ্টি যখনই হয়, তখনই তারা তাতে গমন করে।” ফলশ্রুতিতে বিজয়াভিযান বেগবান হয় এবং উত্তর দিকে দূর-দূরান্তে তা ছড়িয়ে পড়ে।
আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর সুশাসন সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া উল্লেখ করেন যে ইসলামের পরবর্তী শাসকদের কেউই হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) হতে শ্রেয়তর ছিলেন না। তাবেঈনদের অনেককেই তাঁর ন্যায়বিচার ও সদ্ব্যবহারের উচ্চসিত প্রশংসায় উদ্ধৃত করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বিবৃত করেন যে হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) একজন ফক্বীহ (তথা ধর্মীয় বিধান-শাস্ত্রজ্ঞ) ছিলেন। আর তিনি ছিলেন সঠিকপথপ্রাপ্ত খলীফাদের অধীনে একমাত্র গভর্নর, যাঁকে কখনোই পদ হতে অব্যাহতি দেয়া হয় নি। তিনি ছিলেন সর্ব-হযরত আবূ বকর, উমর, উসমান ও তাঁর বোন উম্মে হাবীবা (رضي الله عنهم) হতে হাদীস বর্ণনাকারী। অন্যান্য সাহাবা (رضي الله عنهم)’বৃন্দ তাঁর কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন; এঁদের মধ্যে ছিলেন সর্ব-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মু’আবিয়া ইবনে হুদায়জ, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র, মারওয়ান ইবনে হাকাম, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব প্রমুখ (رضي الله عنهم)।
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন তাঁরই হিলম্ তথা ধৈর্য-সহ্যের জন্যে; একদম প্রয়োজন ছাড়া নিজ শক্তি প্রয়োগ তিনি করতেন না। তিনি এ সম্পর্কে বলেন, “আমি আমার তরবারি ব্যবহার করি না যেখানে আমার বেতই যথেষ্ট; আর বেতও ব্যবহার করি না যেখানে আমার জিহ্বা যথেষ্ট; আমার সাথে আমার দলের লোকদের বন্ধন যদি একটি চুলের ওপরও থাকে, আমি তা ছিন্ন হতে দেই না। তারা যদি টানে আমি ঢিল দেই, আর তারা ঢিল দিলে আমি টানি।”
ফলশ্রুতিতে সিরিয়া পরিণত হয়েছিলো শান্তিপূর্ণ, অনুগত ও (মুসলিম) সংহতিশীল একটি রাজ্যে ঠিক ওই সময়, যখন মুসলিম উম্মাহর মাঝে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও বিনাশী আত্মবিরোধ মদীনায় কেন্দ্রীভূত হয়।
ফিতনা (গৃহযুদ্ধ)
মুসলিম উম্মাহ’র প্রতি সবচেয়ে বড় আঘাতদায়ক ঘটনা হলো ৩৫ হিজরী সালে উদ্ভূত মহা-ফিতনা (গৃহযুদ্ধ), যার ফলশ্রুতিতে খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর শাহাদাত হয় এবং পরবর্তীকালেও যুদ্ধবিগ্রহ চলে; তা কিছু বিশ্লেষণের দাবিদার। এটা মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করে এবং অদ্যাবধিও আমাদের মাঝে বেদনাদায়ক প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে চলেছে মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে বিভক্তির সূত্রপাতের কারণে।
খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর খেলাফত আমলের মধ্যভাগে মুসলিম উম্মাহ’র অভ্যন্তরে যা ঘটছিলো তা হলো, মদীনায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছিলো এবং প্রদেশগুলো, বিশেষ করে ইরাক্ব ও মিসর, আমিরুল মো’মেনীন হতে স্বাধীন হবার প্রবণতা প্রদর্শন করছিলো। হযরত ইমামে আলী (رضي الله عنه) ইতোমধ্যেই ঘটমান এই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করেছিলেন; আর হযরত উমর (رضي الله عنه)’এর শাহাদাতের পরে খলীফা নির্বাচনের ‘শূরা’ তথা কাউন্সিলে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন যতোক্ষণ না তাঁকে কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়, যে ক্ষমতা প্রথম দুই খলীফা (رضي الله عنهما)’এর সীমিত ক্ষমতার চেয়েও বেশি। হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (رضي الله عنه) হযরত আলী (كرم الله وجهه)’কে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর সুন্নাত এবং সর্ব-খলীফা আবূ বকর ও উমর (رضي الله عنهما)’এর আচরিত রীতি অনুসারে শাসন করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ?” তিনি উত্তরে বলেন, “আমি আশা করি তা-ই করবো। আমার জ্ঞান ও সামর্থ্য অনুসারে শাসন করবো।” তিনি আরো বলেন তিনি আপন ইজতিহাদ (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) প্রয়োগ করবেন। হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (رضي الله عنه) একই প্রশ্ন যখন হয়রত উসমান (رضي الله عنه)’কে করেন, তখন তিনি কোনো অপরিহার্য শর্তারোপ ছাড়াই উত্তর দেন তিনি তা পালন করবেন। এমতাবস্থায় আনুগত্যের শপথ তাঁরই প্রতি উচ্চারণ করা হয়। বিরাজমান পরিস্থিতিতে নিহিত বিপদ সম্পর্কে হযরত আলী (كرم الله وجهه)’এর মতো স্বচ্ছদৃষ্টি কারোরই ছিলো না।
খেলাফতের মাঝামাঝি সময়ে খলীফা উসমান (رضي الله عنه) উপলব্ধি করেন যে এই ক্ষয় রোধে কিছু একটা করা দরকার, আর তাই তিনি উমাইয়া বংশীয় এমন কয়েকজনকে প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে নিয়োগ দেন, যাঁরা একজন ব্যতিক্রম ছাড়া বাকি সবাই অভিজ্ঞ ও যোগ্য ছিলেন এবং যাঁদেরকে ইতিপূর্বে প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم)-ও একই পদে নিয়মিত নিয়োগ দিয়েছিলেন। এটা করা হয়েছিলো মদীনায় অবস্থিত কেন্দ্রের সাথে তাঁদেরকে আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধকরণের ও ক্রমাগত ক্ষয় রোধের উদ্দেশ্যে। অবশ্য হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) ইতোমধ্যেই সিরিয়ার গর্ভনর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
এসব প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগ যদিও আমিরুল মো’মেনীনের হাতকে শক্তিশালী ও উম্মাহ’কে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিলো, তবুও দুর্ভাগ্যবশতঃ এই পদক্ষেপের ফলে খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর প্রতি স্বজনপ্রীতির অভিযোগের আঙ্গুল ওঠানো হয়। অনৈক্যের প্রতিরোধে তিনি যে আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা হলো, ক্বুরআন মজীদ একত্রীকরণ। এ পদক্ষেপগুলোর সবই কড়া সমালোচনার সূত্রপাত করে, বিশেষ করে কুফায়, যেখানে হযরত ইবনে মাস’উদ (رضي الله عنه) তাঁর ক্বুরআন তেলাওয়াত রহিতকরণের প্রতি তীব্র আপত্তি উত্থাপন করেন।
গোত্রীয় দল-উপদলের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন বিশেষতঃ শক্তিশালী হয়েছিলো কুফা অঞ্চলে। ইরাক্বে একটি দল ছিলো যাঁদেরকে ‘ক্বুর্রাউ’ নামে ডাকা হতো। এই খেতাবটি সমস্যাদায়ক, কেননা এটাকে অহরহ ‘ক্বুর্রাউ’ হিসেবে ভুল অর্থ করা হয়, যা ‘ক্বারী’ তথা ক্বুরআন তেলাওয়াতকারীর বহুবচন এবং যা রিদ্দার যুদ্ধে ’আক্বরাবা’য় শাহাদাতপ্রাপ্ত প্রকৃত ক্বুরআন তেলাওয়াতকারী বা হাফেযদেরকে বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। ক্বুর্রাউ’বৃন্দ সম্ভবতঃ নিজেরাই এই বিভ্রান্তি বৃদ্ধিতে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, কেননা এই দ্ব্যর্থতা তাঁদের অবস্থানকে মজবুত করছিলো। আল-মাসউদী (ইতিহাসবিদ) তাঁদেরকে ‘আহলুল-ক্বারঈ ওয়াল-আশরাফ’ নামে অভিহিত করেন।
এই সকল ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে ‘আহলুল্ ক্বূরা’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার অর্থ গ্রামসবাসী যাঁরা খলীফা আবূ বকর (رضي الله عنه)’এর পক্ষে রিদ্দার যুদ্ধে এয়ামামা নামের মরু-গোত্রের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, যখনই গোত্রটি যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো। আহলুল্ ক্বূরা গোত্রগুলো বিদ্রোহ করেননি। ইরাক্বের উর্বর ভূমি ‘সাওয়াদ’ বিজিত হওয়ার পরে সেসব রাজ্যের দায়িত্বভার নেয়ার জন্যে ট্রাস্টী তথা তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজন হয়। আর যাঁরা রিদ্দাহ’র সময় অনুগত ছিলেন, তাঁদেরকেই পছন্দ করা হয়। তাঁদের এই সময়কার (মানে খলীফা উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনামলের) নাম ছিলো ‘আহলুল আইয়াম’; তাঁরা বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় রিদ্দাহ গোত্রগুলো, যাদেরকে পূর্বাঞ্চলীয় বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো, তাদের ওপরে নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্য ও প্রাধান্যের প্রতি এভাবে তাঁরা গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাই তাঁরা ‘ক্বুর্রাউ’ নামে পরিচিত হন। তাঁরা বেশ তরক্কী তথা উন্নতি লাভ করেন: প্রাপ্ত হন মুসলমান বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতন ভাতা - ‘শারাফ আল-আতা’ এবং সেরা জমি-জিরাত, যেগুলোকে নিজেদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বিবেচনা করেন।
’ক্বুর্রাউ’র মূল ঘাঁটি ছিলো কুফা এলাকায় এবং খলীফা উসমান (رضي الله عنه) কর্তৃক তাঁদের ক্ষমতা কমিয়ে আনার চেষ্টাই চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর শাহাদাতের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। অধিকন্তু, তিনি রিদ্দাহ ও প্রাক-রিদ্দাহ গোত্রীয় পার্থক্যও অপসারণ করেছিলেন, যা তাঁদের আভিজাত্য কমিয়ে দেয়ার কারণে মোটেও পছন্দ হয়নি।
প্রাদেশিক শাসনকর্তা হযরত সাঈদ ইবনে আল-আস (رضي الله عنه) খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’কে এক পত্রে লেখেন, “কুফা অঞ্চলের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যেখানে ‘আল-ক্বুর্রাউ’ উপাধিধারী আল-আশতার ও তার বন্ধুরা বিরাজমান; আর তারা নিরেট মূর্খ ও নির্বোধ।” ‘ক্বুর্রাউ’ গোষ্ঠী ৩৪ হিজরী/৬৫৫ খৃষ্টাব্দ সালে খলীফার গভর্নর হযরত সাঈদ ইবনে আস্ (رضي الله عنه)’কে জারা’আ এলাকায় পথরোধ করে এবং কুফায় প্রবেশ হতে বাধা দেয়, আর হযরত আবূ মূসা আশআরী (رضي الله عنه)’কে সেখানকার গভর্নর ঘোষণা করে। এটাই ছিলো আমিরুল মো’মেনীন (رضي الله عنه)’এর প্রতি প্রথম প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। এই ‘ক্বুর্রাউ’ গোষ্ঠী-ই সিফফীনের যুদ্ধে দলত্যাগ করে পরবর্তীকালে খারেজী (খাওয়ারিজ) নামে পরিচিত হয়।
সিরিয়ায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর গভর্নর হিসেবে শাসনকালে ফিতনা তথা গৃহযুদ্ধের জন্যে দায়ী কতিপয় উস্কানিদাতাকে কুফায় অবস্থিত খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর গভর্নর তাঁর রাজ্য হতে উস্কানির কারণে বহিষ্কার করেন। তাদের গোত্রীয় নাম হতে আমরা দেখতে পাই তারা ‘ক্বুর্রাউ’ ছিলো। তাদেরকে সিরিয়ায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর কাছে পাঠানো হয়। তিনি তাদেরকে অশান্তি ও মুসলিম ঐক্যে ফাটল সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে বলেন। অতঃপর তিনি বলেন:
“তোমরা আরব জাতির মধ্য হতে (আগত)। তোমাদের গুরুত্ব রয়েছে এবং তোমাদের (কথা) শোনা হয়। তোমরা মহান হয়েছো ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে। বিভিন্ন জাতির ওপর তোমরা বিজয় লাভ করেছো এবং তাদের পদ ও উত্তরাধিকার লাভ করেছো। আমি শুনেছি তোমরা ক্বুরাইশ জাতিকে ঘৃণা করো। ক্বুরাইশ না হলে তোমরা আগে যেরকম হীন বিবেচিত হতে সে রকমই অধঃপতিত থাকতে। তবে এখনো তোমাদের ইমামবৃন্দ ও আশ্রয়স্থল আছেন, তাই তোমাদের আশ্রয়কে বাধা দিয়ো না। তোমাদের কৃত অন্যায়ের মুখেও তোমাদের ইমামবৃন্দ ধৈর্যশীল এবং তাঁরা তোমাদের সৃষ্ট অশান্তি-অস্থিরতার প্রতি সহনশীল। আল্লাহর কসম, হয় তোমরা ক্ষান্ত দেবে, নতুবা আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন এমন কাউকে দিয়ে, যিনি তোমাদের প্রতি হবেন কঠোর। এরপর আর ধৈর্যের ব্যাপারে তোমাদের প্রশংসা করা হবে না। এরপর তোমরা মানুষের ওপর কী চাপিয়েছো সে ব্যাপারটি তাঁদের সাথে ভাগাভাগি করবে তোমাদেরই নিজেদের জীবিদ্দশায় ও মরণে।” [আল-বালাযুরী]
উস্কানিদাতাদের একজন চরম ঔদ্ধত্য সহকারে উত্তর দেয়: “আপনি কর্তৃত্ব ও ক্বুরাইশ সম্পর্কে কতো কিছুই না বলছেন! আরব জাতি তাঁদের তরবারির হাতল দ্বারা (মানে সাহায্যে) আহার করেছেন, অথচ ক্বুরাইশ গোত্র বণিক ছাড়া কিছু ছিলো না!” এরপর সে ভীতি উদ্রেককর এমন এক কথা যোগ করে বলে, “আপনি যে আশ্রয়টির কথা উল্লেখ করেছেন, তা যখন বিদ্ধ করা হবে তখন আমাদের কাছে আসবেন।” এর মানে তারা বর্তমান শাসকবৃন্দকে অপসারণ করে শাসক হবে।
হযরত মু’আবিয়া (رضي الله عنه) তাকে বলেন, “তোমার মা যেনো শোক পালন করেন তোমার জন্যে! আমি তোমাদেরকে ইসলামের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আর তোমরা আমার কাছে জাহেলীয়া (যুগ) সম্পর্কে উল্লেখ করছো! আমিরুল মো’মেনীন (رضي الله عنه)’এর কাছে তোমাদের পক্ষ হয়ে যারা ঘনঘন (দেন-দরবার করতে) এসে থাকে, তাদেরকে আল্লাহতা’লা যেনো বিশ্রী করে দেন! তোমরা নও তাদের মধ্য হতে যাদেরকে সাহায্য বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। [লেখিকার নোট: ওরা হচ্ছে যাদেরকে আল্লাহ উদ্দেশ্য করেছেন ক্বুরআন মজীদে এই বলে - وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لاَ يَضُرُّهُمْ وَلاَ يَنفَعُهُمْ - অর্থাৎ, “এবং আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুর পূজা করে, যা তাদের না কোনো ক্ষতি করে, না উপকার” (ক্বুরআন, ১০:১৮; এছাড়াও ২৫:৫৫, ২২:১২, ৬:৭১)]।
অতঃপর আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’কে এক পত্রে উস্কানিদাতাদের সম্পর্কে লেখেন: “আমার কাছে কিছু লোক এসেছে যাদের নেই কোনো বুদ্ধি, নেই কোনো দ্বীন/ধর্ম। ইসলাম তাদের কাছে একটা বোঝা স্বরূপ, আর ন্যায়বিচার তাদেরকে মর্মপীড়া দেয়। তারা কোনো কিছুতেই আল্লাহকে লক্ষ্য হিসেবে নেয় না, আর তারা প্রমাণসহ কথাও বলে না। তারা (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ ও জিম্মীদের সম্পত্তি জবরদখল নিয়ে ব্যস্ত। একমাত্র আল্লাহতা’লাই তাদেরকে পরীক্ষা ও বিচার করবেন। এরপর তিনি-ই তাদেরকে বেইজ্জত ও অপদস্থ করবেন। তারা এমন লোক যারা মানুষের ক্ষতি করে থাকে।”
উস্কানিদাতাদের এরপর আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর হমস্ অঞ্চলের (সামরিক) প্রতিনিধি আবদুর রহমান ইবনে খালিদ বিন ওয়ালীদ (رضي الله عنه)’এর কাছে পাঠানো হয়। তিনি তাদেরকে বন্দী করেন এই বলে: “শয়তানের ক্রীড়নক! তোমরা এখানে স্বাগত নও! শয়তান দুঃখ নিয়ে ফিরে গেছে অথচ তোমরা এখনো সক্রিয় আছো! আল্লাহতা’লা আবদুর রহমানকে (মানে তিনি নিজেকে) নিরাশ করুন যদি আমি তোমাদেরকে অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বাধ্যতায় (ফিরিয়ে) না আনতে পারি! ওহে (ফিতনাবাজ) লোকের দল, যাদের আমি আরব বা অনারব বলে জানি না, তোমরা আমাকে সে কথা বলবে না যা আমি শুনেছি তোমরা হযরতে আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’কে বলেছো! আমি হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (رضي الله عنه)’এর পুত্র। আমি তাঁরই পুত্র যাঁকে দাঁত দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিলো। আমি তাঁরই পুত্র যিনি রিদ্দাহ’কে সমূলে উৎপাটিত করেছিলেন!”
উস্কানিদাতাদের পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী এটা আশ্চর্যজনক নয় যে আবদুর রহমান (رضي الله عنه) বাইজেন্টাইন কিংবা পারসিকদের পরাজয়ের কথা উল্লেখ না করে রিদ্দাহ’দের কথা স্মরণ করেছিলেন। এটা স্পষ্ট যে তিনি এসব লোককে আরেকটি সম্ভাব্য রিদ্দাহ হিসেবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন; আরেক কথায়, মুসলিম উম্মাহ’র অভ্যন্তরে একটি সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে।
হযরত আবদুর রহমান (رضي الله عنه) তাদেরকে বন্দী অবস্থায় রাখেন যতোক্ষণ পর্যন্ত না তারা মুক্তির জন্যে অনুনয়-বিনয় করেছিলো এবং নিজেদের অতীত দুষ্কর্মের জন্যে ক্ষমা চেয়ে তার পুনরাবৃত্তি না করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলো। তাই তিনি তাদেরকে মদীনা মোনাওয়ারায় খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর কাছে প্রেরণ করেন, যেখানে তারা আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়ার শপথ উচ্চারণ করে। মহানবী (صلى الله عليه وسلم) কর্তৃক তাবুকের যুদ্ধে গমনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের ওজর গ্রহণ করে তাদেরকে ক্ষমা করার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে খলীফা উসমান (رضي الله عنه)-ও উস্কানিদাতাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং তারা যেখানে যেতে চায় সেখানে যেতে দেন। কিন্তু তারা (উল্টো) বিভিন্ন মুসলিম কেন্দ্রগুলোতে (আবারো) বিভক্তি সৃষ্টি করে বিদ্রোহের ইন্ধন দিতে থাকে, বিশেষ করে মিসরে।
ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টিকারী আরেকটি দল কর্তৃক গণ্ডগোল-হট্টগোল বাধানোর অপচেষ্টার অপর এক নজিরও বিদ্যমান। ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (তারীখ, ৫:৬৬) বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা’ নামের এক লোক সিরিয়ায় আগমন করে হযরত আবূ যর গিফারী (رضي الله عنه)’এর সাথে সাক্ষাৎ করে। সে তাঁকে বলে, “আপনি কি মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর এ কথায় বিস্মিত হচ্ছেন না যেখানে তিনি বলেছেন - ‘সম্পত্তি হচ্ছে আল্লাহরই সম্পত্তি। সব কিছু কি আল্লাহরই মালিকানাধীন নয়?’ মনে হচ্ছে (এ কথার দ্বারা) মু’আবিয়া (رضي الله عنه) এটাকে (মানে সম্পত্তিকে) মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান এবং মুসলমানদের নাম মুছে ফেলতে চান!” এমতাবস্থায় হযরত আবূ যর (رضي الله عنه) আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর কাছে যান এবং তাঁকে বলেন, “মুসলমানদের সম্পত্তিকে ‘আল্লাহর সম্পত্তি’ বলার পেছনে আপনার উদ্দেশ্য কী?” আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) উত্তরে বলেন, “হে আবূ যর, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম/করুণা করুন। আমরা কি আল্লাহর বান্দা নই এবং সমস্ত সম্পদ-সম্পত্তি তাঁরই নয়, আর সকল সৃষ্টি তাঁরই সৃষ্টি নয় এবং সমস্ত বিষয় তাঁরই বিষয় নয়?” হযরত আবূ যর (رضي الله عنه) বলেন, “ও কথা বলবেন না।” এমতাবস্থায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) বলেন, “আমি বলি না তা আল্লাহর মালিকানাধীন নয়, বরং আমি বলি, ‘মুসলমানদের সম্পত্তি’।” অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে সাবা’ হযরত আবূ যর গিফারী (رضي الله عنه)’এর কাছে আবার আসে, যিনি তাকে বলেন, “তুমি কে? আল্লাহর ক্বসম, আমার মনে হয় তুমি এক ইহুদী।” এরপর আবদুল্লাহ ইবনে সাবা’ হযরত আবদুল্লাহ বিন সামিত (رضي الله عنه)’এর কাছে যায় এবং তাঁকেও বিক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ বিন সামিত (رضي الله عنه) তাকে আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর কাছে নিয়ে যান এবং বলেন, “আল্লাহর শপথ, এই লোকই হযরত আবূ যর গিফারী (رضي الله عنه)’কে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলো।”
বস্তুতঃ আবদুল্লাহ ইবনে সাবা’ ছিলো এক ইয়েমেনী ইহুদী, যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে ইহুদী শাস্ত্রীয় ধ্যানধারণা অনুপ্রবিষ্ট করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলো বিশেষতঃ হযরত আলী (كرم الله وجهه)‘এর অবস্থানকে কেন্দ্র করে, যা হযরত আলী (كرم الله وجهه)‘এর অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির সূত্রপাত করেছিলো। শিয়া উগ্রপন্থীদের বহু ধ্যানধারণা-ই ওই লোকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অতএব, সে সময় বাতাসে সম্ভাব্য বিভক্তি ও বিরোধিতার একাধিক দাবানল-উৎস ভেসে বেড়াচ্ছিলো।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে এবং আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) হজ্জ্বশেষে (ফেরার পথে) খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর প্রতি পরামর্শ দেন যেনো তিনি সিরিয়ায় চলে আসেন। কিন্তু খলীফা মদীনা ত্যাগের পক্ষপাতী ছিলেন না; তিনি উত্তরে বলেন, “এমন কী আমার জীবন বাঁচানোর জন্যে হলেও আমি এই ভূমি ত্যাগ করবো না, যেখানে প্রিয়নবী (صلى الله عليه وسلم) বসবাস করেছেন, আর তিনি যে শহরে (বর্তমানে) শায়িত আছেন।” এমতাবস্থায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) কিছু সিরীয় (সেনা) খলীফার খেদমতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন। কিন্তু খলীফা মদীনাবাসীদের ওপর কষ্ট ও লোকালয়ে সৈন্যদের আবাসন খরচের বোঝা চাপাতে চান নি। তাঁর মুসলমান ভাইয়েরা রক্তপাত সংঘটনের মতো কাজ করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন নি। আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) মদীনা ত্যাগের সময় ক্বুরাইশ গোত্রের একটি দলকে অতিক্রম কালে সতর্ক করে বলেন যে জাহিলিয়্যা যুগে প্রত্যাবর্তনের বিপদ দেখা দিতে চলেছে। তিনি তাঁদের বলেন, “এই অসহায় বয়োবৃদ্ধের ভার আমি আপনাদের প্রতি অর্পণ করলাম। তাঁকে সাহায্য করুন, আর এটা আপনাদের জন্যে শ্রেয়তর হবে।” এরপর তিনি সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হন।
বিদ্রোহীরা খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর বাসভবনে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং পানি সরবরাহ কেটে দেয়; খলীফা আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) ও অন্যান্যদেরকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়ে সতর্ক করেন। বস্তুতঃ হাবীব ইবনে মাসলামা আল-ফিহরী (رضي الله عنه)’এর নেতৃত্বে ১০০০ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি সিরীয় বাহিনী খলীফার সাহায্যে ওই সময় মদীনা অভিমুখী যাত্রারত ছিলেন, যখন তাঁর শাহাদাতের খবর তাঁদের কাছে এসে পৌঁছোয়। আর তাই তাঁরা সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন।
খণীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর প্রতি অবরোধ আরোপের খবর হযরত আলী (كرم الله وجهه) প্রথমে শোনা মাত্র সর্ব-ইমাম হাসান ও হুসাইন (رضي الله عنهما)’কে আদেশ করেন, “খলীফা উসমান (رضي الله عنهما)’এর দরজায় তরবারিসহ যাও এবং কাউকেই তাঁর কাছে পৌঁছুতে দেবে না।” সর্ব-হযরত যুবায়র ইবনে আওয়াম (رضي الله عنه) তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে, তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (رضي الله عنه) তাঁর পুত্রকে এবং অন্যান্য সাহাবাবৃন্দও নিজ নিজ পুত্রদেরকে খলীফার প্রতিরক্ষায় প্রেরণ করেন। খলীফার বাসভবনের দিকে অনেক তীর নিক্ষিপ্ত হয়, আর এতে ইমাম হাসান (رضي الله عنه)’সহ প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত অন্যান্যরা আঘাতপ্রাপ্ত ও রক্তাক্ত হন। ষড়যন্ত্রকারীদের একজন মুহাম্মদ ইবনে আবী বকর এই দৃশ্য দেখে শঙ্কিত হয় যে, হাশেমী বংশ সর্ব-ইমাম হাসান ও হুসাইন (رضي الله عنهما)’এর অবস্থা ও ইমাম হাসান (رضي الله عنه)’এর মুখে রক্ত দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়বে; তাই সে এবং তার দুই সাথী সিদ্ধান্ত নেয় (পেছনের) দেয়াল টপকে ঘরে ঢুকে কারো কিছু জানার আগেই তারা খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’কে হত্যা করবে। তারা তাঁকে একা স্ত্রীসহ ক্বুরআন তেলাওয়াতরত দেখতে পায়। মুহাম্মদ ইবনে আবী বকরকে খলীফা ভর্ৎসনা করলে সে ফিরে আসে, কিন্তু অপর দু জন তাঁকে শহীদ করে। এরপর তারা যে পথে এসেছিলো, সে পথ দিয়েই পালায়। খলীফার স্ত্রী হযরত নাঈলা (رضي الله عنها) সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করেন, কিন্তু হট্টগোলের আওয়াজে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা যায় নি। অতঃপর তিনি ওপরে বেয়ে উঠে মানুষদেরকে বলেন, “আমিরুল মো’মেনীনকে শহীদ করা হয়েছে!” সর্ব-ইমাম হাসান ও হুসাইন (رضي الله عنهما) এবং অন্যান্যরা ভেতরে গিয়ে খলীফাকে শহীদ অবস্থায় দেখতে পান এবং কান্নাকাটি করেন। হযরত আলী (كرم الله وجهه) যখন এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি এতোখানি ক্রোধান্বিত হন যে তিনি ইমাম হাসান (رضي الله عنه)’কে তাঁর মুখমণ্ডলে চড় মারেন এবং ইমাম হুসাইন (رضي الله عنه)’কে আঘাত করেন এই বলে, “তোমরা ফটকে থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে শহীদ হলেন?” [আল-বালাযুরী]
খলীফা উসমান (رضي الله عنه) যিনি ৮২ কী ৮৫ বছর বয়সী এক ভদ্রনম্র ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁর হত্যাকাণ্ড সবাইকে গভীর শোকাহত করে। কেউই এই ঘটনাটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বস্তুতঃ ইতিহাসবিদবৃন্দ বলেন, “তাঁরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন।” আর ওই সময় পাঁচ দিন মদীনা ছিলো আমির বিহীন; মসজিদে নববীর কর্তৃত্ব ছিলো জনৈক বিদ্রোহী নেতার হাতে। খলীফার স্ত্রী নাঈলা (رضي الله عنها) তাঁর স্বামীর রক্তমাখা জামা আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর কাছে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে ভ্রমাত্মকভাবে জানান যে তিনি হযরত আলী (كرم الله وجهه)’এর এতে জড়িত থাকার ব্যাপারে সন্দেহ করেন। মানুষেরা একে অপরকে দোষারোপ করা শুরু করেন। এটা ছিলো চরম অনৈক্যের পরিস্থিতি এবং উম্মাতের জন্যে মহাবিপদ; কেননা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা ছিলো অত্যাসন্ন।
এই সময়কালে মদীনায় বসবাসকারী বনূ উমাইয়া গোত্রের সদস্যবৃন্দ রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর স্ত্রী ও আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه)’এর বোন হযরত উম্মে হাবীবাহ (رضي الله عنها)’এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি এবং রাসূল (صلى الله عليه وسلم)’এর অপর স্ত্রী হযরত সাফিয়্যা (رضي الله عنها) অবরোধ চলাকালে খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর কাছে পানি সরবরাহ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের দু জনকেই রূঢ়ভাবে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এরপর যখন বিদ্রোহীরা খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’কে জান্নাতুল বাক্বী কবরস্থানে দাফনে বাধা দেয়, তখন হযরত উম্মে হাবীবা (رضي الله عنها) দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন, “তোমরা হয় এই ব্যক্তিকে দাফন করতে দাও, না হয় আমি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)’এর পর্দা অপসারণ করবো!” এর মানে ছিলো তিনি তাদের সামনে বেরিয়ে আসবেন। এতদশ্রবণে তারা খলীফাকে সেখানে দাফন করতে দেয়।
পরিশেষে হযরত আলী (كرم الله وجهه)’এর ওপর যখন খেলাফতের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়, ততোক্ষণে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে গিয়েছিলো। এটা পরিস্ফুট হয় এই বাস্তবতার আলোকে যে, খলীফা উসমান (রা:)’এর হত্যাকারীরা অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ও সুসংগঠিত হয়ে এমনই শক্তিশালী অবস্থানে ছিলো যে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা ওই সময় হযরত আলী (كرم الله وجهه)’এর পক্ষে অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হয়েছিলো [বঙ্গানুবাদকের নোট: এটা খলীফা আলী (كرم الله وجهه)’এর ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত ছিলো। তিনি খেলাফতের ওই রকম নড়বড়ে অবস্থায় কাজটি করা সমীচীন মনে করেননি; বরঞ্চ তা পরে করতে চেয়েছিলেন। সুন্নী আলেম-উলামা তাঁর এই ইজতিহাদকে সঠিক বলেছেন, আর আমিও তাই মনে করি]। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি উম্মতের সবচেয়ে অবাধ্য এলাকা কুফায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যে ক্বুর্রাউ’র ঘাঁটিতে যান এবং এতদসত্ত্বেও তাদেরকে মোকাবিলা করে শাস্তি বিধান করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি।
খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর হন্তাদেরকে তাৎক্ষণিক শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব না হওয়ার ফলশ্রুতিতে তা ৩৬ হিজরী সালে সংঘটিত উটের যুদ্ধের রূপ লাভ করে, যা’তে খুনীদের বিচার চেয়ে সর্ব-হযরত আয়েশাহ, তালহা ও যুবায়র (رضي الله عنهم) উমরাহ-শেষে মক্কা মোয়াযযমা হতে আসেন। আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) বিচার হচ্ছে কি না তা দেখতে সিরিয়ায় অবস্থান করেন। তবে সকল পক্ষ যখন মিটমাটে একমত হন এবং খলীফা আলী (كرم الله وجهه)-ও সম্ভাব্য সময়ে হত্যাকারীদের শাস্তি বিধানের প্রতি আপন সদিচ্ছা যখন ব্যক্ত করেন, আর অপর তিনজন (রা:)-ও খলীফার সদিচ্ছার বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন, ঠিক অমনি সময়ে ষড়যন্ত্রকারীরা উভয় পক্ষকে পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতা ও একে অপরের প্রতি অতর্কিত হামলার বিভ্রান্তিতে ফেলে একটি যুদ্ধ বাধাবার ইন্ধন যোগায়। এই ঘটনা খুনীদের দমনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে অনাক্রমণীয় অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে। আর এতে সর্ব-হযরত তালহা ও যুবায়র (رضي الله عنهما)-সহ ১০,০০০ মুসলমান শাহাদাৎ বরণ করেন।
উটের যুদ্ধের পরপরই কেবল আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর আত্মীয় হিসেবে তাঁর খুনের বদলা (ক্বেসাস) নেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এ অধিকার ক্বুরআন মজীদের আয়াতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং কেউই তা অস্বীকার করেন নি [ক্বুরআন, ১৭:৩৩ - وَمَن قُتِلَ مَظْلُوماً فَقَدْ جَعَلْنَا لِوَلِيِّهِ سُلْطَاناً - এবং যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, তবে নিশ্চয় আমি (খোদা) তার উত্তরাধিকারীকে অধিকার দিয়েছি (বদলার)]।
খলীফা আলী (كرم الله وجهه) কর্তৃক তাঁর নিজের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার আহ্বান জানানো হলে আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) খলীফার আশপাশে খুনীদের লুকিয়ে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কী করণীয়, সে সম্পর্কে আপন সেনাপতি ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সাথে পরামর্শ করেন। তাঁরা বলেন, “তিনি (হযরত আলী ক:) খলীফা উসমান (رضي الله عنه)’এর হত্যাকারীদের হত্যা না করলে বা আমাদের কাছে তাদের হস্তান্তর না করলে আমরা তাঁর (আলী-ক:) প্রতি আনুগত্যের শপথ নেবো না।” এই পর্যায়ে নিরন্তর স্মরণের জন্যে খলীফার রক্তমাখা জামা দামেশক্বের মসজিদের মিম্বরে টানিয়ে রাখা হয়।
এমতাবস্থায় আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) উত্তরস্বরূপ এক পত্রে লেখেন, “খলীফা (كرم الله وجهه) যদি আমার আত্মীয়ের হন্তাদের আমার কাছে হস্তান্তর করেন এবং আমার প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদের স্বীকৃতি দেন, তাহলে আমি তাঁর আনুগত্য স্বীকার করবো।” ওই পরিস্থিতিতে মক্কা (শাসনকর্তা)-ও আনুগত্যের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। নাসর ইবনে মুযাহিমের ‘ওয়াক্বা’আত সিফফীন’ নামের একটি শিয়াপন্থী সূত্রের কাছে ওই চিঠি বিদ্যমান, যা ব্যক্ত করে: “আমাদের কাছে হত্যাকারীদের হস্তান্তর করুন এবং আমরা তাঁর (খলীফা উসমান রা:) পক্ষ হয়ে তাদের হত্যা করবো; এরপর আমরা আপনার আনুগত্যের শপথের এবং জামা’আতের (মুসলিম সমাজের) ডাকে সাড়া দেবো।” [বঙ্গানুবাদকের নোট: আমীরে মু’আবিয়া (رضي الله عنه) ফেক্বাহবিদ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আহলে বায়তের (رضي الله عنهم) সদস্য হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন - إنه فقيه - “নিশ্চয় তিনি একজন ফেক্বাহ-শাস্ত্রবিদ” (বুখারী, ৩৭৬৫)। অতএব, আনুগত্যের শপথ না নেয়ার পক্ষে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিলো ইজতিহাদী তথা ক্বুরআন-হাদীসলব্ধ গবেষণাভিত্তিক, যদিও আহলে সুন্নাতের ইমামবৃন্দ তা ইজতিহাদী ভ্রান্তি বলে রায় দিয়েছেন। আর ভুল ইজতিহাদের জন্যেও সওয়াব আছে বলে হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। যথা - إن أصبت فلك عشر حسنات وإن أخطأت فلك حسنة - সঠিক ইজতিহাদ হলে দশটি সওয়াব, আর ভুল করলে একটি (আল-হাদীস)। অবশ্যঅবশ্য ইমামে আলী (كرم الله وجهه)’এর ইজতিহাদ সঠিক ছিলো বলে আমিও বিশ্বাস করি]
*হযরত মু’আবিয়া (রা:): মুসলিম বিশ্বাসের পুনরুদ্ধারকারী* (পর্ব-১৪)
মূল: মোহতারামা আয়েশাহ বিউলী
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
[Bengali translation of Aisha Bewley’s booklet ‘Mu’awiya: Restorer of the Muslim Faith; post-14]
Comments
Post a Comment