মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভ্রান্ত তাফসীর এর স্বরূপ উন্মোচন
মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভ্রান্ত তাফসীর এর স্বরূপ উন্মোচন
মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভ্রান্ত তাফসীর এর স্বরূপ উন্মোচন
রচনাঃ আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান
টেক্সট রেডীঃ মুহাম্মদ আব্দুল খালেক
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রকাশ কাল
প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪ ইং
দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৯৬ ইং
তৃতীয় প্রকাশ ১৯৯৮ ইং
চতুর্থ প্রকাশ ২০০১ ইং
পঞ্চম প্রকাশ ২০০৭ ইং
হাদিয়া
একশত টাকা মাত্র
প্রকাশনায়
সুন্নী প্রকাশনী
চট্টগ্রাম
প্রকাশকের কথা
আল্লাহ্ তা'আলার অশেষ রহমতে 'পবিত্র ক্বোরআনের ভ্রান্ত তাফসীরের স্বরূপ উন্মোচন' শীর্ষক লেখাটি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত 'মাসিক তরজুমান'-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পর অবশেষে গণ-দাবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে 'পুস্তকাকারে'প্রকাশ করতে পেরে আমরা মহান আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি।
মানব জাতির উৎস পুরুষ, আদি পিতা ও আল্লাহ্ পাকের নিষ্পাপ নবী হযরত আদম আলাইহিস্ সালামের যমানা থেকেই এ পর্যন্ত চলে আসছে- সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব, হক ও বাতিলের সংঘাত। ক্বিয়ামত পর্যন্ত এ দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলতে থাকবে। কিন্তু মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সব সময় হক ও সত্যের উজ্জ্বল মশাল জ্বালিয়ে মিথ্যা ও বাতিলের সেই তমসাকে দূরীভূত করেন- এটাই পরম দয়াময়ের পবিত্র সুন্নাত।
জাহেলিয়াতের চরম ভ্রান্তি-বিভ্রান্তিকে মুলোৎপাটন করে ধরাপৃষ্ঠে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহ্ পাক লক্ষ লক্ষ নবী ও রসূলের শুভাগমনের ধারার পূর্ণতা ও সমাপ্তি ঘটালেন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত কিছুর নির্ভুল অসাধারণ খোদা প্রদত্ত জ্ঞানের ধারক, সমস্ত সৃষ্টির জন্য রহমত বিশ্বনবী হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে উত্তম আদর্শরূপে প্রেরণ করে, সব সমস্যার সমাধান দিলেন তাঁর হাবীবের উপর হিদায়াতের পূর্ণতম ও চূড়ান্ত আলোকবর্তিকা সর্বাধিক কল্যাণকর বিধানের উৎস কিতাব পাক ক্বোরআন নাযিল করে এবং ধর্ম ও তন্ত্র-মন্ত্রের ক্ষেত্রে সব ধরণের বিভ্রান্তির চির অবসান ঘটালেন একমাত্র ইসলামকেই 'ধর্ম' হিসাবে মনোনীত করে। সাথে সাথে এ ঘোষণাও দিলেন যে, এ প্রিয় নবীর 'নূর'কে পূর্ণতা ও স্থায়ীত্ব দান, দ্বীন-ইসলামের গৌরবময় অস্থিত্বকে চিরস্থায়ী রাখা এবং সেই চূড়ান্ত ঐশী গ্রন্থ পবিত্র ক্বোরআনকে চিরদিন সম্পূর্ণ অবিকৃত ও অখণ্ডনীয় অবস্থায় রাখার দায়িত্ব তিনি নিজ করুণায়ই গ্রহণ করেছেন। এ কারণে, আজ পর্যন্ত যেমন এ পবিত্র ক্বোরআন সম্পূর্ণ অম্লান রয়েছে, তেমনি থাকবে ক্বিয়ামত অবধি। তাতে শাব্দিক পরিবর্তন তো সম্ভবপর নয়ই, অর্থ ও ব্যাখ্যাগত বিকৃতির অপচেষ্টাকারীদেরকেও আল্লাহ্ তা'আলা সত্যপন্থীদের দ্বারা প্রতিহত করেন সাথে সাথে। এ কারণে যেখানেই পবিত্র ক্বোরআনের অপব্যাখ্যা দেয়ার অপচেষ্টা চলে সেখানেই তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়।
আলহামদুলিল্লাহ!
আমাদের বাংলাদেশেও জমাতপন্থীরা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি করতে গিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে পবিত্র ক্বোরআনের অপব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টায় নেমেছে। বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ জমাতপন্থী সংগঠন 'ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম' প্রতি বৎসর 'তাফসীরুল ক্বোরআন'-এর নামে মাহফিলের আয়োজন করে আসছে। তাতে প্রধান মুফাসসির হিসেবে আমন্ত্রিত হন জমাত নেতা মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। আর মৌং সাঈদী ও তার সহকারীরা প্রতিবছরই সুপরিকল্পিতভাবে পবিত্র ক্বোরআনের অপব্যাখ্যা দিয়ে আসছেন। কিন্তু শ্রোতামণ্ডলী তাদের বক্তব্যকে 'ইসলামের নির্ভুল বাণী' মনে করে নিমজ্জিত হতে চলেছে নানা ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তিতে। পবিত্র ক্বোরআনের নামে জমাতপন্থীদের ভ্রান্তিকে চিহ্নিত এবং সত্যকে প্রকাশ করার ঈমানী দায়িত্ব পালনের মানসে বিগত ১৯৮৭ ইং সালের প্রথম দিকে বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, ছোবহানিয়া আলীয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন প্রভাষক, বিশিষ্ট লেখক, পবিত্র ক্বোরআনের সফল অনুবাদক জনাব আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ মান্নান মসি হাতে নেন। তিনি প্রামাণ্য কেসেটাদি ও পুস্তক-ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে মৌং সাঈদী ও তার সহকারীদের আসল স্বরূপ উন্মোচন করে এক সপ্রমাণ পুস্তক প্রণয়ন করেন। তিনি তাতে সার্থকও হয়েছেন। ১৯৮৭ ইং থেকে ধারাবাহিকভাবে বহুল প্রচারিত মাসিক 'তরজুমান'-এ তাঁর সম্পূর্ণ লেখাটা প্রকাশিত হয়েছে যা পাঠক সমাজে খুব সমাদৃত হয়েছে এবং এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী সুনাম কুড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার বহুল প্রচারিত কতিপয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনেও এর বরাত দিয়ে মৌং সাঈদীকে এর জবাব দেয়ার জন্য আহ্বান করা হয়। কিন্তু আজ অবধি কোন জবাব আসেনি। এদিকে এ প্রামাণ্য লেখাটা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হওয়া যুগের দাবী হিসেবে স্বীকৃত হয় দীর্ঘদিন ধরে। এ দাবীর পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের এ প্রয়াস।
উল্লেখ্য, পুস্তকটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় 'পবিত্র ক্বোরআনের ভ্রান্ত তাফসীরের স্বরূপ উন্মোচন-১ঃ মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তাফসীরুল ক্বোরআন' শিরোনাম। কিন্তু শুভাকাঙ্ক্ষীদের সুন্দর পরামর্শের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখক মহোদয় এ সংস্করণে পুস্তকটির নাম রাখলেন 'মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভ্রান্ত তাফসীর-এর স্বরূপ উন্মোচন।' এ বইটির প্রথম প্রকাশ পাঠক সমাজে খুবই সমাদৃত হয়। এ কারণে আমরা পুস্তকখানার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করলাম। পাঠক সমাজ এ পুস্তকখানা পাঠ করে যদি বাতিলের বাহ্যিক সাদা পর্দার আড়ালে লুক্বায়িত ঘন তমসাকে ছিন্ন করে সত্যের সামান্যটুকু আলো পেয়ে কিঞ্চিত উপকৃতও হন তবেই আমাদের শ্রম ও প্রয়াস সার্থক হবে বলে মনে করি। আল্লাহ্ কবূল করুন! আমীন!!
প্রকাশক
সূচীপত্র
ভূমিকা -১
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা-১ ('ইলাহ্' সম্বন্ধীয়) -৫
উদ্ধৃতি -৫
পর্যালোচনা -৬
জবাব -৭
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা-২ (শাসকগোষ্ঠী ও পীর-মাশাঈখ সম্বন্ধীয়) -৩৫
উদ্ধৃতি -৩৫
পর্যালোচনা -৩৬
জবাব -৩৬
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা-৩ (বিশ্বনবীর ﴾ﷺ﴿ শাফা'আত সম্বন্ধীয়) -৪০
উদ্ধৃতি -৪০
পর্যালোচনা -৪৪
জবাব -৪৪
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা-৪ (হযরত ইব্রাহীম এবং অন্যান্য নবী ও রসূলগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর মা'সূম বা নিষ্পাপ হওয়া সম্বন্ধীয়) -৭৫
উদ্ধৃতি -৭৫
পর্যালোচনা -৭৭
জবাব -৭৭
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা-৫ (মৌং সাঈদী ও জমায়াতপন্থীদের তাওহীদের স্বরূপ) -৮১
উদ্ধৃতি -৮১
পর্যালোচনা -৮১
জবাব -৮২
মৌং সাঈদী ও ইলমে হাদীস -৮৪
মৌং সাঈদী ও আরবী ব্যাকরণ -৮৬
মৌং সাঈদী নবী করীম ﴾ﷺ﴿-কে 'জ্ঞানী' বলে মানতেও নারায -৮৭
মৌং সাঈদী 'আক্বীদা'র গুরুত্বে বিশ্বাসী নয় -৯৪
মৌং সাঈদীর বাকচাতুরী! -৯৬
মৌং সাঈদীর অপরিপক্ক সহকারীর কাণ্ড -৯৭
মৌং সাঈদীর আরেক সহকারী -৯৭
মৌং সাঈদীর সমর্থক পীর -৯৮
শেষ পর্যন্ত মৌং সাঈদী 'শবে বরাত' কে অস্বীকার করলো -৯৮
উদ্ধৃতি -৯৮
পর্যালোচনা -৯৯
জবাব -৯৯
نَحٛمَدُه وَ نُصَلِّى وَ نُسَلِّمُ عَلٰى حَبِيٛبِهٖ الٛكَرِيٛم
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লী ওয়া নুসাল্লিমু আলা হাবীবিহিল করীম!
ভূমিকা
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ ফরমানঃ "ইন্নাদ্দী-না ইনদাল্লা-হিল ইসলাম।" অর্থাৎ আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।" একথা সর্বজন বিদিত যে, পৃথিবী সৃষ্টির প্রারম্ভিক কাল থেকে এ পর্যন্ত বহু রকমের ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। তাই, গোটা বিশ্বে মুসলমান ছাড়াও ইহুদী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু ইত্যাদি ধর্মাবলম্বী মানুষও দেখা যায়। কিন্তু এসব ধর্মের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন- "আমার নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম আর এটাই পূর্ণাঙ্গ, নির্ভুল। আল্লাহ তা'আলা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেনঃ "আল্ ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আতমামতু আলায়কুম নি'মাতী।" অর্থাৎ "আজ (বিদায় হজ্বের দিন) আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন (ইসলাম)-কে পূর্ণতা দান করলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।"
সুতরাং মানুষের ইহ ও পারলৌকিক জীবনের কোন একটা বিষয়ও ইসলাম থেকে বাদ পড়েনি। সমস্ত বিষয়ে নির্ভুলভাবে দিশাদান করা হয়েছে এ পূর্ণাঙ্গ দ্বীন-ইসলামে।
ইসলামের এ পূর্ণতার প্রোজ্জ্বল স্বাক্ষর হচ্ছে। 'পবিত্র ক্বোরআন'। ক্বোরআন হচ্ছে আল্লাহ পাকের কালাম। তাঁরই ভাষায়, ক্বোরআন হচ্ছে- 'তিব্ইয়ানুল লিকুল্লি শায়ইন'। অর্থাৎ অনু-পরমাণু থেকে আরম্ভ করে সর্ববৃহৎ সৃষ্টির প্রত্যেকটির বিবরণ রয়েছে মহান গ্রন্থ পাক ক্বোরআনে।
বলা বাহুল্য, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিধান সুবিন্যস্ত হয় এর 'চতুর্দলীল' বা ক্বোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসে। কিন্তু, ইসলামের বিধানাবলীর প্রধানতম উৎস হচ্ছে এ পবিত্র ক্বোরআন মজীদ। অবশিষ্ট তিনটা হচ্ছে এরই কার্যতঃ তাফসীর বা ব্যাখ্যা।
কাজেই, ইসলামের চতুর্দলীলের ভিত্তিতে মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র যদি নিয়ন্ত্রিত হয় তবে কার্যক্ষেত্রেও ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বাধিক কল্যাণকর হওয়া প্রমাণিত হতে বাধ্য। বিশ্বনবী, নবীকুল সরদার, সাইয়্যেদুল কাওনাঈন হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবনাদর্শ এবং বিশেষ করে, খোলাফা-ই-রাশেদীন রাদিআল্লাহু তা'য়ালা আনহু-এর জীবনাদর্শ থেকে একথাটা মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় বিশ্ববাসীর নিকট সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণেই, যে পাশ্চাত্য দেশগুলো আজ বিশ্বে সভ্যতার দাবীদার সেজে বসেছে তারাও সর্বপ্রথম সভ্যতার তা'লীম নিয়েছে মুসলমানদের নিকট থেকে। সুতরাং মুসলমানরাই হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি।
কিন্তু পরবর্তী যুগগুলোর মুসলিম সমাজে সে ঐতিহ্য কি যথাযথভাবে অক্ষুন্ন রয়েছে? যে মুসলিম জাতি একদিন জোর গলায় বলতে পেরেছে-
دی آذانیں کبھی یورپ کے کلیساؤں میں
اور کبھی افریقہ کے تپتے ہوئے صحراؤں میں
دشت تو دشت ہیں دریا بھی نہ چھوڑے ہم نے
بحر ظلمات میں دوڑادے گھوڑے ہم نے
"আমরা কখনো ইউরোপের গীর্জাগুলোতে আযানের রব ধ্বনিত
করেছি, কখনো আফ্রিকার উত্তপ্ত মরুভূমিগুলোতেও।
শুধু মাঠ আর ধূধূ ময়দান নয়; সমুদ্রগুলোকেও আমরা ছাড়িনি; সুদূর
প্রশান্ত মহাসাগরেও আমরা বিজয়ের ঘোড়া নামিয়ে দিয়েছি।"
সে মুসলিম জাতির ঐ গৌরবময় যোগ্যতা কি এখনো অক্ষুন্ন আছে? মুসলিম জাতি ইসলামী আদর্শের মাধ্যমে পৃথিবীর যেখানেই পদার্পণ করেছে সেখানেই হয়েছে বরিত, এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তাঁরা রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে মানুষকে বিভিন্ন ভ্রান্তি-বিভ্রান্তি, শোষণ-পীড়ন, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা থেকে মুক্ত করে শান্তি, সমৃদ্ধি ও গৌরবের সঠিক দিশা দিতে পেরেছেন বলেই এ জাতি এক মহান জাতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু, তাদের পরবর্তী বংশধরেরা কি সেই বিশ্ব স্বীকৃত আস্থাকে এ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছে? এর জবাবে 'না' বললেও অত্যুক্তি হবে না।
এর কারণ কি?
এ বহুবিধ কারণ রয়েছে। যেমন-
একঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের ﴾ﷺ﴿ প্রতি যেই অকৃত্রিম বিশ্বাসের কারণে আমাদের 'সলফ-ই-সালেহীন'(অগ্রণীগণ) তাঁদের যে কোন পদক্ষেপে আল্লাহর অশেষ রহমত ও সাহায্য লাভে সমর্থ হয়েছিলেন পরবর্তীতে মুসলমানদের মনেপ্রাণে সে ধরনের দৃঢ় বিশ্বাসে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে এখন আর সেই ঈমানী বল পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অনেকের মধ্যে ইসলামী অনুশাসন পালনের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ঔদাসীন্য, অনেকের আবার ইসলামী আক্বীদায় অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিভিন্ন বিভ্রান্তির।
দুইঃ যেই ঐক্যের অদম্য শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুসলিম জাতি তার স্বকীয়তা ও শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছিল এখন তো আর সেই শক্তি নেই। মুসলমানদের এক বিরাট অংশ ইসলামের সঠিক রূপরেখা 'আহলে সুন্নাত ওয়া জামা'আত'-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে নানা ভ্রান্ত আক্বীদার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে ঐক্যের ইস্পাত কঠিন ভিতের উপর চরমভাবে আঘাত হেনেছে। আত্মাশুদ্ধির উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসে সেই ঐক্যের ভিতকে মজবুত রাখার পরিবর্তে নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদকে ইসলামের রূপ দেয়ার পাঁয়তারা চলতে থাকে। সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে সরল পথ দেখানোর স্থলে প্রতারণার মাধ্যমে বাতিল আক্বীদায় বিশ্বাসীদের দলে ভেড়ানোর ষড়যন্ত্র চলছে নিয়মিতভাবে।
তিনঃ যেই অব্যাহত কর্ম-তৎপরতা ও সচেতনতার মাধ্যমে মুসলিম জাতি তাদের বিজয় যাত্রাকে অব্যাহত রেখেছে, ক্রমশঃ সেই কর্মতৎপরতায় দুঃখজনকভাবে ভাটা পড়েছে। একদিকে ইসলামের সঠিক রূপরেখা তথা সুন্নী মতাদর্শের অনুসারীরা তাঁদের যতটুকু কর্মতৎপর ও সচেতন হওয়া উচিত ছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁরা এখনো পর্যন্ত অনড় ও অচেতন ভূমিকা পালন করছেন। অথবা, পার্থিব ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখার ফলে সুন্নী মতাদর্শের ভিত্তিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার গুরু-দায়িত্ব পালনের সুযোগ বা সময়ই পাচ্ছেন না। আত্ম-কোন্দল ও পারস্পরিক অনৈক্যের কারণে তাঁরা নিতে পারছেন না সম্মিলিত কোন উদ্যোগই। অন্যদিকে, এরই সুবাদে গজিয়ে উঠেছে বিভিন্ন বাতিল ঐক্য' হয়ে পড়েছে এক দুষ্কর ব্যাপার। অপরদিকে, ইসলামের শত্রুরা হয়ে উঠেছে শক্তিশালী। আর লাঞ্ছিত হচ্ছে তাদেরই হাতে ঐ এককালের অজেয় মুসলিম জাতি।
চারঃ ক্বোরআন, সুন্নাহ্, ইজমা ও ক্বিয়াস- ইসলামের এ চার মৌলিক দলীল ক্বিয়ামত পর্যন্ত সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে, যা বাস্তবায়িত করে ইসলাম অপূর্ব সাফল্য লাভ করেছে। তা বাদ দিয়ে পরবর্তী মুসলিম বিশ্বের শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন মানবগড়া বিধি-বিধান ধার করতে আরম্ভ করেছে। ফলে তাদের নিশ্চিত অকৃতকার্যতা ইসলামকেও কলংকিত করেছে। এককালে যে পবিত্র ক্বোরআন-সুন্নাহর আদর্শ দিয়ে মুসলিম জাতি নিজেদেরকে এবং বিশ্বের অন্যান্য জাতিকেও ধন্য করেছিল এবং যার আলোকে তাদের পার্থিব ও পারলৌকিক ক্ষেত্রে মুক্তি দিয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করেছিল সে মুসলিম জাতি নিজেদেরই দুর্বলতার কারণে আপন আপন ভূমিতেও সে নি'মাত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের এ দেশ বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এদেশ ইসলামের প্রকৃত মতাদর্শ ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে পারেনি। এর কারণ খুঁজতে গেলেও উপরোক্ত কারণগুলোই সামনে আসে। একদিকে সত্যপন্থী সুন্নী মতাদর্শীরা এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেননি, অন্যদিকে ইসলামের মুখোশ পরে ইসলামেরই দোহাই দিয়ে রাজনীতি করতে এসে কিছু কিছু ভ্রান্ত মতবাদী সম্প্রদায় তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসঞ্জাত বিভিন্ন ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামের স্বচ্ছ সুন্দর চেহারায় কালিমা লেপন করেছে। বিগত স্বাধীনতা যুদ্ধেই এদের অনেকের স্বরূপ বিশেষভাবে উন্মোচিত হয়েছে। এসব দলের মধ্যে পাকিস্তানের কুখ্যাত মওদুদীর অনুসারী জামায়াতপন্থীদের কথাই সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বিগত স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত পন্থীদের হীন কর্মকাণ্ডকে শুধু ধর্ম নয়, দেশের কোন শ্রেণীর মানুষই ধিক্কার না দিয়ে পারেনি। তদানিন্তন সরকার উক্ত দলটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জনগণেরই সেই ঘৃণা ও ধিক্কারের যথাযথ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। অতঃপর সেই সরকার প্রধানের আবার উদারতার ফলে সাধারণ ক্ষমার সুবাদে আবারও তারা ক্রমশঃ এদেশে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের স্থান গড়ে নিয়েছে। এর পরবর্তী সরকারের নেপথ্যে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে তারা তাদের বিভিন্ন চক্রান্তমূলক কর্মতৎপরতা চালানোর সুযোগ লাভ করলো; যা বর্তমানে এদেশবাসীর নিকট গোপন নয়।
সে জামায়াতীদের উদ্দেশ্যেমূলক পদক্ষেপসমূহের মধ্যে তাফসীরুল ক্বোরআনের নামে বিভিন্ন জায়গায় সভা-মাহফিলের আয়োজন অন্যতম। এদেশের লোক সাধারণতঃ ধর্মপ্রাণ। আউলিয়া কেরাম ও ওলামা কেরামের প্রচেষ্টার ফলে এদেশের সরলপ্রাণ মুসলমানগণ পবিত্র ক্বোরআনের প্রতি বিশেষভাবে ধাবিত। এ সত্যটা জামায়াতীরা বুঝতে পেরে সেটাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে কসূর করেনি। তারা সুপরিকল্পিতভাবে এমন কিছু লোককে মুফাসসিরে ক্বোরআন সাজালো, যাদের কন্ঠ ও বাক-চাতূর্যই একমাত্র সম্বল; যাদের না আছে মাদ্রাসা শিক্ষার কোন সনদ। কারো কারো সনদ থাকলেও তাদের মধ্যে তাফসীর করার মত শরীয়তসম্মত যোগ্যতা নেই। অথচ সুললিত কন্ঠে ও বাক-চাতূর্য্যের মাধ্যমে ক্বোরআনের তাফসীরের সূরে মওদুদী মতবাদ প্রচারেই তারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত। জামায়াত-পন্থীদের আয়োজিত মাহফিলে স্বপক্ষীয়দের দ্বারা সংরক্ষিত মঞ্চে সেই পরিকল্পিত বক্তব্য অনেকটা জোর কন্ঠে আওড়াতেও ওরা পটু।
উক্তসব সাজানো মুফাসসিরের মধ্যে মৌলভী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বেশ কয়েক বৎসর ধরে তার ভ্রান্ত তাফসীর আমরা লক্ষ্য করে আসছি। বেশ কয়েক বার পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু তার পক্ষ থেকে কোনরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। বিধায় তার ও তার সহকারীদের ভ্রান্ত তাফসীর-এর স্বরূপ উন্মোচনের উদ্দেশ্যে আমি এ প্রামাণ্য পুস্তকখানা লেখার প্রয়াস পেলাম।
এ পুস্তককে মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও তার সহকারীদের তথাকথিত তাফসীরের ক্যাসেট ও জামায়াতপন্থীদের প্রচারিত বই-ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে তার আপত্তিমূলক বক্তব্যের খণ্ডন করা হয়েছে।
পুস্তকখানা 'মাসিক তরজুমানে' বিগত '৮৭ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হলে তা পাঠক সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। দেশের কোন কোন সাপ্তাহিক পত্রিকায় এর বরাত দিয়ে সাঈদী সাহেবকে জবাব দেয়ার প্রতি আহ্বানও জানানো হয়েছে। কিন্তু তবুও তার পক্ষ থেকে কোন জবাব আসেনি। পরিশেষে, পাঠক সমাজে বিশেষ চাহিদার প্রেক্ষিতে পুস্তকটা প্রকাশিত হওয়া যুগের দাবী হিসেবে বিবেচিত হয়।
এতে তাদের প্রত্যেকটা আপত্তিকর বক্তব্যের প্রথমে হুবহু উদ্ধৃতি দেয়া হয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ে উক্ত বক্তব্য পর্যালোচনা করে তা থেকে pointout করা হয়েছে। আর তৃতীয় অধ্যায়ে সেটার সপ্রমাণ খণ্ডন করা হয়েছে।
পুস্তকখানা একদিকে জামায়াতপন্থীদের ভ্রান্ত তাফসীরের স্বরূপ উন্মোচন করবে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরীয়তের সঠিক ফয়সালা সম্পর্কে পাঠক সমাজকে সম্যক অবগত করবে বলে দৃঢ় আশা। আল্লাহ্ পাক কবূল করুন! আমীন!
***********************
ভ্রান্ত তাফসীরঃ নমুনা–১
১৯৮৭ ইংরেজীর জানুয়ারী মাসে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ময়দানে 'ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ' কর্তৃক আয়োজিত 'তাফসীরুল কোরআন মাহফিল'-এর ২য় দিনে নিম্নলিখিত আয়াতের তাফসীর (?) করেন–তথাকথিত আন্তর্জাতিক মুফাস্সিরে ক্বোরআন
মৌং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীঃ
حٰم۞تَنۡزِيۡلُ الۡكِتٰبِ مِنَ اللّٰهِ الۡعَزِيۡزِ الۡلِيۡمِ۞ۙغَافِرِ الذَّنۢبِ وَ قَابِلِ التَّوۡبِ شَدِيۡدِ الۡعِقَابِ ذِیۡ الطَّوۡلِ۔لَا اِلٰهَ اِلَّا هُوَ۔اِلَيۡهِ الۡمَصِيۡرُ۞
(سورة المؤمن)
এক
এ আয়াতের তাফসীরের নামে মৌং সাঈদী সাহেব সেদিন যে দীর্ঘ বক্তব্য পেশ করলেন তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি তার বক্তব্যে কোন নির্ভরযোগ্য 'তাফসীর'-এর তোয়াক্কা করেননি; বরং মনগড়াভাবে ইসলামের নামে আত্মপ্রকাশ করা একটা ভ্রান্ত মতবাদী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক বক্তব্যই পেশ করেছেন মাত্র। এ দিনের বক্তব্যে তিনি উল্লেখিত আয়াতের ذِیۡ الطَّوۡل ও اِلٰه ('যিত্ তাওলি' ও 'ইলাহ') এ দু'টি শব্দের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। আর, এ দু'টি শব্দের এমন ব্যাখ্যা (তাফসীর) পেশ করলেন, যা একদিকে পবিত্র ক্বোরআন মজীদের নির্ভরযোগ্য কোন তাফসীরের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই বিভ্রান্তিপূর্ণ; অন্যদিকে, তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা যারা পোষণ করেনা, তাদের সবাইকে মনগড়াভাবে 'মুশরিক'(!) ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করার উদ্দেশ্যেই প্রকাশ করে মাত্র।
যেমন, তিনি اِلٰه (ইলাহ) শব্দের অর্থ বলেন– "সাহায্যকারী, সহযোগী, সর্বশক্তিমান, সব কিছুর মালিক, আইনদাতা, বিধানদাতা, শাসনকর্তা"। তিনি আরো বলেন, "ইলাহ্' কি? ইলাহ হলো– মুশরিকরা কল্পিতভাবে কাউকে না কাউকে, দেব-দেবীকে, বিভিন্নভাবে কাউকে সাহায্যকারী, সহযোগী, সাহায্যপ্রদানকারী, অভাব দূরকারী, প্রয়োজন মেটাতে পারে, এমনভাবে কাউকে না কাউকে মনে করতো-দোয়া শ্রবণকারী, অনিষ্ট সাধনকারী-মুশরিকরা মনে করতো। এখানে বলা হচ্ছে– ক্বোরআন নাযিল হয়েছে এমন এক সত্তার কাছ থেকে যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই, অর্থাৎ যিনি বিশ্ব জাহানকে পরিচালনা করছেন। একক শক্তির বলে, একক ক্ষমতার বলে তিনি সবকিছু পরিচালনা করছেন। ক্বোরআন শরীফে এ ধরণের 'গায়রুল্লাহ্' (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ)-কে অস্বীকার করে এক আল্লাহর উলুহিয়্যাৎকে মেনে নেয়ার জন্য বলা হয়েছে, ক্ষমতা আর কারো নেই। সমস্ত ক্ষমতা হলো একমাত্র আল্লাহর জন্য কেন্দ্রীভূত। তিনি ছেলে দেয়ার মালিক, ছেলে না দেয়ার মালিক, খেতে ও পরতে দেয়ার মালিক, ব্যবসায় উন্নতি দেয়ার মালিক, বিপদ থেকে বাঁচাবার মালিক, রোগমুক্ত করার মালিক, হায়াতের মালিক, মওতের মালিক। তিনি হচ্ছেন 'ইলাহ্'। 'ইলাহ' মানে 'আইনদাতা, বিধান দাতা।' সুতরাং এক কথায়, আল্লাহ্ যে একমাত্র ইলাহ্, এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, আর অন্যদেরকে যত ক্ষমতা আছে বলে মনে করা হয়, সমস্ত বিশ্বাসকে একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত করতে হবে। কোন খাজার ক্ষমতা নাই কাউকে একটা ছেলে দেয়ার, কোন খাজাবাবার ক্ষমতা নাই কারো বিপদ থেকে মুক্ত করার। কোন দয়াল বাবার ক্ষমতা নাই কাউকে কোনক্রমে বিপদ-মুসীবৎ থেকে রক্ষা করার, ব্যবসায় বিরাট উন্নতি করে দেয়ার। এযে মানুষের উপর এ জাতীয় বিশ্বাস করা হয়- এ সমস্ত মুশরিকানা বিশ্বাস।"
'ইলাহ' শব্দের তিনি (মৌং সাঈদী) যে অর্থ পেশ করলেন, সে অর্থের ভিত্তিতে তিনি আরো বলেন–
"মানুষ অনেককে 'ইলাহ' বলে মেনে নিয়েছে। তা নাহলে কবরের কাছে গিয়ে এত কান্নাকাটি কেন? কবরের উপর চাদর কেন? কবরের উপর আগর বাতি কেন? গোলাপ পানি কেন? গম্বুজ কেন? তার কারণ কি? এর কারণ হলো– 'মানুষেরা, যারা কবরে শুয়ে আছেন তাদেরকে 'ইলাহ' মেনে করেছে। কবরে যারা শুয়ে আছে তাদের কোন ক্ষমতা নাই। খোদার কছম, কবরে যিনি শুয়ে আছেন তাঁর কোন ক্ষমতা নাই। অন্য কাউকে ক্ষমতাবান যদি মনে করেন, তবে মুসলমানদের খাতায় নাম থাকবে না, নাম উঠবে মুশরিকদের খাতায়।"
তিনি আরো বলেন, "মানুষের ভিতরে কেউ খাজা বাবারে ইলাহ বানাইছে, কেউ দয়াল বাবারে 'ইলাহ' বানিয়ে নিয়েছে, কেউ প্রেসিডেন্টকে 'ইলাহ' বানিয়ে নিয়েছে, কেউ দেশের আইনকে 'ইলাহ' বানিয়েছে, কেউ মন্ত্রীকে 'ইলাহ' বানিয়েছে, কেউ নিজের কোন হুযূরকে নিজের 'ইলাহ' বানিয়েছে, কেউ নিজের নাফসকে 'ইলাহ' বানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বলেন– "লাইলাহা ইল্লাহুয়া" অর্থাৎ এগুলো 'ইলাহ' না; 'ইলাহ' হলেন– আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন।"
দুই
পর্যালোচনা
মৌং সাঈদী সাহেব পবিত্র ক্বোরআনের দোহাই দিয়ে যা বলতে চান তার টার্গেট এদেশের মুশরিক-বিধর্মীরা নয়, বরং এদেশের সত্যপন্থী, সরলপ্রাণ মুসলমানরাই। এদেশের মুসলমানদেরকে ইসলামের সঠিক রূপরেখা 'সুন্নী মতাদর্শ' থেকে ফিরিয়ে বিপথে (সাঈদী সাহেবের সমর্থিত মওদুদী মতবাদের দিকে) ধাবিত করা-ই তার উদ্দেশ্য। তিনি বলতে চানঃ
এক) উক্ত আয়াতটা সেসব মুসলমানদের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে, যারা আউলিয়া কেরামের খোদা-প্রদত্ত ও ক্ষমতায় বিশ্বাসী।
দুই) এ দেশের মুসলমানরা আউলিয়া কেরাম প্রমুখকে 'ইলাহ' (উপাস্য) বলে বিশ্বাস করেন।
তিন) নবী ও ওলীগণের মাযার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাওয়া শির্ক।
চার) নবী ও ওলীগণের ওফাতের পর তাঁদের কোন ক্ষমতা থাকেনা।
পাঁচ) মাযার নির্মাণ, গিলাফ দেয়া, আগর বাতি জ্বালানো ইত্যাদি শির্ক।
আর মৌং সাঈদী তার এসব দাবীর স্বপক্ষে নিম্নলিখিত তথাকথিত প্রমাণাদিও পেশ করেনঃ
এক) ক্বোরআন তার সামনে আছে।
দুই) 'খোদার শপথ করে বলছি।'
তিন)
يَا اَيُّهَا النَّاسُ اذۡكُرُوۡا نِعۡمَةَ اللهِ عَلَيۡكُمۡ هَلۡ مِنۡ خَالِقٍ غَيۡرِ اللهِ يَرۡزُقُكُمۡ مِنَ السَّمَاءِ وَ الۡاَرۡضِ
(আল্লাহ্ ছাড়া কোন রিয্কদাতা নাই।)
চার)
لَا اِلٰهَ اِلَّا هُوَ فَاَنّٰی تُؤۡفَكُوۡنَ
(আল্লাহ্কে ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া নিষিদ্ধ।)
পাঁচ)
قُلۡ اَرَأَيۡتُمۡ اِنۡ اَخَذَ اللهُ سَمۡعَكُمۡ وَ اَبۡصَارَكُمۡ وَ خَتَمَ عَلٰی قُلُوۡبِكُمۡ مَنۡ اِلٰهٌ غَيۡرُ اللهِ يَأۡتِيۡكُمۡ
(আল্লাহর বাতিলকৃত শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেয়ার মত কোন 'ইলাহ্'নেই।)
ছয়)
قُلۡ اَرَأَيۡتُمۡ اِنۡ جَعَلَ اللهُ عَلَيۡكُمُ اللَّيۡلَ سَرۡمَدًا اِلٰی يَوۡمِ الۡقِيٰمَةِ مَنۡ اِلٰهٌ غَيۡرُ اللهِ يَأۡتِيۡكُمۡ بِضِيَاءٍ۔ اَفَلَا تَسۡمَعُوۡنَ۞
(আল্লাহ্ রাতকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ করতে চাইতে রাতকে সরিয়ে দিন আনার মত কোন্ 'ইলাহ' নেই।)
সাত)
قُلۡ اَرَأَيۡتُمۡ اِنۡ جَعَلَ اللهُ عَلَيۡكُمُ النَّهَارَ سَرۡمَدًا اِلٰی يَوۡمِ الۡقِيٰمَةِ مَنۡ اِلٰهٌ غَيۡرُ اللهِ يَأۡتِيۡكُمۡ بِلَيۡلٍ تَسۡكُنُوۡافِيۡهِ۔ اَفَلَا تُبۡصِرُوۡنَ۞
(আল্লাহ্ যদি চান দিনকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত লম্বা করে দিতে, তবে দিনকে সরিয়ে রাত আনার মত কোন 'ইলাহ' নেই।)
[এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মৌং সাঈদী বলেন, "কোন খাজা বাবার শক্তি আছে– রাতকে সরিয়ে দিনের আলো এনে দেয়ার? তা যদি না থাকে তাহলে মাযারে কেন যাও? সব মসজিদে দৌঁড়াবে"।]
আট)
وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِهٖ اٰلِهَةً لَايَخۡلُقُوۡنَ شَيۡئًا وَّهُمۡ يُخۡلَقُوۡنَ۞
(আল্লাহকে বাদ দিয়ে এ লোকগুলোকে, যাদেরকে 'ইলাহ' বলে মেনে নিয়েছে ওরা কেউ কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা, বরং ওরা সৃষ্ট হয়েছে। –সাঈদী)]
[এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাঈদী বলেন, –"ওরা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহ্ বলেন– যাদেরকে 'ইলাহ' বানিয়েছে, সেটা দেব-দেবী হোক আর সেটা খাজা হোক, আর যাই হোক না কেন, ওরা নিজেরাই তৈরী হয়েছে। তারা কিছুই তৈরী করতে পারেনা।" এমনকি একটা ঘাস বা একটা পিঁপড়াও না"।]
নয়)
وَلَايَمۡلِكُوۡنَ لِاَنۡفُسِهِمۡ ضَرًّا وَّ لَا نَفۡعًا وَّ لَايَمۡلِكُوۡنَ مَوۡتًا وَّ ۞لَاحَيٰوةً وَّ لَانُشُوۡرًا
(ওরা নিজেরা নিজের উপকার করতে পারেনা, কোন ক্ষতি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেনা। ওরা হায়াত ও মওতের মালিক না। পুনরুত্থানের ব্যাপারেও তাদের কোন ক্ষমতা নেই। –সাঈদী)
দশ)
قُلۡ اَرَأَيۡتُمۡ مَّا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللهِ اَرُوۡنِیۡ مَاذَا خَلَقُوۡا مِنۡ الۡارۡضِ اَمۡ لَهُمۡ شِرۡكٌ فِی السَّمٰوٰتِ۔
(আসমান ও যমীন বানানোর ব্যাপারে 'মিন-দূনিল্লাহ্' -এর কোন ক্ষমতা নেই। –সাঈদী)
এগার)
لَوۡ كَانَ فِيۡهِمَا اٰلِهَةٌ اِلَّا اللهُ لَفَسَدَتَا ج..........عَمَّا يَصِفُوۡنَ
(একাধিক 'ইলাহ' থাকলে আসমান-যমীন ধ্বংস হয়ে যেত। যেমন মাঝি বেশী হলে নৌকার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।)
তিন
মৌং সাঈদীর প্রতি জবাব
প্রথমতঃ মৌং সাঈদী সাহেব 'ইলাহ' শব্দের যে অর্থ বলেছেন তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
কারণ, 'ইলাহ্' শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে– 'মা'বুদ' বা 'উপাস্য'। যেমন– "আল্লামা রাগেব ইস্পাহানীকৃত প্রসিদ্ধ 'আলমুফরাদাত'-এ উল্লেখ করা হয়েছে– اِلٰه (ইলাহ) শব্দটা الله (আল্লাহ) শব্দের সমার্থক। 'আলিফ-লাম' (ال) সেটার সাথে সংযোজন করা হয়েছে। অতঃপর 'ইলাহ' (اِلٰه)-এর 'হামযাহ'-(همزه) টা বিলুপ্ত করা হয়েছে। 'ইলাহ' (اِلٰه) শব্দটা আল্লাহর জন্য খাস। এদিকে ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন– هَلۡ تَعۡلَمُ لَهٗ سَمِيًّا ; তাছাড়া, কাফির ও মুশরিকগণ তাদের সমস্ত উপাস্য বস্তুকে 'ইলাহ' বলে আখ্যায়িত করতো। যেমন– তারা সূর্যের উপাসনা করতো, তাই তারা সেটাকে 'ইলাহ' বলে আখ্যায়িত করতো। لَآِ اِلٰهَ اِلَّا الله (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই), لَآ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ (তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।) ইত্যাদি কলেমা দ্বারা সেসব মুশরিকদের দাবীর খণ্ডন করা হয়েছে। তাদেরই উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা বা ইবাদত করলে সে মুশরিক হয়ে যাবে। যেমন– মুশরিকগণ মূর্তিকে তাদের উপাস্য মনে করে সেগুলোর পূজা করে। (আল-মুফরাদাতঃ ২১ পৃষ্ঠা)
এ কারণেই নির্ভরযোগ্য সমস্ত তাফসীরে সাঈদী সাহেবের তাফসীরকৃত (!) আয়াতের অংশ "লা-ইলাহা ইল্লা হুয়া' - এর মধ্যেকার 'ইলাহ্' শব্দের অর্থ বলা হয় 'মা'বূদ' বা উপাস্য। (তাফসীরে বায়যাবী, কাশশাফ, খাযাইন ইত্যাদি দ্রষ্টব্য।) বস্তুতঃ সাঈদী সাহেব 'ইলাহ' শব্দের অর্থ করতে গিয়ে আল্লাহর যেসব গুণবাচক শব্দের অবতারণা করলেন সেগুলো 'ইলাহ' শব্দের শাব্দিক অর্থ-নয়; বরং সেগুলো বুঝানোর জন্য نَصِيۡرٌ (সাহায্যকারী), وَلِیٌّ (সাহায্যদাতা), مُعِين(সাহায্য প্রদানকারী), مُغۡنِیٌّ (অভাব দূরকারী), قدير (সর্বশক্তিমান), مَالك (সব কিছুর মালিক), شارع (আইনদাতা, বিধানদাতা), احكم الحاكمين (সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনকর্তা) ইত্যাদি আলাদা আলাদা গুণবাচক নাম বা শব্দ রয়েছে। কিন্তু সাঈদী সাহেব 'ইলাহ' শব্দের প্রকৃত অর্থকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে অন্য এমনসব অর্থ বললেন, যাতে তার পরিকল্পিত মতলব পূরণ করতে পারেন, যা ক্বোরআনের মনগড়া তাফসীরেরই নামান্তর মাত্র।
দ্বিতীয়তঃ আয়াতাংশ ذی الطول - এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ্ অধিক সাওয়াবদাতা, অবধারিত শাস্তি ক্ষমা করে অনুগ্রহ প্রদর্শনকারী। (বায়যাবী, জালালাঈন, খাযাইন ইত্যাদি) কিন্তু সাঈদী সাহেব এ শব্দটার অর্থ বা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বললেন- এটা নাকি নবী ও ওলীগণের নিকট সাহায্যের জন্য না যাওয়ার নির্দেশবহ। (নাঊযুবিল্লাহ্!)
তৃতীয়তঃ সাঈদী সাহেবের বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্ট মনে হয় যেন সূরা 'আল-মু'মিনের' প্রথম আয়াতটা সেসব মু'মিন-মুসলমানের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে, যারা আউলিয়া কেরামের খোদাপ্রদত্ত ক্ষমতা ও মর্যাদায় বিশ্বাসী। বস্তুতঃ আয়াতের শানে নুযূল ও মর্মার্থ তা নয়। আয়াতের মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য হচ্ছে- যেহেতু সূরাটা মক্কী, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সূরা নাযিল হয়েছে, যখন মক্কার লোকেরা আল্লাহর সঠিক পরিচয় পায়নি, যেহেতু এ সূরা নাযিল করে আল্লাহ্ তা'আলা এতে, বিশেষ করে সূরার প্রথম আয়াতে উৎসাহ প্রদান ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মক্কাবাসী তথা গোটা বিশ্ববাসীকে একমাত্র আল্লাহ্কেই উপাস্য বলে মেনে নেয়ার অপরিহার্যতা সম্পর্কে অনুধাবন করিয়েছেন। যেমন-
এক) তাফসীরে বায়যাবী শরীফে উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর উল্লেখ করা হয় এভাবেঃ
۞ِحٰم ۞ تَنۡزِيۡلُ الۡكِتٰبِ مِنَ اللهِ الۡعَزِيۡزِ الۡعَلِيۡم
(অর্থাৎ "এ কিতাব (ক্বোরআন মজীদ) অবতীর্ণ হয়েছে এমন এক সত্তার নিকট থেকে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ।) এখানে আল্লাহর দু'টি গুণ বিশেষভাবে এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেহেতু পবিত্র ক্বোরআনে এমন অকাট্য দলীলাদি এবং হিকমত বিদ্যমান, যা আল্লাহর পরিপূর্ণ কুদরত এবং যথাযথ হিকমত (প্রজ্ঞা)-এর প্রমাণ বহন করে।
غَافِرِ الذَّنۡبِ وَقَابِلِ التَّوۡبِ شَادِيۡدِ الۡعِقَابِ ذِیۡ الطَّوۡلِ
(অর্থাৎঃ এবং গুনাহ্ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, তার শাস্তি অতীব কঠিন, মহা পুরস্কারদাতা।) এগুলো হচ্ছে আল্লাহর আরো কতেক গুণ। এগুলো এ কথা প্রমাণ করার জন্য যে, পবিত্র ক্বোরআন মজীদে উৎসাহ প্রদান, ভীতি প্রদর্শন এবং ক্বোরআন মজিদের উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ ইত্যাদি বিষয়বস্তু বিদ্যমান। ক্বোরআন পাকের উদ্দেশ্য হচ্ছে পুরোপুরিভাবে সেই মহান আল্লাহর দিকে মানুষকে ঝুঁকিয়ে দেয়া, যিনি গুনাহ্ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী। পক্ষান্তরে, তাঁকে অস্বীকারকারী মুশরিক-কাফিরদের জন্য তাঁর শাস্তি অতীব কঠিন। তিনি ذی الطوۡل ; এখানে طول মানে মুসলমদের মধ্যে যারা শাস্তির উপযুক্ত তাদের শাস্তি মওকুফ করে দিয়ে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা। সুতরাং ذی الطول মানে– 'শাস্তি মওকুফ করে দিয়ে অনুগ্রহ প্রদর্শনকারী।' অতঃপর এরশাদ হয় لَٓااِلٰهَ اِلّاهُوَ (তিনি ব্যতীত অন্য কোন 'মা'বূদ' নেই।) সুতরাং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের প্রতি পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করা বাঞ্ছনীয়।
اِلَيۡهِ الۡمَصِيرُ (তাঁরই প্রতি ফিরে যেতে হবে।) অতঃপর তিনি অনুগত ও অবাধ্যদেরকে নিজ নিজ কর্মফল প্রদান করবেন। (তাফসীরে বায়যাবীঃ ২য় খণ্ডঃ ২৫২ পৃষ্ঠা)
দুই) তাফসীরে জালালাঈন শরীফে উল্লেখ করা হয়– "হা-মীম (এ বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ্ই সর্বাধিক জ্ঞাত।) কিতাব বা ক্বোরআন মজীদ নাযিল হয়েছে সেই মহান আল্লাহর নিকট থেকে যিনি আপন রাজত্বে পরাক্রমশালী, (স্বীয় সৃষ্টি সম্পর্কে) সর্বজ্ঞ, (মু'মিনদের জন্য) গুনাহ্ ক্ষমাকারী, এবং (তাদের) তওবা কবুলকারী, তাঁর শাস্তি অতীব কঠিন, প্রশস্ত পুরস্কারের মালিক, (অধিক সাওয়াবদাতা); শাস্তির উপযোগী গুনাহ্গারদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী। তিনি ব্যতীত কোন মা'বূদ নেই এবং তাঁরই প্রতি প্রত্যাবর্তন করতে হবে।" (তাফসীরে জালালাঈন শরীফ)
তিন) তফসীরে 'খাযাইনুল ইরফান'- এ উল্লেখ করা হয়– "হা-মীম। এ কিতাব নাযিল করা আল্লাহর নিকট থেকে, যিনি ইজ্জতওয়ালা, গুনাহ্ ক্ষমাকারী এবং তাওবা কবুলকারী (ঈমানদারদের), কঠিন শাস্তিদাতা (কাফিরদেরকে), মহা পুরস্কারের মালিক ('আরিফ' বান্দাদের জন্য), তিনি ব্যতীত অন্য কোন'মা'বূদ'(উপাস্য) নেই। তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে (অর্থাৎ বান্দাদেরকে আখিরাতে)। (কানযুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান)
তাছাড়া, এ পবিত্র আয়াত নাযিল করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাফসীরে খাযাইনুল ইরফানে আরো উল্লেখ করা হয়– "যেহেতু পবিত্র ক্বোরআন মজীদ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, সেহেতু সেটাকে মান্য করার ক্ষেত্রে বিতর্ক করা কোন মু'মিনের কাজ হতে পারে না। যেমন, এ সূরায়ই এর পরবর্তী আয়াতে এরশাদ হয়েছে– "আল্লাহর আয়াতগুলোর মধ্যে বিতর্ক করে না, কিন্তু কাফির।" আর ক্বোরআনে ঝগড়া-বিতর্ক করা মানে- 'আল্লাহর আয়াতের প্রতি তিরস্কার করা, মিথ্যাবাদ দেয়া ও অস্বীকার করা'। কিন্তু জটিল বিষয়ের সমাধানের জন্য জ্ঞানগত ও মূলনীতিগত পর্যালোচনা করা (পবিত্র ক্বোরআনের ভুলব্যাখ্যা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও খণ্ডন করা ইত্যাদি) ঐ ধরণের ঝগড়া বা বিতর্কের পর্যায়ে পড়েনা; বরং সেটা হবে মহান আনুগত্য ও ইবাদত। কাফিরদের ঝগড়া-বিতর্ক আল্লাহর আয়াতসমূহে এ ছিল যে, তারা ক্বোরআন পাককে 'যাদু' বলতো, কখনো 'কবিতা' বলতো, কখনো আবার 'গণনা-শাস্ত্র' বলতো, কখনো 'পুরানা কিচ্ছা-কাহিনী' বলে আখ্যায়িত করতো।"
কিন্তু মৌং সাঈদী সাহেব কোন প্রকার উদ্ধৃতি ছাড়াই আয়াতের মনগড়া তাফসীর পেশ করলেন। বিশেষ করে, 'ইলাহ' ও 'যিত্ তাওল' শব্দ দু'টির সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নবী ও ওলীগণকে মুশরিকদের মূর্তিগুলোর স্থানে এবং তাঁদের খোদা-প্রদত্ত ও নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি সম্মত সম্মান, মর্যাদা ও ক্ষমতায় বিশ্বাসী মু'মিনদেরকে মূর্তিপূজারীদের স্থানে বসিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন। বস্তুতঃ নবী ও ওলীগণের মর্যাদা সম্পর্কে সাঈদীর উক্ত মন্তব্য জমায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মৌং মওদুদীরই ভ্রান্ত মতবাদের অনুসরণ বৈ-কিছুই নয়।
চতুর্থতঃ শরীয়তের যে কোন মাসআলা প্রমাণ করতে হবে ক্বোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসের ভিত্তিতে। এটাই হচ্ছে ওলামা কেরামের নিয়ম। কিন্তু তা না করে সাঈদী সাহেব প্রয়াশঃ তাঁর বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে বলে থাকেন- 'আমি খোদার কছম করে বলছি, ক্বোরআন আমার সামনে আছে।' এটা কিসের আলামত? পবিত্র ক্বোরআনের ভাষায়, কথায় কথায় শপথ করা মুনাফিক ও ইহুদীদের স্বভাব। সাধারণতঃ মূর্খরাই এ ধরণের পন্থা অবলম্বন করে থাকে। অবশ্য, কলেজিয়েট ময়দানে অনুষ্ঠিত তাফসীরুল ক্বোরআন (!) মাহফিলের ৩য় দিনের ('৮৭) এডিশনাল মুফাসসির (!) মৌলভী লুৎফর রহমান সাহেবের 'শপথ করা' সম্পর্কিত বক্তব্যটা এখানে তুলে ধরলাম। উক্ত মৌং লুৎফর রহমান সাহেব বলেন– "কছম করা কোন নামী-দামী লোকের কাজ নয়। প্রাচীন ইরানের একটা প্রবাদ আছে– 'এক কথা তুমি একবার বলেছ, আমি বিশ্বাস করেছি। একই কথা যখন দু'বার বলেছ আমি সন্দেহ করেছি। একই কথা যখন তিনবার বলেছ, তখন তোমার কথা মিথ্যা বলে আমার সন্দেহ জেগেছে। আর যখন তুমি কসম করেছ, তখন তোমার কথা বিশ্বাস করার মত কোন কারণ আমার নিকট থাকছে না।" তিনি আরো বলেন– "গ্রাম বাংলার আদম আলী, কদম আলী, কোব্বাত আলী, যত অজ পাড়া-গাঁয়ের মূর্খ, নিরেট গোঁড়া মানুষ, তারাই কসম করে থাকে। কিন্তু যাদের ব্যক্তিত্ব আছে এবং নিজের উপর নিজের একটা আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস আছে, তারাতো কসম করে না। যার ব্যক্তিত্ব আছে তিনি বলেন, 'আমি যা বলবো সেটা কথা।"
সুতরাং বুঝা গেল, মৌং সাঈদীর বক্তব্যগুলোর পেছনে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বাস্তবেও তাই।
পঞ্চমতঃ মৌং সাঈদী সাহেব বলেছেন যে, "এদেশের মুসলমানরা নাকি আউলিয়া কেরামকে 'ইলাহ্' বলে বিশ্বাস করেন। মানুষেরা খাজা বাবাকে, পীর সাহেবকে, নিজের কোন হুযূরকে, দেশের প্রেসিডেন্টকে, নিজের সাফ্সকেও নাকি 'ইলাহ' বানিয়ে নিয়েছে। এটা কি এদেশের মুসলমানদের প্রতি মৌং সাঈদীর জঘন্য অপবাদ নয়? অবশ্যই। কারণ, কোন মুসলমান-ঈমানদার যে কোন ওলীকে, নিজের পরীকে, তার হুযূরকে, কোন প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রীকে তার 'ইলাহ্' বানায় না এবং এমন ধারণাও করে না। একথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। এদেশের কোন মুসলমান কখনো এমন করেছে বলে নজীর নেই। তাঁরা কামিল পীর-দরবেশের নিকট বায়'আত গ্রহণ করে থাকেন। এটাতো সুন্নাত। তাঁরা আউলিয়া কেরামের মাজারে গিয়ে যিয়ারত করেন। যিয়ারত করাও তো পবিত্র হাদীস শরীফের ভাষায় সুন্নাত। মৌং সাঈদী সাহেব কি এমন সুন্নাতকেও 'শির্ক' বলে আখ্যায়িত করতে চান?
যিয়ারত করা ও যিয়ারত করার জন্য সফর করা যদি শির্ক হয় তবে হুযূর ﴾ﷺ﴿- এর হাদীস সহ নিম্নলিখিত দলীলগুলোর কী জবাব দেবেন?
(এক)
كُنۡتُ نَهَيۡتُكُمۡ عَنۡ زِيَارَةِ الۡقُبُوۡرِ فَزُوۡرُوۡهَا
অর্থাৎঃ "আমি তোমাদেরকে কবরসমূহ যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু (তা রহিত করা হলো; সুতরাং) এখন তোমরা সেগুলোর যিয়ারত কর।" (সিহাহ্)
দুই)
رُوِیَ عَنۡ اَبِیۡ شَيۡبَةَ اَنَّ النَّبِیَّ صَلَّی اللّٰهُ عَلَيۡهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأتِیۡ قُبُوۡرَ الشُّهَدَآءِ بِاُحُدٍ عَلٰی رَأۡسِ كُلِّ حَوۡلٍ
অর্থাৎঃ "হযরত ইবনে আবী শায়বাহ্ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﴾ﷺ﴿ প্রতি বছর উহুদের শহীদানের মাযারে তাশরীফ নিয়ে যেতেন।" (ফতোয়া শামীঃ ১ম খণ্ড বা-বু যিয়ারাতিল ক্বুবূর)
তিন)
عَنۡ رَسُوۡلِ اللّٰهِ صَلَّی اللّٰهُ عَلَيۡهِ وَسَلَّمَ يَأَتِیۡ قُبُوۡرَ الشُّهَدَآءِ عَلٰی رَأسِ كُلِّ حَوۡلٍ فَيَقُوۡلُ سَلَامٌ عَلَيۡكُمۡ بِمَا صَبَرۡتُمۡ فَنِعۡمَ عُقۡبٰی الدَّارِ وَ الۡخُلَفَآءُ الۡاَرۡبَعَةُ هٰكَذَا كَانُوۡا يَفۡعَلُوۡنَ.
অর্থাৎঃ হুযূর ﴾ﷺ﴿ থেকে বর্ণিত, তিনি প্রতি বছর শহীদানের মাযারে তাশরীফ নিয়ে যেতেন, আর তাঁদেরকে সম্বোধন করে বলতেন, 'সালামুন্ আলায়কুম বিমা সাবারতুম ফা নি'মা ওক্ববাদ্দার।" (তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, যেহেতু তোমরা তরবারির আঘাতে ধৈর্যধারণ করেছ। তোমাদের পরকাল কতই উত্তম!) খোলাফায়ে রাশেদীন (চার খলীফা লিঃ)-ও অনুরূপ তাঁদের মাযারে যেতেন। (এবং যিয়ারত করতেন)। (তাফসীরে কবীর ও তাফসীরে দুররে মানসূর)
চার) ইমাম শাফে'ঈ (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) বরকত লাভের উদ্দেশ্যে সফর করে ইমাম আবূ হানিফা (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি)-এর মাযারে যেতেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মুসলমানদের ন্যায় আমাদের দেশের মুসলমানরাও হুযূর ﴾ﷺ﴿, খোলাফায়ে রাশেদীন, মাযাহাবের ইমামগণ প্রমূখের অনুসরণে গাউসে বাগদাদ, খাজা গরীব নওয়ায, সালারে মাস'ঊদ, দাতা গঞ্জে বখ্শ (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহিম) প্রমূখ আউলিয়া কেরামের মাযার শরীফ যিয়ারত করে বরকত লাভ করে থাকেন। মৌং সাঈদী সাহেবকে কি তার অজ্ঞতা এতই দুঃসাহসী করে তুলেছে যে, তিনি পাইকারিভাবে সবাইকে 'মুশরিক' নামে আখ্যায়িত করে ছাড়ছেন?
বাকী, তাঁদের (আউলিয়া কেরাম) নিকট সাহায্য চাওয়া। তাওতো ক্বোরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং ক্বিয়াস মোতাবেক জায়েয আছে। এটাও তো এ জন্য যে, সমস্ত মু'মিন-মুসলমান মনেপ্রাণে একথা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। তিনি তাঁর নবীগণ এবং আউলিয়া কেরামকে তাঁদের জীবদ্দশায় এবং ওফাতের পর এমন ক্ষমতা দান করেন, যা দ্বারা তাঁরা আল্লাহর সৃষ্টির উপকার করতে পারেন। শরীয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয় 'ইস্তেমদাদে রূহানী'। এটা যদি সাঈদী সাহেবের মতে শির্ক হয়, তবে তিনি নিম্নলিখিত দলীলাদির কী জবাব দেবেন?
এক) তাফসীরে কবীরঃ ৩য় খণ্ডঃ পারা- ৭ সূরা 'আন'আম-এর আয়াত
وَلَوۡاَشۡرَكُوۡا لَحَبِطَ عَنۡهُمۡ مَّا كَانُوۡا يَعۡمَلُوۡنَ
-এর আলোকে উল্লেখ করা হয়–
وَثَالِثُهَا الۡاَنۡبِيَاءُ هُمُ الَّذِيۡنَ اَعۡطَاهُمُ اللّٰهُ تَعَالٰی مِنَ الۡعُلُوۡنِ وَ المعَارِفِ مَا لِاَجَلِهٖ يَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی التَّصَرُّفِة فِی بَوَاطِنِ الۡخَلۡقِ وَ اَرۡوَاحِهِمۡ وَاَيۡضًا اَعۡطَاهُمۡ مِنَ الۡقُدۡرَةِ وَ المَكۡنَةِ مَالِاَجَلِهٖ يَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی التَّصَرُّفِ فِی ظَوَاهِرِ الۡخَلۡقِ
অর্থাৎঃ "তৃতীয়তঃ নবীগণ (আলাইহিমুস্ সালাম) তাঁরা হলেন ঐসব হযরত যাঁদেরকে প্রতিপালক আল্লাহ্ তা'আলা এমন সব জ্ঞান ও মা'রেফাত দান করেছেন, যা দ্বারা তাঁরা মাখ্লূকের অভ্যন্তরীন অবস্থা ও তাদের আত্মসমূহের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং তাঁদেরকে এ পরিমাণ কুদরত বা শক্তি দান করেছেন, যা দ্বারা মাখলুকের প্রকাশ্য অবস্থার উপরও ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।"
দুই) 'মিশকাত শরীফঃ বা-বু যিয়ারাতিল ক্বুবূর' -এর হাশিয়ায় আছে–
وَاَمَّا الۡاِسۡتِمۡدَادُ بِاَهۡلِ الۡقُبُوۡرِ فِی غَيۡرِ النَّبِیِّ عَلَيۡهِ السَّلَامُ اَوِ الۡاَنۡبِيَآء فَقَدۡ اَثۡبَتَهُ المَشَآئِخُ الصُّوۡفِيَّةُ وَ بَعۡضُ الۡفُقۡهَآءِ قَالَ الۡاِمَامُ الشَّافِعِیؒ قَبۡرُمُوۡسٰی الۡكَاظِمِ تِرۡيَاقٌ مُّجَرَّبٌ لِاَجَابَةِ الدُّعَاءِ وَقَالَ الۡاِمَامُ الغَزَّّالِیُّ مَنۡ يُّسۡتَمَدُّ فِی حَيَاتِهٖ يُسۡتَمَدُّ بَعۡدَ وَفَاتِهٖ
অর্থাৎঃ রসূলে করীম﴾ﷺ﴿ এবং অন্যান্য নবীগণ (আলাইহিস্ সালাম) ছাড়াও অন্যান্য কবরবাসী থেকে কিছু চাওয়ার বৈধতাকে সুফী ও মাশাইখে কেরাম এবং ফক্বীহগণের একটা বিরাট সংখ্যা স্বীকার করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) বলেছেন– "হযরত মুসা কাযেম (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু)- এঁর মাযার শরীফ প্রার্থনা কবুল হবার জন্য বিষ-পাথরের ন্যায় পরীক্ষিত।" ইমাম গাযযালী (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) বলেছেন– "যে সব বুযর্গের নিকট থেকে তাঁদের জীবদ্দশায় সাহায্য চাওয়া যায়, তাঁদের নিকট তাঁদের ওফাতের পরও সাহায্য চাওয়া যায়।"
তিন) তাফসীরে কবীর, রূহুল বয়ান ও তাফসীরে খাযিনঃ সূরা য়ূসুফঃ আয়াত–
فَلَبِثَ فِی السِّجۡنِ بِضۡعَ سِنِيۡنَ
-এর তাফসীর উল্লেখ করা হয়–
اَلۡاِسۡتِعَانَةُ بِالنَّاسِ فِی دَفۡعِ الضَّرَرِ جَائِزٌ
অর্থাৎঃ "মুসীবতের সময় মানুষের সাহায্য গ্রহণ করা জায়েয।"
আর সাঈদী সাহেব বললেন– এদেশের লোকেরা দেশের আইন, প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রীকে 'ইলাহ্' বলে মেনে নিয়েছে। সেটার কোন বাস্তবতা আছে বলে কল্পনাও করা যায় না। এমন উদ্ভট কথাও কি তিনি রচনা করতে পারেন? আর যদি তিনি বলেন যে, দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে, দেশের কোন সম্মানিত মন্ত্রীকে কিংবা দেশের আইন-কানুনকে মান্য করাই শির্ক, তাহলে কি তিনি তাদেরকে মানেন না? যদি তা-ই হয় তাহলে জমায়াতে ইসলামীর আমীরেরা যে বলেছেন– "১৯৭২ ইংরেজীর সংবিধান জাতির পবিত্র আমানত"– এ কথার মতলব কি? আর সেটার অধীনে তাঁরা আবার নির্বাচনেই বা যান কেন? এ সংবিধানের অধীনে সংসদে আইন পাশ করার জন্য তিনিও তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন কেন? তাঁর ঐ বক্তব্য কি একথা প্রমাণ করেন না যে, জমায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ যদি প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রী হন, আর তাঁদেরকেও যদি এ দেশের লোকেরা কখনো মেনে নেন (খোদা না করুক।) তাহলে তাও 'শির্ক' হবে? আর কোন প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রীকে নিয়ম মোতাবেক সম্মান করলেও কি শির্ক হয়ে যাবে?
ষষ্ঠতঃ মৌং সাঈদী সাহেবের দাবী হচ্ছে– 'যিনি কবরে শুয়ে আছেন– যেমন নবী, ওলী, তাঁর কোন ক্ষমতা নেই। (অর্থাৎ নবী ও ওলীগণের ওফাতের পর তাঁদের কোন ক্ষমতা থাকে না।) তাই মাযারে যেতে নেই, বরং দৌড়াতে হবে মসজিদের দিকে।'
এটাও মৌং সাঈদীর নিছক ভ্রান্তির পরিচায়ক। কারণ, এ বক্তব্যের পক্ষে ইসলামের চার দলীলের কোনটাই নেই। মসজিদে যাবার জন্য তো কেউ নিষেধ করে না। মুসলমান বলতেইতো মসজিদে গমনাগমন করাকে পূণ্যময় মনে করেন। মৌং সাঈদী সাহেব যে মাযারে যেতে নিষেধ করলেন তা কোন্ দলীলের ভিত্তিতে? যিয়ারতের জন্য মাযারে যাওয়াতো সুন্নাত বলেই প্রমাণিত হলো। খোদ্ নবী করীম ﴾ﷺ﴿ শোহাদায়ে উহুদের মাযারসমূহে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যেতেন, খোলাফায়ে রাশেদীনও হুযূর ﴾ﷺ﴿-এর অনুসরণে এ কাজটা নিয়মিতভাবে করতেন। হুযূর ﴾ﷺ﴿ এরশাদ করেন–
عَلَيۡكُمۡ بِسُنَّتِیۡ وَسُنَّةِ الۡخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيۡنَ
অর্থাৎ "হে উম্মতগণ! তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধর।" এ কারণেই মাযহাবের ইমামগণ এবং বিশ্ব-মুসলিম এ সাওয়াবদায়ক সুন্নাতকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করে থাকেন।
বাকী রইলো, 'আউলিয়া কেরামের ক্ষমতা'। পবিত্র ক্বোরআন, হাদীস ও নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির আলোকে আউলিয়া কেরামের ক্ষমতা ও মর্যাদা দেখুন–
এক) আল্লাহপাক পবিত্র ক্বোরআন মজিদে এরশাদ করেন–
اَلَا اِنَّ اَوۡلِيَاءَ اللّٰهِ لَاخَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَاهُمۡ يَحۡزَنُوۡنَ.
অর্থাৎ "সাবধান! আল্লাহর ওলীগণের না কোন ভয় আছে, না আছে কোন দুঃখ।"
দুই) সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে বর্ণিত, হুযূর ﴾ﷺ﴿ বর্ণনা করেন–
اِنَّ اللّٰهَ تَعَالٰی قَالَ مَنۡ عَادٰی لِیۡ وَلِيًّا فَقَدۡ اٰذَنۡتُهٗ بِالۡحَرۡبِ
অর্থাৎঃ "আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন– যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে শত্রুতা করে তার প্রতি আমার পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা রইলো।"
আরো এরশাদ করেন–
وَمَا تَقَرَّبَ اِلَیَّ عَبۡدِیۡ بِشَیٍٔ اَحَبَّ اِلَیَّ مِمَّا افۡتَرَضۡتُ عَلَيۡهِ وَمَايَزَالُ عَبۡدِیۡ يَتَقَرَّبُ اِلَیَّ بِالنَّوَافِلِ حَتّٰی اَحۡبَبۡتُهٗ . فَاِذَا اَحۡبَبۡتُهٗ فَكُنۡتُ سَمۡعَهُ الَّذِیۡ يَسۡمَعُ بِهٖ وَبَصَرَهُ الَّذِیۡ يُبۡصِرُبِهٖ وَيَدَهُ الَّتِیۡ يَبۡطِشُ بِهَا وَرِجۡلَهُ الَّتِیۡ يَمۡشِیۡ بِهَا وَإِنۡ سَألَنِیۡ لَاُعۡطِيَنَّهٗ وَلَئِنۡ اسۡتَعَاذَنِیۡ لَاُعِيۡذَنَّهٗ
অর্থাৎঃ আমার বান্দা আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় যেই ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে তা হচ্ছে ফরয ইবাদত এবং আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করার সাধনায় মগ্ন হয়। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু (ওলী) হিসেবে গ্রহণ করে নিই। সুতরাং যখনই আমি তাকে বন্ধু (ওলী) হিসেবে গ্রহণ করে নিই, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে; আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে কোন কিছু স্পর্শ করে; আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। যদি সে আমার নিকট কিছু চায়, তবে অবশ্যই আমি তাকে দান করি, আর যদি আমার নিকট আশ্রয় চায়, তবে আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিয়ে থাকি।" * (বোখারী শরীফ ও মিশকাত শরীফঃ ১৯৭ পৃষ্ঠা)
তিন) সাধারণ মানুষ আগুনকে ভয় করে, কিন্তু আগুন আউলিয়া কেরামের অনুগত। হযরত ওমর ফারূক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- এর আমলে পাহাড় থেকে আগত আগুন, যা গোটা একটা বস্তীকে ভস্মীভূত করে দেয়ার উপক্রম হয়, তাঁর চাদরের ইঙ্গিতে পূনরায় পাহাড়ের পথে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। (ইযালাতুল খিফাঃ ২য় খণ্ডঃ ১৭৩ পৃষ্ঠা)
প্রখ্যাত ওলী মুহাদ্দিছ হযরত আবূ মুসলিম খাওলানী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ভণ্ডনবী আস্ওয়াদ ইবনে কায়স আল-আনাসী জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। কারণ, তিনি উক্ত ভণ্ডনবীর কঠোর বিরোধিতা করে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু সেই জ্বলন্ত আগুনে হযরত আবূ মুসলিমের শরীরের একটা লোম পর্যন্ত জ্বলেনি; বরং আগুন নিভে গিয়েছিল। (তাহযীব আত্-তাহযীব)
চার) নদ-নদী ও সাগর আউলিয়া কেরামের আনুগত্য করে থাকে। মিশরের নীলনদে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য এক সময় কুমারী বলি দেয়ার প্রথা ছিল। হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফত কালে ঐ প্রথানুযায়ী সেখানকার লোকেরা তদানীন্তন গভর্ণর হযরত আমর ইবনুল আস্ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট নীলনদে একজন জীবিত
_______________________________
*অর্থাৎঃ তখন আল্লাহর ওলীর কান, চোখ, হাত ও পায়ের মধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুদরতের 'জল্ওয়া' প্রতিফলিত করেন, যার ফলে সেই ওলীর কান, চোখ, হাত ও পায়ের মাধ্যমে এমন এমন কাজ সম্পাদিত হয়, যেগুলো দেখলে আল্লাহর কুদরত বা ক্ষমতার কথা স্মরণ হয়। যেমন লৌহখণ্ড জ্বালাতে পারে না, কিন্তু যখন সেটাকে কিছুক্ষণ জ্বলন্ত আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তখন সেটাও আগুনের মত জ্বালাতে পারে। এতে লৌহ খণ্ডের মধ্যে আগুনের প্রভাব পড়ে মাত্র, উভয়ের অস্থিত্ব আপনাপন স্থানে ঠিক থাকে। সুতরাং এ'তে আউলিয়া কেরামের খোদা প্রদত্ত ক্ষমতা যে কত প্রবল তা সুস্পষ্ট হলো। আর তাঁদের প্রার্থনা আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন বলেই তো তাঁদের নিকট মানুষের ভিড় জমে।
_______________________________
কুমারীকে বলি দেয়ার অনুমতি চাইলে অনুমতি না দিয়ে তিনি খলিফা হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট পরামর্শ চেয়ে একজন দূত প্রেরণ করলেন। তখন হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সরাসরি নীলনদকে সম্বোধন করে একটা পত্র লিখে পাঠান। পত্রখানা নীলনদে নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তা পূর্বের ন্যায় পানিভর্তি অবস্থায় প্রবাহিত হতে থাকে। পত্রখানা হচ্ছে এরূপ–
اِلٰی نِيۡلِ مِصۡرَ مِنۡ عَبۡدِ اللّٰهِ عُمَرَبۡنِ الخَطَّابِ : اَمَّا بَعۡدُه، فَاِنۡ كُنۡتَ تَجۡرِیۡ بِنَفۡسِكَ فَلَاحَاجَةَ لَنَا اِلَۡيۡكَ وَاِنۡ كُنۡتَ تَجۡرِیۡ بِاللّٰهِ فَاجۡرِ عَلٰی اِسۡمِ اللّٰهِ تَعَالٰی.
অর্থাৎঃ মিশরের নীল নদের প্রতি! খাত্তাব-পুত্র ওমরের তরফ থেকে। অতঃপর, যদি তুমি নিজের ক্ষমতায় প্রবাহিত হও, তবে তোমার প্রতি আমাদের প্রয়োজন নেই। আর যদি তুমি আল্লাহর ক্ষমতায় প্রবাহিত হয়ে থাক, তবে আল্লাহর নামে প্রবাহিত হয়ে যাও!" (ইযালাতুল খিফাঃ ২য় খণ্ডঃ ১৬৬ পৃষ্ঠা)
পাঁচ) যমীন আউলিয়া কেরামের কথা মান্য করে। হযরত আল্লামা আবদুল ওহাব সুবকী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) 'আত্ তাবক্বাতুশ্ শাফে'ইয়্যাহ'তে উল্লেখ করেন- একবার মারাত্মক ভূমিকম্প শুরু হলে পরিশেষে হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) আপন লাঠি দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে আঘাত করে বললেন- اَقِرِّیۡ اَلَمُ اَعۡدِلۡ عَلَيۡكِ؟ অর্থাৎঃ "হে ভূ-পৃষ্ঠ, থেমে যা! আমি কি তোর উপর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করিনি?"
فَاسۡتَقَرَّتۡ مِنۡ وَقۡتِهَا. অতঃপর, ভূ-কম্পন সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
(ইযালাহঃ ২য় খণ্ডঃ ১৭২ পৃষ্ঠা)
ছয়) বাতাস আউলিয়া কেরামের বার্তা বহন করে। সুদূর নেহাওন্দে যুদ্ধরত হযরত সারিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন সম্ভাব্য পরাজয় ও বিপর্যয়ের সম্মূখীন, তখন মদীনা শরীফের মসজিদে খোৎবা প্রদানরত অবস্থায় খলীফা হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুর) চোখের সামনে সুদূর নেহাওন্দের দৃশ্য গোপন থাকেনি। তিনি মিম্বর থেকে ডেকে বলেছিলেন–
يَا سَارِيَةُ الۡجَبَل অর্থাৎঃ "হে সারিয়া! পাহাড়কে পেছনে রেখে যুদ্ধ কর! (তবে জয়ী হবে।)" অমনি বাতাস খলীফার এ আহ্বানকে হযরত সারিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু)- এর কানে পৌঁছিয়ে দিল। অতঃপর সারিয়া জয়লাভ করলেন। (মিশকাত শরীফ)
সাত) বনের হিংস্র পশুরাও আউলিয়া কেরামের প্রতি বিনয়াবনত হয়। হযরত সুফিয়ান সওরী (রাঃ), যিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ ও প্রখ্যাত ইমাম। একবার হজ্বব্রত পালনের জন্য গমন করলে পথিমধ্যে হযরত শায়বান রা'ঈ (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়ে যায়। হযরত শায়বান রা'ঈ (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) ছিলেন প্রচলিত অর্থে উম্মী, অথচ অসাধারণ কারামতসম্পন্ন ওলী। উভয়ে একসাথে হজ্ব যাত্রা করেন। কিছুদূর অগ্রসর হলে দেখতে পান- গিরিপথে একটা বাঘ শুয়ে আছে। অন্যান্য পথিকগণ ভীত হয়ে সেখানে অপেক্ষমান। দূরে থেকে পাথর মেরেও সেটাকে পথ হতে সরিয়ে দেয়ার সাহস পর্যন্ত করা হচ্ছিল না। তখন হযরত শায়বান রা'ঈ নির্ভয়ে অগ্রসর হয়ে ব্যাঘ্রটার কান ধরে উঠিয়ে দিলেন, ব্যাঘ্রটাও অনুগত বেশে উঠে দাঁড়ালো এবং তাঁর সাথে সাথে কিছুদূর গিয়ে আপন পথে চলে গেল। (তাফসীরে রূহুল বয়ানঃ ৩৩২ পৃষ্ঠা)
মাওলানা রূম (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) লিখেছেন, তালেক্বান শহরের একজন দরবেশ প্রখ্যাত ওলী হযরত আবুল হাসান খারক্বানী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)-এর সাক্ষাত লাভের জন্য এসে দেখতে পান, হযরত খারক্বানী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) একটা বাঘের পিঠে আরোহণ করে পাহাড়ের দিক থেকে আসছেনঃ
انداریں بود اوکه شيخ نامدار ،، زودپيش افتاد برشيرے سوار
(মসনবী শরীফ)
আট) হযরত গাউসে আ'যম বড়পীর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর খড়মযুগল নিক্ষেপ করে বহুদূরে আক্রান্ত ভক্তদেরকে রক্ষা করেছিলেন। হযরত শেখ আবদুল হক হারীমী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি) প্রমূখ বর্ণনা করেন– "৩রা সফর ৫৫৫ হিঃ। আমরা হযরত বড়পীর গাউসে আ'যম দস্তগীর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাদ্রাসায় হাযির ছিলাম। আমরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলাম যে, হুযূর গাউসে পাক (রাঃ) ওযূ করছেন। হঠাৎ তিনি তাঁর পায়ের খড়ম দু'টি পরপর সজোরে নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর সেগুলো বাতাসে অদৃশ্য হয়ে গেল। কেউ এর কারণ জিজ্ঞাসা করার সাহসও করতে পারেনি। এর ২৩ দিন পর অনারবীয় একটা কাফেলা সেখানে (জীলান শহরে) এসে পৌঁছলো। তারা হযরত গাউসে পাক (রাঃ)-এর দরবারে তাঁর নিক্ষিপ্ত খড়ম দু'টি এবং কিছু নযর-নেয়ায পেশ করে পথের এক ঘটনা আরয করলো। ঘটনাটা হচ্ছে– তারা বললো, "আমরা অমুক অরণ্যভূমি অতিক্রম করছিলাম। হঠাৎ একটা ডাকাতদল আমাদের উপর হামলা করে বসলো। আমাদের কতিপয় সফরসঙ্গী তাদের হামলায় প্রাণও হারিয়েছে। অতঃপর ডাকাতদল আমাদের কাফেলার মালামাল লুণ্ঠন করতে আরম্ভ করলো। তাদেরকে প্রতিহত করার যখন আমাদের কোন উপায় থাকেনি তখন আমরা উচ্চস্বরে আহ্বান করলাম —! أغثنا يا شيخ عبد القادر
"ওহে শেখ আবদুল কাদের জীলানী! আমাদেরকে বাঁচান।" আর তখন কিছু মান্নত করে নিলাম মনে মনে।
তখন আমরা সেখানে এমন একটা ভয়ানক আওয়াজ শুনতে পেলাম, যার গর্জনে গোটা অরণ্য কেঁপে উঠলো। অতঃপর দেখলাম, একটা খড়ম এসে ডাকাতের সরদারের মাথার উপর সজোরে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে সে নিহত হলো। কিছুক্ষণ পর আরেকটা খড়ম এসে অপর একজন ডাকাতের মাথায় পড়লো সেও মারা গেল। অতঃপর আতঙ্কিত হয়ে বাকী ডাকাতরা আমাদের মালামাল ফেলে পালিয়ে গেল। আমরা খড়ম দু'টি কুঁড়িয়ে নিয়ে দেখলাম সেগুলো জীলান শহরের তৈরী। (বাহ্জাতুল আসরার)
নয়) মৃত্যুর সময় কামিল মুর্শিদ তাঁর ভক্ত মূরীদকে শয়তানের হামলা থেকে রক্ষা করতে পারেন। হযরত নাজমুদ্দীন কুবরা (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)-এর লোটার প্রসিদ্ধ ঘটনা এর একটা জ্বলন্ত প্রমাণ। এ জগদ্বিখ্যাত ওলীর মুরীদ ছিলেন হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)। তাঁর বাসস্থান রায় শহরে। তাঁর ওফাতের সময় যখন তাঁর সাকরাত আরম্ভ হলো, তখন শয়তান তাঁকে হামলা করলো। ইমাম রাযীর (রহঃ) 'তৌহীদের' পক্ষে ৩৬০ খানা দলীল জানা ছিল। শয়তান সবক'টিই খণ্ডন করে তাঁকে 'তৌহীদ' (আল্লাহর একত্ব) অস্বীকার করার জন্য যুক্তি উপস্থাপন করতে লাগলো। তখন ইমাম রাযী (রহঃ) নিরুপায় ও লা-জওয়াব হয়ে রইলেন। শত মাইল দূরে অবস্থানরত তাঁর মুর্শিদ [হযরত নাজমুদ্দীন কুবরা রহঃ]-এর নিকট মুরীদের করুন অবস্থা গোপন থাকেনি। তিনি তখন ওযূ করছিলেন। তিনি জালালিয়াতে এসে উচ্চস্বরে এ বলে তাঁর লোটাখানা সজোরে শয়তানকে নিক্ষেপ করলেন– "ফখর রাযী! তুমি বলে দাও, আমি আন্তরিকভাবে খোদা তা'আলাকে এক বলে বিশ্বাস করেছি। আমার দালীলের প্রয়োজন নেই।" সেই লোটাখানা ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রাহমাতুল্লাহি আলায়হি)-এর মাথার পার্শ্বে গিয়ে পড়লো। আর ইমাম রাযী (রহঃ) সেই আহ্বান নিজ কানে শুনতে পান এবং শয়তানকে অনুরূপ জবাব দিলেন। তাঁর 'খাতিমাহ্ বিল খায়র' হলো।
দশ) হযরত সুলায়মান (আলায়হিস্ সালাম)-এর দরবারের একজন ওলী হযরত আসেফ ইবনে বারখিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) [হযরত সুলায়মান (আলায়হিস্ সালাম)-এর মন্ত্রী], সুদূর ইয়েমেন থেকে চোখের পলকে বিলক্বীসের তখ্ত নিয়ে এসেছিলেন। এ ঘটনাতো (কারামত) পবিত্র ক্বোরআনের 'সূরা নামল'-এ উল্লেখ করা হয়েছে–
قَالَ الَّذِیۡ عِنۡدَهٗ عِلۡمٌ مِنَ الۡكِتٰبِ اَنَا اٰتِيۡكَ بِهٖ قَبۡلَ اَنۡ يَّرۡتَدَّ اِلَيۡكَ طَرۡفُكَ . فَلَمَّا رَاٰهُ مُسۡتَقِرًّا عِنۡدَهٗ قَالَ هٰذَا مِنۡ فَضۡلِ رَبِّیۡ قف
অর্থাৎঃ সেই ব্যক্তি আরয করলো, যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল (আসেফ ইবনে বারখিয়া), 'আমি সেটা (বিলক্বীসের তখ্ত) দরবারে হাযির করবো চোখের একটা মাত্র পলক মারার পূর্বেই।' হযরত সুলায়মান (আলায়হিস্ সালাম) তাঁকে অনুমতি দিলেন।
Comments
Post a Comment