নাস্তিকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব
___________________________
মুসলমানদের খায়বার আক্রমণ ছিল অমানবিক?
প্রশ্ন
জনৈক নাস্তিকের অভিযোগ,
হাদীসে এসেছে, খায়বারে সকাল বেলা সেখানকার বাসিন্দারা কাজে মগ্ন থাকা অবস্থায় মুহাম্মদ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাদের কাছে গিয়ে যুদ্ধের ঘোষণা করলেন।
একটি অসম যুদ্ধ হল।
নবীজীর সৈন্যবাহিনী সাফিয়্যার বাবা উবাই বিন আখতাবকে হত্যা করল। সাফিয়্যার স্বামীকে হত্যা করল।
তাকে নিয়ে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করলেন। তারপর তাকে বিয়ে করলেন।
এগুলো কোনটিই বিবেকের সাথে যায় না। বিবেক এগুলো মানতে পারে না।
যদি আমি একাত্তরে জন্ম গ্রহণ করতাম। তাহলে শত্রুর সাথে লড়াই করতাম। কিন্তু নিজের বিবেকের সাথে লড়াই করতে পারলাম না। তাই ইসলাম ছেড়ে নাস্তিক হয়েছি।
উত্তর
নাস্তিকদের দাবী তারা মুক্তমনা। উদার চিত্তের অধিকারী হয়ে থাকেন। যারা মুক্তমনা হয়ে থাকেন, তাদের উচিত সব কিছুকে মুক্তভাবেই ব্যক্ত করা। মৌলিক কথা লুকিয়ে শুধু পরিণাম উল্লেখ করা মুক্তমনার কাজ নয়। বরং সংকীর্ণমনা ব্যক্তিদের কাজ।
উদাহরণতঃ
একজন বলল,বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা আলশামস বাহিনীর সদস্যদের ঘেরাও করল। তাদের ঘরবাড়ী থেকে বের করে এনে হত্যা করল। তাদের কাছে রক্ষিত মালামাল লুট করল।
এখন উপরোক্ত বক্তব্যটিকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখলে একজন বিবেকবান বলবে,আরে এতো জুলুম! এতো অন্যায়। একদল নীরিহ মানুষকে কেন হত্যা করল মুক্তি বাহিনী? কেন তাদের ঘেরাও করে লড়াইয়ে বাধ্য করল? এটা কি অমানবিক নয়?
আমরা জবাবে বলব,যে ব্যক্তি প্রথম মন্তব্যটি করেছে, সে লোক প্রচণ্ড প্রতারক এবং ধোঁকাবাজ। সে শুধু আলশামস বাহিনীর উপর হামলা ও হত্যার চিত্র তুলে ধরেছে। কিন্তু কি কারণে তাদের হত্যা করা হল? কেন তাদের উপর হামলা করল মুক্তিবাহিনী? তা উল্লেখ না করে মস্ত বড় খেয়ানত করেছে।
যদি লোকটি প্রথমে উল্লেখ করত যে, আলশামস বাহিনী দেশের নীরিহ জনতাকে হত্যা করতে, বাড়িঘর লুণ্ঠন করতে বর্হিশত্রুদের আমন্ত্রণ করেছে। বর্হিশক্তিকে সহযোগিতা করেছে। এমনকি তারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে একাধিকবার ষড়যন্ত্র করেছে। তাদের এ অমার্জনীয় অপরাধের শাস্তি স্বরূপ তাদের হত্যা করেছে মুক্তিবাহিনী।
এভাবে পুরো বিষয়টি যে উল্লেখ করবে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুক্তমনা। আর যে ব্যক্তি শুধু হামলা ও হত্যার কথা উল্লেখ করল। কিন্তু তাদের অপরাধের কথা উল্লেখ করেনি। উক্ত ব্যক্তি মুক্তমনা নয়। বরং প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণমনা।
উপরোক্ত উদাহরণটি অনুধাবন করলে নাস্তিকটির উপরোক্ত আবেগী বক্তব্যটির প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারবেন। লোকটি কোন স্থানে প্রতারণা ও ধোঁকাটি দিয়েছে।
খায়বারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিযানের কথা উল্লেখ করেছে নাস্তিকটি। কিন্তু কেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযান পরিচালনা করলেন তা উল্লেখ না করে চরম ঘৃণিত প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে সে।
আমরা আসল হাকীকত সম্পর্কে জেনে নেই!
খায়বারের অধিবাসী এরা কারা?
খায়বারে যারা বসবাস করতো। তারা ছিল বনী নজীরের বাসিন্দা। ইহুদী।
বনী নজীরের সাথে পূর্ব থেকে মুসলমানদের শান্তি চুক্তি ছিল। বনী নজীরের বস্তিতে একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন। বনী নজীরের লোকেরা বাহ্যিকভাবে খুবই ভাল ব্যবহার করছিল। কিন্তু তলে তলে একজন লোককে ঠিক করল, যে ছাদের উপর থেকে বড় একটি পাথর নবীজীর মাথার উপর ফেলবে। ফলে তিনি শহীদ হয়ে যাবেন। ইন্নালিল্লাহ।
এ ভয়াবহ সংবাদ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেন। ফলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে উঠে চলে যান। ফলে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়।
[উয়ুনুর আছার-২/৭০-৭১, দারুল কলম প্রকাশনী,বৈরুত,সীরাতে ইবনে হিশাম-২/১৯০]
ঘটনাটির আরবী পাঠ
ورَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى جَنْبِ جِدَارٍ مِنْ بُيُوتِهِمْ قَاعِدٌ، فَمَنْ رَجُلٌ يَعْلُو عَلَى هَذَا الْبَيْتِ فَيُلْقِي عَلَيْهِ صَخْرَةً فَيُرِيحُنَا مِنْهُ، فَانْتَدَبَ لِذَلِكَ عَمْرَو بْنَ جحاشِ بْنِ كَعْبٍ، أَحَدُهُمْ، فَقَالَ: أَنَا لِذَلِكَ، فَصَعِدَ لِيُلْقِيَ عَلَيْهِ صَخْرَةً كَمَا قَالَ، ورَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِهِ، فيهم أبو بكر وعمرو وَعَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُم.
وَقَالَ ابْنُ سَعْدٍ: فَقَالَ سَلامُ بْنُ مِشْكَمٍ (يَعْنِي لِلْيَهُودِ) لا تَفْعَلُوا، وَاللَّهِ لَيُخْبَرَنَّ بِمَا هَمَمْتُمْ بِهِ، وَإِنَّهُ لنقض العهد الذي بيننا وبينه. رجع إلى خبر ابن إسحق قَالَ: فَأَتَى رَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْخَبَرُ مِنَ السَّمَاءِ بِمَا أَرَادَ الْقَوْمُ، فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم راجعا إلى المدينة، فلما استلبث النَّبِيّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْحَابه قَامُوا فِي طَلَبِهِ، فَلَقُوا رَجُلا مِنَ الْمَدِينَةِ مُقْبِلا فَسَأَلُوهُ [1] ، فَقَالَ: رَأَيْتُهُ دَاخِلا إِلَى الْمَدِينَةِ، فَأَقْبَلَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حَتَّى انتهوا إليه، فأخبر الخبر هم بِمَا كَانَتْ أَرَادَتْ يَهُودُ مِنَ الْغَدْرِ بِهِ
، (عيون الأثر، غزوة بنى النضير-2/70-71، دار القلم بيروت)
দু’টি জঘন্য কাজ করেছে বনী নাজীর। যথা-
১ চুক্তি ভঙ্গ করেছে।
২ নবীজীকে হত্যা করার মত ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করেছে।
তাদের গাদ্দারীর শাস্তি দিতে মুসলিম বাহিনী যখন আগমণ করে,তখন তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলমানগণ তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আরেকটি ষড়যন্ত্রের ছক আঁকে তারা। সংবাদ পাঠায়, মুসলমানদের পক্ষ থেকে তিনজনকে পাঠানো হোক দুর্গে। আর বনী নজীরের পক্ষ থেকে তিনজন পাদ্রীকে পাঠানো হবে। পরস্পর আলোচনা করে যদি তিন পাদ্রী মুসলমান হয়ে যায়। তাহলে তারা সবাই মুসলমান হয়ে যাবে। কিন্তু তারা এখানেও গাদ্দারী করে তাদের পাঠানো পাদ্রীদের খঞ্জর লুকিয়ে নিতে আদেশ করে। যেন মুসলিম উলামার সাথে সাক্ষাৎ হতেই তাদের হত্যা করতে পারে। [সীরাতে মুস্তাফা, ইদ্রিস কান্ধলবীকৃত-২/২৬৮]
এরকম জঘন্য গাদ্দারী প্রকাশ হবার পরও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হত্যা করার নির্দেশ দেননি। বরং তাদের মদীনা থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সুযোগ করে দেন।
তখন তারা খায়বারে গিয়ে অবস্থান শুরু করে। খায়বারে যাবার সময় তারা তাদের বাড়ি ঘরের দরজা চৌকাঠও খুলে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের সর্দার ছিল হুয়াই বিন আখতাব এবং কিনানা বিন রাবী। [উয়ুনুল আছার-২/৭১]
এখানেই তাদের ষড়যন্ত্র শেষ নয়। খায়বরের অধিবাসী বনী নজীরের সর্দার হুয়াই বিন আখতাব মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের এবং কিনানা বিন রবী বনী গাতফানকে ফুঁসলিয়ে দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনা অবরোধ করেছিল খন্দক যুদ্ধে। [ফাতহুল বারী-৭/৫৮১, খন্দক যুদ্ধ]
শুধু তাই নয়। পূর্ব থেকে মুসলমানদের সাথে সন্ধিতে চুক্তিবদ্ধ থাকা বনী কুরাইজাকেও বিদ্রোহ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাজী করায় এ খায়বারের ইহুদী সর্দার হুয়াই বিন আখতাব।
বনী নজীরের সর্দার হুআই বিন আখতাব বনু কুরাইজার সর্দার কাব বিন আসাদ কুরাজীকে তার দলে টানতে যখন আসে, তখন কা’ব দৃঢ়তার সাথে বলেছিলঃ
وَيْحكَ يَا حُيَيُّ: إنَّكَ امْرُؤٌ مَشْئُومٌ، وَإِنِّي قَدْ عَاهَدْتُ مُحَمَّدًا، فَلَسْتُ بِنَاقِضٍ مَا بَيْنِي وَبَيْنَهُ، وَلَمْ أَرَ مِنْهُ إلَّا وَفَاءً وَصِدْقًا
আফসোস তোমার জন্য হে হুয়াই! নিশ্চয় তুমি এক নিকৃষ্ট ব্যক্তি। নিশ্চয় আমি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে চুক্তিবদ্ধ। সুতরাং আমার ও তার মাঝে যে চুক্তি রয়েছে তা আমি ভঙ্গ করতে পারবো না। আর আমি তাকে একজন ওয়াদা রক্ষাকারী এবং সত্যনিষ্টই পেয়েছি। [সীরাতে ইবনে হিশাম-২/২২০, গাযওয়ায়ে খন্দক অধ্যায়)
এভাবে ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যায় খায়বারের ইহুদীরা। এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যারও চেষ্টা করেছিল এ গাদ্দাররা।
এরকম জঘন্য অপরাধীদের ক্ষেত্রে তথাকথিত মুক্তমনাদের মতামত কী?
তাদের শাস্তি প্রদান করা কি অপরাধ? নাকি কঠোর শাস্তিটাই ন্যায্য বিচার? আপনাদের মুক্ত বিবেক কী বলে?
সফিয়্যার স্বামী ছিল কিনানা বিন রাবী। যে ছিল বনী নজীরের একজন নেতা। এ গাদ্দার বনী গাতফানকে ফুঁসলিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
তারপরও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে শান্তি চুক্তি করে তাদের খায়বার ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে নির্দেশ দেন। কিন্তু এখানেও তারা গাদ্দারী করে গনীমতের প্রচুর সম্পদ সম্বলিত থলে চুরি করে পালাচ্ছিল।
যার নেতৃত্ব দিচ্ছিল কিনানা বিন রাবী। শুধু তাই নয় সে সাহাবী মাহমুদ বিন মাসলামা রাঃ কে শহীদ করেছিল।
তার এসকল অমার্জনীয় অপরাধের কারণে তাকে হত্যা করা হয়। [সীরাতে ইবনে হিশাম-২/৩৩৬-৩৩৭]
এতগুলো অমার্জনীয় অপরাধ করার পরও অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া। নিরাপদ স্থানে চলে যেতে দুই দুইবার সুযোগ দেয়া। এমন কোন সেনা নায়ক, রাষ্ট্র বিজেতার নজীর পৃথিবীর ইতিহাস কখনো দেখাতে পারেনি। দেখাতে পারবেও না।
কথিত মুক্তমনারাই কি উপরোক্ত অমার্জনীয় দোষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন সহনশীল আচরণ করতে পারবেন?
মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধী রাজাকারদের ক্ষেত্রে কি কথিত মুক্তমনারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই নীতি অনুসরণ করতে পেরেছেন? রাজাকারদের নিরাপদ স্থানে চলে যাবার সুযোগ দিতে কি তারা রাজী? নাকি বিদেশ থেকে ধরে এনেও তাদের বিচার করার পক্ষপাতি?
নিজের বিবেককে একবার কি জিজ্ঞেস করেছে মুরতাদ সেই কথিত মুক্তমনা?
আর স্বামীহারা অসহায় সফিয়্যাকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাযথ মর্যাদায় বিয়ে করে, স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য করেছেন চরম সম্মানিতা। রাজিয়াল্লাহু আনহা।
পূর্ণ অবস্থান সামনে রাখলে কোন বিবেকবান, যুক্তিবাদী, মুক্তমনা মানুষ নবীজীর খায়বার যুদ্ধ নিয়ে অভিযোগ তুলতেই পারে না।
তবে যাদের মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটেছে। বিবেক-বুদ্ধি ঘুন পোকায় খেয়েছে। এমন উন্মাদ নাস্তিকের মুখেই মানায় এসব হাস্যকর অভিযোগ।
আরো পড়ুন-
১- উরাইন গোত্রের লোকদের হত্যা করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি অমানবিক কাজ করেছেন?
২- বনু কুরাইজাকে শাস্তি দিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি অন্যায় করেছেন?
---------------------------------------------------
উরাইন গোত্রের লোকদের হত্যা করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি অমানবিক কাজ করেছেন?
প্রশ্ন
জনৈক নব্য মুরতাদ তার ইসলাম ছেড়ে দেবার কারণ বলতে বলেছেনঃ
বুখারী শরীফের ২৩৩ নং হাদীসে আছে-উরাইনা গোত্রের লোকরা অসুস্থ্য হলে তাদের নবীজী উটের দুধ ও পেশাব পান করতে বললেন। তখন তারা উটের রাখালদের হত্যা করে, মুরতাদ হয়ে চলে যাচ্ছিল।
উরাইনা গোত্রের লোকদের তিনটা দোষ ছিল। যা হাদীসে আছে। যথা-১)তারা মুরতাদ হয়েছে। ২-উটের রাখালদের হত্যা করেছে। ৩-উট ডাকাতী করেছে।
তাদের গ্রেফতার করা হল। তাদের ডান হাত ও বাম পা কাটা হল। লোহার শলাকা দিয়ে তাদের চোখ তুলে ফেলা হল। তাদের মরুভূমিতে রাখার পর তারা পানি চাইলে তাদের পানি না দিয়ে হত্যা করা হল।
উরাইনার লোকদের হাত পা কেটে ফেলা হল, এটা কি নবীর কাজ?
এসব আমার বিবেকের কাছে খারাপ লেগেছে তাই ইসলাম ছেড়ে দিলাম।
উত্তর
উরাইনা গোত্রের তিনটি অপরাধ ভাল করে আবার খেয়াল করুন।
১-যারা প্রথমে ইসলাম কবুল করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বিধান মান্য করবে বলে শপথ করেছে। এরপর তারা রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে মুরতাদ হয়েছে।
২-রাষ্ট্রের কোষাগার লুণ্ঠন করেছে।
৩-রাষ্ট্রীয় প্রতিপ্রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে।
উপরোক্ত তিনটি জঘন্য অপরাধ যারা করেছেন,তার ক্ষেত্রে আপনি যদি উক্ত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হতেন, তাহলে কী ফায়সালা করতেন?
আমি আপনার বিবেকের কাছে জানতে চাই। একজন রাষ্ট্রদ্রোহী, একজন রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুণ্ঠনকারী, একজন প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুনিকে সাদরে ইজ্জতের সাথে ছেড়ে দেয়া হবে? নাকি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে?
যে তিনটি অভিযোগ, তার প্রতিটির জন্যই তার কঠোর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু সেই তুলনায় শাস্তিগুলো কি একটু কমই দেয়া হয়নি?
বিবেকের আদালতে দাঁড়িয়ে বিষয়গুলো বিচার করুন।
বাংলাদেশের আইন আদালত অমান্য করে কোন ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়। যদি উপরোক্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করে। যদি উপরোক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে।
উপরোক্ত জঘন্য অপরাধীকে বাংলাদেশ সরকারের কী শাস্তি দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আর আপনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেই বা কী করতেন?
আরো যা জানতে হবে!
১.উরাইনী সন্ত্রাসীরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিযুক্ত রাখালদের হাত পা কেটে দিয়েছিল। চোখ উপড়ে ফেলেছিল।
২.এসব উটের দুগ্ধ দিয়ে নবী পরিবারসহ অনেক পরিবারের রাতের খাবার সরবরাহ হতো। উরাইনী সন্ত্রাসীদের সে রাতের লুণ্ঠনের কারণে সেদিন রাত খাবারহীনভাবে কাটিয়েছে নবী পরিবার। [দেখুন-আর রউজুল আনফ ফী শরহি সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ-৬/৪২]
রাউজুল আনফের ইবারতের আরবী পাঠ
قُلْنَا: فِي ذَلِكَ جَوَابَانِ: أَحَدُهُمَا: أَنّهُ فَعَلَ ذَلِكَ قِصَاصًا لِأَنّهُمْ قَطَعُوا أَيْدِي الرّعَاءِ وَأَرْجُلَهُمْ وَسَمَلُوا أَعْيُنَهُمْ، رُوِيَ ذَلِكَ فِي حَدِيثِ أَنَسٍ، وَقِيلَ: إنّ ذَلِكَ قَبْلَ تَحْرِيمِ الْمُثْلَةِ. فَإِنْ قِيلَ: فَقَدْ تَرَكَهُمْ يَسْتَسْقُونَ، فَلَا يُسْقَوْنَ، حَتّى مَاتُوا عَطَشًا، قُلْنَا عَطّشَهُمْ لِأَنّهُمْ عَطّشُوا أَهْلَ بَيْتِ النّبِيّ- صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- تِلْكَ اللّيْلَةَ، رُوِيَ فِي حَدِيثٍ مَرْفُوعٍ أَنّهُ عَلَيْهِ السّلَامُ لَمّا بَقِيَ وَأَهْلُهُ تِلْكَ اللّيْلَةَ بِلَا لَبَنٍ، قَالَ: اللهُمّ عَطّشْ مَنْ عَطّشَ أَهْلَ بَيْتِ نَبِيّك. وَقَعَ هَذَا فِي شَرْحِ ابْنِ بَطّالٍ، وَقَدْ خَرّجَهُ النّسَوِيّ.
যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাত পা কেটেছে, চোখ উপড়ে ফেলেছে, রাষ্ট্র প্রধানের পরিবারকে অভূক্ত রেখেছে। রাষ্ট্রীয় মাল লুট করে পালিয়েছে। তাকে তার অপরাধের অনুরূপ শাস্তি প্রদান করা কি অন্যায় নাকি ন্যায় বিচার?
আপনার বিবেক বুদ্ধি কী বলে?
নিশ্চয় ন্যায় বিচার। অবশ্যই ন্যায় বিচার। প্রতিটি বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি তা’ই বলবে। প্রতিটি আকল এটাই সাক্ষ্য দিবে। নবীজীর বিচার সঠিক ছিল। যথার্থ ছিল।
যদি ভিন্ন কথা বলে, তাহলে বুঝতে হবে, আপনার বিবেক আপনার নিয়ন্ত্রিত নয়। বরং অন্য কারো হাতে থাকা রিমোটের ক্রীড়ানক মাত্র। আপনি কেবলি একটি দাবার গুটি। যাকে নিয়ে খেলছে কোন ঝানু খেলোয়ার।
ইসলামের মত অমূল্য রতন এমন আহমকী করে ছেড়ে দিয়েছেন শুনে আমরা যারপরনাই আশ্চর্য হলাম।
আল্লাহ আপনার বিবেক বুদ্ধির সুমতি প্রদান করুন। আমীন।
---------------------------------------------------
বনু কুরাইজাবাসীকে শাস্তি দিয়ে কি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যায় করেছেন? [নাউজুবিল্লাহ]
প্রশ্ন
জনৈক মুরতাদ ব্যক্তি অভিযোগ হল,
বনু কুরাইজার সাতশ কিংবা নয়শ পুরুষকে জবাই করা হয়েছে নবীজীর নির্দেশে। এটা কি নবীর কাজ?
উত্তর
বিষয়টিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হল, এ উপস্থাপন পদ্ধতিটি খুবই অন্যায় ও গর্হিত।
বনু কুরাইজা মদীনায় অবস্থানকারী একটি গোত্র। যাদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শান্তি চুক্তি ছিল। কেউ কারো উপর আক্রমণ করবে না। বর্হিশত্রু আক্রমণ করলে পরস্পর সহযোগিতা করবে। [সীরাতে ইবনে হিশাম-১/৫০৩-৫০৪]
কিন্তু খন্দক যুদ্ধের সময় যখন কুরাইশরা দশ হাজার বাহিনী নিয়ে মদীনা ঘেরাও করে। তখন মুসলিম সেনা সদস্য ছিল মাত্র তিন হাজার।
এক অসম সমরে অবতীর্ণ দুই শিবির। এ সময় মিত্র শক্তির সহযোগিতা ছিল বড়ই প্রয়োজন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল। মিত্র বনু কুরাইজা সহযোগিতা করবেতো দূরে থাক বরং শত্রুর সাথে হাত মেলায়।
বনু কুরাইজার সাথে যে সন্ধি চুক্তি ছিল, তা তারা ভঙ্গ করে মক্কার মুশরিকদের সাথে মিলে যায়। সেই সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালাগাল করে।
যখন বনী নজীরের সর্দার হুআই বিন আখতাব বনু কুরাইজার সর্দার কাব বিন আসাদ কুরাজীকে তার দলে টানতে আসে,তখন সে দৃঢ়তার সাথে বলেছিলঃ
وَيْحكَ يَا حُيَيُّ: إنَّكَ امْرُؤٌ مَشْئُومٌ، وَإِنِّي قَدْ عَاهَدْتُ مُحَمَّدًا، فَلَسْتُ بِنَاقِضٍ مَا بَيْنِي وَبَيْنَهُ، وَلَمْ أَرَ مِنْهُ إلَّا وَفَاءً وَصِدْقًا
আফসোস তোমার জন্য হে হুয়াই! নিশ্চয় তুমি এক নিকৃষ্ট ব্যক্তি। নিশ্চয় আমি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে চুক্তিবদ্ধ। সুতরাং আমার ও তার মাঝে যে চুক্তি রয়েছে তা আমি ভঙ্গ করতে পারবো না। আর আমি তাকে একজন ওয়াদা রক্ষাকারী এবং সত্যনিষ্টই পেয়েছি। [সীরাতে ইবনে হিশাম-২/২২০, গাযওয়ায়ে খন্দক অধ্যায়)
কিন্তু অবশেষে হুয়াইয়ের ফাঁদে পড়ে চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুপক্ষের সাথে মিলে যায়। যখন নবীজীর প্রতিনিধি তার সাথে সাক্ষাতে চুক্তির কথা স্মরণ করায় তখন সে তাচ্ছিল্যের সাথে বলেঃ
مَنْ رَسُولُ اللَّهِ؟ لَا عَهْدَ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مُحَمَّدٍ وَلَا عَقْدَ
আল্লাহর নবী কে? মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং আমাদের মাঝে কোন চুক্তি নেই। কোন সন্ধি নেই। [সীরাতে ইবনে হিশাম-২/২২২]
এইভাবে শান্তি ও সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে বনু কুরাইজার নেতা কাব বিন আসাদ বিপদের মুহুর্তে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মেলায়। মুসলমানদের জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে বর্হিশত্রু মক্কার মুশরিকদের বিরাট বাহিনী। অপরদিকে ঘরের শত্রু বনু কুরাইজা।
এ গাদ্দারীর কারণেই খন্দক যুদ্ধ শেষে বনী কুরাইজাকে শায়েস্তা করতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনী নিয়ে বনু কুরাইজা অভিমুখে যাত্রা করেন। বনু কুরাইজার অধিবাসীরা তাদের দুর্গ বন্ধ করে বসে থাকে। ২৫দিন পর্যন্ত তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অবশেষে তাদের বন্দি করা হয়। একজন মহিলা ছাড়া কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। যে মহিলার কারণে খাল্লাদ বিন সুআইদ রাঃ নামক সাহাবী শহীদ হন। [উয়ুনুল আছার-২/৭৮]
তিরমিজী, নাসায়ী ও ইবনে হিব্বানের বর্ণনা অনুপাতে চারশত লোককে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ যিনি করেছেন, তিনি নিজেকে মুক্ত চিন্তার মানুষ হিসেবে দাবী করছেন। নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বলে দাবী করছেন।
আমি উক্ত ভাইকে প্রশ্ন করতে চাই! যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের দেশের উপর আক্রমণ করেছিল। তখন আমাদের দেশের নাগরিক যেসব রাজাকাররা পাকিস্তানীদের পক্ষে কাজ করেছিল। আমাদের হত্যায় সহযোগিতা করেছিল। সেসব গাদ্দার রাজাকারদের ক্ষেত্রে মুক্ত চিন্তার অধিকারী ভাইটার মতামত কী? সেই সমস্ত রাজাকারদের ছেড়ে দেয়া হবে?
মুক্ত চিন্তার অধিকারী দাবিদার ভাইয়েরাই রাজাকারদের হত্যা করার জন্য সবচে’ বেশি সোচ্চার। রাজাকারদের ফাঁসির দাবীতে দিনের পর দিন শাহবাগের রাস্তা বন্ধ করে পিজি হাসপাতালের মুমূর্ষূ রোগীদের কষ্ট দিয়েছিল এসব তথাকথিত মুক্ত চিন্তাবীদরাই। আবার তাদের মুখেই গাদ্দার বনু কুরাইজার জন্য এ কেমন হাস্যকর দরদ উথলে উঠে? এটা কি দ্বিমুখী নীতি নয়?
আমিও আপনাকে বলি! অন্যের বলা কথাগুলি তোতাপাখির মত না আউড়ে, নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে ঘটনাগুলো যাচাই করুন। তাহলে দেখবেনঃ বনু কুরাইজার ঘটনার উপর কোন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তির প্রশ্ন থাকতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা উক্ত ভাইকে হিদায়াত দান করুন। বিবেকের বদ্ধ দুয়ার খুলে দিন। আমাদের সকলকে হিদায়াতের উপর অটল রাখুন। আমীন।
---------------------------------------------------
ভাস্কর্যের নামে মূর্তিপূজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব
প্রশ্ন
আসসালামুআলাইকুম। বর্তমান সময়ে অত্যন্ত আলোচিত একটি বিষয় হলো আদালত প্রাঙ্গন থেকে মূর্তি অপসারণ। অনেকে বলছে এটি একটি ভাষ্কর্য বৈ কিছু না। ইসলাম আসলে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিষয়ে কি বলেছে। এ দুটির মধ্যে আদৌ কোন মৌলিক পার্থক্য আছে কি না দয়া করে কুরআন ও হাদিসের দলিল সহকারে জানাবে যাতে করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার সময় আমি দলিল দিয়ে কথা বলতে পারি।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।
উত্তর
ভাস্কর্য শব্দটা এসেছে ভাস্কর থেকে।
ভাস্কর = ভাস (আলো) + কর অর্থাৎ যা আলো দেয় তাকে ভাস্কর বলে। এজন্য সূর্যের সমার্থক শব্দ ভাস্কর। এখানে আলো জ্ঞান অর্থেও ব্যবহৃত হয়। সে হিসেবে- যা জ্ঞান দেয় তাকেই ভাস্কর বলে।
ভাস্কর্য হচ্ছে ঐ জিনিস, যার মাধ্যমে কোন শিল্পী কোন বিমূর্ত ধারনাকে মূর্তিমান করে। অর্থাৎ কোন মূর্তি থাকবে, যাকে দেখে হয়ত কোন ইতিহাস, ঘটনার কথা মনে পড়বে। অর্থাৎ মূর্তিটি কোন নির্দ্দিষ্ট মেসেজ বহন করবে বা জ্ঞান দিবে।
অর্থাৎ
ভাস্কর হচ্ছে, যিনি কোন বিমূর্ত ধারণাকে ইট,কাঠ,পাথর দিয়ে মূর্ত করেন তাকেই ভাস্কর বলে। এবং ভাস্কর্য হচ্ছে ঐ মূর্তি যা কোন নির্দ্দিষ্ট মেসেজ বহন করে।
ভাস্কর্য অর্থটি ভাল করে বুঝে আসে, তাহলে আমাদের ভাস্কর্য ও মূর্তি নিয়ে যে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে সেটি সহজেই নিরসন করা সম্ভব।
আমাদের অন্তরের কোন বাসনা বা চেতনাকে দৃশ্যায়িত করা।
যদি সেই দৃশ্যায়িত করা বস্তুটি প্রাণীর মূর্তির সাদৃশ্য নেয়, তাহলে সেটি ভাস্কর্য হবার সাথে, সাথে মূর্তি হয়ে যাবে।
আর যদি প্রাণীর দৃশ্য প্রকাশ না করে তাহলে সেটি ভাস্কর্যই থেকে যাবে। যেমন পতাকার ভাস্কর্য নির্মাণ। গাছ, মিনার, জাতীয় ফল কাঠাল, আম ইত্যাদির ভাস্কর্য।
এসব শুধুই ভাস্কর্য। কিন্তু যখন ভাস্কর্যের চিত্রটি ব্যক্তি বা প্রাণীর ছবি প্রকাশ করে তখন সেটি আর শুধু ভাস্কর্য থাকে না মূর্তিও হয়ে যায়।
তো ইসলাম প্রাণী ছাড়া অন্য কিছুর ভাস্কর্যকে নিষিদ্ধ করে না। তাই পতাকা, কাঠাল, আম ইত্যাদির ভাস্কর্য নির্মাণকে হারাম বলার সুযোগ নেই।
কিন্তু ভাস্কর্য মূর্তির রূপ পরিগ্রহ করে, সেই মূর্তি কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলাম এসেছে মূর্তি উৎখাত করার জন্য। মূর্তির মাধ্যমে ঠুনকো হাস্যকর আবেগ প্রকাশ করতো মক্কার মুশরিকরা। সেসব ভাস্কর্যরূপী মূর্তিগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে ভেঙ্গেছেন।
কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদীসে রাসূলে এসব ভাস্কর্যরূপী মূর্তির বিরুদ্ধে এসেছে।
উদাহরণতঃ
বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাদের ভাস্কর্যের নামে মূর্তি বানানো হচ্ছে। ন্যায়ের প্রতিকের নামে কাল্পনীক গ্রীক দেবীর ভাস্কর্য মূর্তি বানানো হচ্ছে।
ঠিক একইভাবে মুশরিকরা পূর্বসূরী আল্লাহর ওলী “ওয়াদ্দ, সুওয়াক, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসর” নামক বনী ইসরাঈলের প্রসিদ্ধ আল্লাহর ওলীদের নামে ভাস্কর্য মূর্তি বানিয়েছিল।
“ওয়াদ্দ, সুওয়াক, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসর” নাম্মী ভাস্কর্যগুলো কোন কাল্পনিক ব্যক্তি ছিলেন না। তারা সবাই বনী ইসরাঈলের ওলী ছিলেন।
তাদের স্মরণে পরবর্তীতে তাদের নামে ভাস্কর্য তথা মূর্তি নির্মাণ করা হয়।
হাদীসের ভাষ্য দেখুনঃ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، «صَارَتِ الأَوْثَانُ الَّتِي كَانَتْ فِي قَوْمِ نُوحٍ فِي العَرَبِ بَعْدُ أَمَّا وَدٌّ كَانَتْ لِكَلْبٍ بِدَوْمَةِ الجَنْدَلِ، وَأَمَّا سُوَاعٌ كَانَتْ لِهُذَيْلٍ، وَأَمَّا يَغُوثُ فَكَانَتْ لِمُرَادٍ، ثُمَّ لِبَنِي غُطَيْفٍ بِالْجَوْفِ، عِنْدَ سَبَإٍ، وَأَمَّا يَعُوقُ فَكَانَتْ لِهَمْدَانَ، وَأَمَّا نَسْرٌ فَكَانَتْ لِحِمْيَرَ لِآلِ ذِي الكَلاَعِ، أَسْمَاءُ رِجَالٍ صَالِحِينَ مِنْ قَوْمِ نُوحٍ، فَلَمَّا هَلَكُوا أَوْحَى الشَّيْطَانُ إِلَى قَوْمِهِمْ، أَنِ انْصِبُوا إِلَى مَجَالِسِهِمُ الَّتِي كَانُوا يَجْلِسُونَ أَنْصَابًا وَسَمُّوهَا بِأَسْمَائِهِمْ، فَفَعَلُوا، فَلَمْ تُعْبَدْ، حَتَّى إِذَا هَلَكَ أُولَئِكَ وَتَنَسَّخَ العِلْمُ عُبِدَتْ
ইবনু ‘আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ্ (আঃ)-এর কওমের মাঝে চালু ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ‘‘দুমাতুল জান্দাল’’ নামক জায়গার কাল্ব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া‘আ, হল, হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুছ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী ‘জাওফ’ নামক স্থান। ইয়া‘উক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা‘ গোত্রের হিময়ার শাখার মূর্তি। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শায়ত্বন তাদের কওমের লোকদের অন্তরে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে মাজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পুণ্যবান লোকের নামেই এগুলোর নামকরণ কর। কাজেই তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐ সব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলোর ব্যাপারে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা আরম্ভ করে দেয়। (বুখারী, হাদীস নং-৪৯২০, ইফাবা-৪৫৫৫)
উপরোক্ত হাদীস পরিস্কার প্রমাণ করছে যে, মুশরিকরা মূলত তাদের পূর্ববর্তী আল্লাহর ওলীদের স্বরণে তাদের ভাস্কর্য মূর্তি নির্মাণ করেছিল।
ঠিক একই কাজ বর্তমানে ভাস্কর্যপূজারীরা করছে। চেতনা ফেরী করার নামে।
অথচ
পবিত্র কুরআন এসব মূর্তির নামের ভাস্কর্যপূজা নিষিদ্ধ করে আয়াত নাজিল করেঃ
وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا ۙ۬ وَّ لَا یَغُوْثَ وَ یَعُوْقَ وَ نَسْرًاۚ۲۳ وَ قَدْ اَضَلُّوْا كَثِیْرًا ۚ
‘আর তারা বলেছিল, তোমরা পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদের এবং পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ সুওয়াকে, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে। অথচ এগুলো অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে।’ -সূরা নূহ : ২৩-২৪।
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْاَوْثَانِ وَ اجْتَنِبُوْا قَوْلَ الزُّوْرِۙ۳۰
‘তোমরা পরিহার কর অপবিত্র বস্ত্ত অর্থাৎ মূর্তিসমূহ এবং পরিহার কর মিথ্যাকথন।’ -সূরা হজ্জ : ৩০
কুরআন মজীদে মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পথভ্রষ্টতার কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়েছে। এক আয়াতে এসেছে-
رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضْلَلْنَ كَثِیْرًا مِّنَ النَّاسِ ۚ ‘ইয়া রব, এরা (মূর্তি ও ভাস্কর্য) অসংখ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে!’ -সূরা ইবরাহীম : ৩৬
অন্য আয়াতে এসেছে-
وَ قَالُوْا لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَ لَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّ لَا سُوَاعًا ۙ۬ وَّ لَا یَغُوْثَ وَ یَعُوْقَ وَ نَسْرًاۚ۲۳ وَ قَدْ اَضَلُّوْا كَثِیْرًا ۚ۬
‘আর তারা বলেছিল, তোমরা পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদের এবং পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ সুওয়াকে, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসরকে। অথচ এগুলো অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে।’ -সূরা নূহ : ২৩-২৪
اِنَّمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ اَوْثَانًا وَّ تَخْلُقُوْنَ اِفْكًا ؕ
তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে উপাসনা কর (অসার) মূর্তির এবং তোমরা নির্মাণ কর ‘মিথ্যা’। -সূরা আনকাবুত : ১৭
এভাবে অসংখ্য আয়াতে উপরোক্ত ভাস্কর্য নামের মূর্তির নিষিদ্ধের কথা এসেছে।
ভাস্কর্যের বিধান
ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিধান
মূর্তি ও ভাস্কর্য : পশ্চাৎপদতা ও ইসলাম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতার মূর্তিমান প্রতিভূ
যে ভাস্কর মূর্তির সাদৃশ্য ধারণ করে, তা অবশ্যই মূর্তি। নাম যা’ই রাখা হোক তা মূর্তি। মূর্তির স্থান মন্দিরে। মুসলমানদের চলাচলের রাস্তায় নয়। দর্শণীয় স্থানে নয়।
মসজিদের শহরকে ভাস্কর্যের নামে মূর্তির শহরে পরিণত করার পৌত্তলিক মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবী।
এই মূর্তির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন বলেই আমাদের প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেশান্তরিত হতে হয়েছে। রাস্তায় মার খেতে হয়েছে। রক্তাক্ত হতে হয়েছে।
নবীজীর সত্যিকার উম্মতীরা নবীজীর সেই রক্তে রাঙ্গা পথে হেটে হলেও স্বীয় মাতৃভূমিকে মূর্তি মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে এটাই ঈমানের দাবী।
তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত, তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা মেহনতের মাধ্যমে এ মূর্তি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের মূর্তিমুক্ত শান্তির দেশ গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
--------------------------------------------------
শিশু বিধর্মী পরিবারে জন্ম নিলে এতে শিশুটির দোষ কী?
প্রশ্ন
আল্লাহ্ কেন সকল মানুষকে মুসলিম পরিবারে জন্ম না দিয়ে হিন্দু, খ্রিস্টান প্রভৃতি অমুসলিম পরিবারে জন্ম দেন? এতে ওই শিশুর কি দোষ?
উত্তর
অমুসলিম পরিবারে কোন শিশু জন্ম নেয়া কোন অপরাধ নয়। এতে শিশুটিরও কোন দোষ নেই। এ কারণেই হাদীসে পরিস্কার বলা হয়েছে প্রতিটি শিশু যার ঔরষেই জন্ম গ্রহণ করুক না কেন, সে নাবালক থাকা অবস্থায় মুসলিমই থাকে। তারপর বড় হলে তার পিতা মাতা তাকে ইহুদী খৃষ্টান ইত্যাদি কাফির বানায়।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ، أَوْ يُنَصِّرَانِهِ، أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَثَلِ البَهِيمَةِ تُنْتَجُ البَهِيمَةَ هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান অথবা অগ্নি উপাসকরূপে রূপান্তরিত করে। যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে [জন্মগত] কানকাটা দেখেছ? [বুখারী, হাদীস নং-১৩৮৫]
উক্ত সন্তান যদি ঐ শিশু তথা নাবালেগ অবস্থায় মারা যায়, তাহলে সে জান্নাতী হবে।
কিন্তু বালেগ হবার পর, যখন তার বিবেক বুদ্ধি জাগ্রত হয়। তখন আল্লাহর দেয়া আকল দিয়ে তার রবকে চিনে নেয়া দায়িত্ব। মানুষকে আল্লাহ তাআলা অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা করেছেন আকল দিয়ে। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। কারণ হল, মানুষের আকল-বুদ্ধি, বিবেক আছে। অন্য কোন প্রাণীর তা নেই।
একজন সুস্থ্য বিবেক সম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারবে যে, সামান্য একটি গাড়ি ইচ্ছেমত চলতে পারে না। নিজে নির্মিত হতে পারে না, এর জন্য নির্মাতা লাগে, গাড়ি চলতে ড্রাইভার লাগে। তো এ বিশ্ব চরাচর, এ সুবিশাল সৌর জগত, অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্র এসব কিছুই নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। নিশ্চয় কোন নিপূণ কারিগর তার সুনিপূণ হাতে নির্মাণ করেছেন।
স্বাভাবিক বিবেকই ব্যক্তিকে এক মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যাবে। এরপর তার অনুসন্ধিৎসা সত্য ধর্ম খুঁজে নিতে সহায়তা করবে।
এ কারণে প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস করা ও তার সময়কার সত্য ধর্মের উপর ঈমান আনয়ন করা ছাড়াই মৃত্যু বরণ করে, তাহলেই কেবল সে জাহান্নামী হবে।
নাবালেগ তথা শিশু অবস্থায় কাফির ব্যক্তির সন্তান মারা গেলে উক্ত শিশুর কোন শাস্তি নেই।
সহীহ বুখারীর ১৩৮৬ নং বর্ণনায় একটি দীর্ঘ হাদীস এসেছে। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘ হাদীসের এক পর্যায়ে এসেছেঃ “আমরা চলতে চলতে একটি সবুজ বাগানে উপস্থিত হলাম। এতে একটি বড় গাছ ছিল। গাছটির গোড়ায় একজন বয়ঃবৃদ্ধ লোক ও বেশ কিছু বালক বালিকা ছিল।……..”।
এর ব্যাখ্যায় পরে এসেছে-“গাছের গোড়ায় যে বৃদ্ধ ছিলেন, তিনি ইবরাহীম আলাইহি সালাম এবং তাঁর চারপাশের বালক-বালিকারা মানুষের সন্তান”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৩৮৬, ইফাবা-১৩০৩]
উক্ত হাদীসে এসেছে মানুষের শিশু সন্তানরা জান্নাতে ইবরাহীম আঃ এর কাছে থাকবে। হাদীসে শব্দ হল, মানুষ। মানুষের মাঝে মুসলিম ও বিধর্মী সবাই শামিল।
এ কারণেই ইমাম নববী রহঃ বিধর্মীদের নাবালগ মৃত সন্তানদের জান্নাতী হবার বক্তব্যকে বিশুদ্ধ বলেছেন।
والثالث وهو الصحيح الذى ذهب اليه المحققون انهم من اهل الجنة (شرح النووى على صحيح مسلم-2/337
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ۚ ثُمَّ اللَّهُ يُنشِئُ النَّشْأَةَ الْآخِرَةَ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ [٢٩:٢٠
বলুন,তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ,কিভাবে তিনি সৃষ্টিকর্ম শুরু করেছেন। অতঃপর আল্লাহ পুর্নবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম। [সূরা আনকাবুত-২০]
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا ۖ فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ [٢٢:٤٦
তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি,যাতে তারা সমঝদার হৃদয় ও শ্রবণ শক্তি সম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারে? বস্তুতঃ চক্ষু তো অন্ধ হয় না,কিন্তু বক্ষ স্থিত অন্তরই অন্ধ হয়। [সূরা হজ্ব-৪৬]
---------------------------------------------------
গড কেন থাকতেই হবে? গড থাকলে তার একটি ধর্ম কেন থাকতেই হবে?
প্রশ্ন
১. গড কেন থাকতেই হবে ?
২. গড থাকলে কেন তার একটা ধর্ম থাকতেই হবে ?
আমার বন্ধু টি মুসলমান। কিন্তু বিভিন্ন অনলাইন জিনিস থেকে সে প্রভাবিত হয়ে এখন তার চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে আমাকে এই প্রশ্ন করেছে।
যদি এগুলোর যথাযথ যুক্তি সহ উত্তর দিতেন খুব ই ভালো হতো। আর অবশ্যই আমার বন্ধুর এবং সমস্ত উম্মত এর হিদায়াত এর দুআ এর দরখাস্ত থাকলো।
১ম প্রশ্নের জবাব
গড বলতে যা বুঝানো হচ্ছে, তাহলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। সৃষ্টিকর্তা।
উল্লেখিত প্রশ্নটি একটি হাস্যকর প্রশ্ন। দেখুন কেমন হাস্যকর। আমি আপনাকে প্রশ্ন করছিঃ
১.গাড়ি চলতে হলে ড্রাইভার বা এর সঞ্চালক কেন থাকতেই হবে?
২.বাড়ি নির্মাণের জন্য নির্মাতা কেন থাকতেই হবে?
আমার উক্ত প্রশ্ন দু’টির জবাব কি হবে? এমন অসংখ্য প্রশ্ন করা যায়। এসবের জবাব কি হবে? আমার এসব প্রশ্নগুলো কি আপনার কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছে না? অবশ্যই হাস্যকর ও বাচ্চাসূলভ প্রশ্ন।
কোন কিছু চলতে হলে, কোন কিছু অস্তিত্ব লাভ করতে হলে, সঞ্চালক ও অস্তিত্বকারী নির্মাতা লাগবেই। এটি স্বাভাবিক বুদ্ধির কথা। একজন বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া একথা কেউ বলতে পারে না যে, সব কিছুই এমনিতেই হয়ে গেছে। কেউ নেই এসব নির্মানের। যেমন কেউ যদি বলে একশত তলা বিল্ডিং এমনিতেই এক ঝড়ে তৈরী হয়ে গেছে। কোন সঞ্চালক বা ড্রাইভার ছাড়াই গাড়ি অনবরত চলছে বললে উক্ত ব্যক্তিকে কেবল পাগলা গারদেই পাঠানো হবে। এছাড়া গত্যান্তর নেই।
অসংখ্য সৃষ্টিমালা, আকাশময় নক্ষত্রপূঞ্জ, হাজারো গ্রহ আপন কক্ষপথে অনবরত ঘুরে বেড়াচ্ছে, এই সুন্দর সাজানো পৃথিবী এসব কিছুই এমনিতেই হয়ে গেল? এসবের কোন স্রষ্টা নেই? এসব পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কী হতে পারে?
আমাদের করা দু’টি প্রশ্নের জবাব যে জবাব উক্ত বন্ধুটি দিবেন, তার প্রশ্নের একই জবাব হবে।
২য় প্রশ্নের জবাব
উক্ত প্রশ্নের আহমকী বুঝানোর জন্য আমরা দু’টি আহমকী প্রশ্ন করিঃ
১.ড্রাইভার বা সঞ্চালক থাকলে কেন তার নির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই গাড়ি চালাতে হবে? [যেমন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছার জন্য গাড়িটি ব্যবহার করা। সেটি ব্যবহারের যেসব নীতিমালা রয়েছে সেগুলো যথাযথ প্রয়োগ করা, যেমন গাড়িতে ফুয়েল বা গ্যাস ভর্তি করা, চাকায় পাম্প থাকা ইত্যাদি]
২.বাড়ির নির্মাতা থাকলে কেন তার একটা মাকসাদ থাকতেই হবে? [যেমন বসবাসের জন্য বাড়ি নির্মাণ, অফিস আদালতে জন্য নির্মাণ, অবকাশ যাপনের জন্য নির্মাণ ইত্যাদি]
উপরোক্ত দু’টি প্রশ্ন আপনার কাছে কেমন মনে হচ্ছে?
হাস্যকর ও বাচ্চাসূলভ নয়কি?
যখন কোন কিছু নির্মিত হতে হলে নির্মাতা স্রষ্টা লাগেই। তখন সেই স্রষ্টার কিছু নিয়মনীতি থাকবেই। তার কিছু বিধানাবলী থাকবেই। তিনি এসব অহেতুক নির্মাণ করেন না। তার একটি মাকসাদ থাকে। সেই মাকসাদ পূর্ণ করার জন্য তিনি কিছু বিধি-নিষেধ করবেনই। এটাই স্বাভাবিক। এটাই স্বাভাবিক বিবেক ও বুদ্ধির দাবি।
তেমনি এ বিশ্ব চরাচর যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানবমন্ডলী সৃষ্টি করেছেন। সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহ এসব অহেতুক সৃষ্টি করেননি। তারও কিছু নিয়মনীতি আছে। বিধি-নিষেধ আছে। মহান স্রষ্টা আল্লাহর নিয়মনীতি আর বিধি-নিষেধের নামই হল ধর্ম।
যা অমান্য করা স্রষ্টার নীতিকে অগ্রাহ্য করা। যা গর্হিত অপরাধ ছাড়া আর কী’ হতে পারে?
যেমন বাড়ি নির্মাণ করা হল বসবাসের জন্য। কিন্তু বসবাসের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, সেটিকে কামার খানা হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়ে গেল।
যে মাকসাদে নির্মাতা বাড়ি নির্মাণ করলেন। সেই মাকসাদের উল্টো ব্যবহার সেটির মূল অবস্থা নষ্ট করে দেয়া হল, উপযোগী রাখা হলো না, নির্মাতার উদ্দেশ্যের বিপরীত তা ব্যবহার করে নষ্ট করে দেয়া হল, তাহলে নির্মাতাতো ক্ষিপ্ত হবেই। তিনিতো এর জন্য শাস্তি দিবেনই। এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
আশা করি সহীহ সমঝ ও আকল থাকলে উপরোক্ত দু’টি প্রশ্নের অসাড়তা পরিস্কার হয়ে গেছে।
قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ [١٣:١٦
বলুনঃ আল্লাহই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি একক, পরাক্রমশালী। [সূরা রা’দ-১৬]
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ [٣:٨
হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা। [সূরা আলেইমরান-৮]
---------------------------------------------------
পৃথিবীর হাজারো ধর্মের মাঝে ইসলামই সত্য ধর্ম বুঝবো কিভাবে?
আমি আমার এক নাস্তিক বন্ধুকে একদিন বলেছিলাম যে, সত্যকে গ্রহন করো। সে বলল, “পৃথিবীতে তো হাজার, হাজার ধর্ম আছে। তো আমি এই হাজার, হাজার ধর্ম থেকে কিভাবে সত্য ধর্ম খুঁজবো? তাছাড়া তোমার ধর্মই যে সত্য এ কথা তুমি কি আমাকে প্রমাণ করে দেখাতে পারবে?”। এই প্রশ্নটা আমাকেও নাস্তিকতার দিকে ধাবিত করেছে। আমার নিজের কাছেই এখন মনে হয় আমার ধর্মই কি সঠিক?
উত্তর
ইসলাম সত্য ধর্ম হবার উপর অসংখ্য প্রমাণ বিদ্যমান।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুদ্ধি বিবেক দিয়েছেন। সেই বিবেক বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করলে। সেই সাথে সকল ধর্মমতের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো যাচাই করলেই সেই সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবে।
যেহেতু ধর্ম একটি জীবন ব্যবস্থা। চাই ধর্মগ্রন্থ না থাকলে সেটি মূলত কার্যকরী ধর্ম হিসেবে বাকি থাকে না। তাই যেসব ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ রয়েছে আমরা প্রথমে সেসবকে ধর্ম হিসেবে ধরে নিতে পারি।
তারপর সেগুলোকে আল্লাহর দেয়া বুদ্ধি বিবেক ও যুক্তি দিয়ে যাচাই করতে পারি।
যদি আকল সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে অবশ্যই ইসলাম সত্য ধর্ম তা প্রমাণিত হয়ে যাবে।
কয়েকটি উদাহরণ উপস্থাপন করা হল,
আপনি উক্ত ভাইটিকে বলুন! চলুন আমরা ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থগুলো নিয়ে আলোচনা করি। যুক্তির বিচারে যে ধর্ম সত্য হবে, আমরা সেটিকেই মানবো।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-১
কোন ধর্মগ্রন্থ তার ধর্মকে সবার জন্য ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে?
যে ধর্মগ্রন্থে তাদের ধর্মকে সবার ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে, আমরা কেবল সেই ধর্মই মানবো। আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে বুঝে যাবো, সেগুলো সবার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট জাতি গোষ্ঠির জন্য সীমাবদ্ধ ধর্ম।
এ বিষয়ে একমাত্র ইসলামই টিকে যাবে। আর কোন ধর্ম টিকবে না। কারণ ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কুরআন ছাড়া আর কোন ধর্মগ্রন্থে তাদের ধর্মকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে কথাটি নেই। কেবল ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থ কুরআনেই একথাটি বিদ্যমান।
ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তৌরাত। উক্ত তৌরাতের ৫টি অংশ। যথা-পয়দায়েশ, হিজরত, লেবীয়, শুমারী ও দ্বিতীয় বিবরণ এর কোথাও মুসা আঃ ও ইহুদী ধর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হবার কথা নেই। বরং বারবার শুধু বনী ইসরাঈলীদের কথাই বর্ণিত হয়েছে।
যা দ্বারা পরিস্কার যে, ইহুদী ধর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য নয়, বরং শুধুই বনী ইসরাঈলীদের জন্যই প্রেরিত হয়েছে।
যদি খৃষ্টানদের ইঞ্জিল খুলেন। ইঞ্জিলের মোট চারটি পার্ট রয়েছে, যথা মথি, মার্ক, লুক ও ইউহান্না।
কোথাও একথা বর্ণিত হয়নি যে, খৃষ্ট ধর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছে। বরং পরিস্কার শব্দে সেখানে এসেছে যে, তা শুধু বনী ইসরাঈলীদের জন্য এসেছে।
উদাহরণত:
ঈসা সেই বারজনকে এ সমস্ত আদেশ দিয়া পাঠাইলেন, “তোমরা অ-ইহুদীদের নিকট বা শমরীয়দের কোন গ্রামে যাইও না, বরং ইস্রায়েল জাতির হারান মেষদের নিকটে যাইও। {ইঞ্জিল শরীফ, মথি-১০:৫-৭]
আরেক স্থানে এসেছেঃ
একজন কেনানীয় স্ত্রীলোক এসে চিৎকার করে বলতে লাগল, “হে প্রভু, দাউদের বংশধর,আমার উপর রহম করুন। ভূত আমার মেয়েটিকে ভীষণ ভাবে ধরিয়াছে।”
ঈসা কিন্তু তাহাকে একটা কথাও বলিলেন না। তখন তাহার সাহাবীরা আসিয়া অনুরোধ করিয়া বলিলেন, “উহাকে বিদায় করিয়া দিন, কারণ সে আমাদের পিছনে চীৎকার করিতেছে”।
উত্তরে ঈসা বলিলেন, আমাকে কেবল ইস্রায়েল বংশের হারান মেষদের নিকটেই পাঠান হইয়াছে।” [ইঞ্জিল শরীফ, মথি ১৫: ২২-২৪]
তাছাড়া হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের কোথাও তাদের ধর্মকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হবার কথা বর্ণিত হয়নি।
কিন্তু কুরআনে কারীমের একাধিক স্থানে ইসলাম ধর্মকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হবার প্রমাণ নিহিত। যেমন-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ [٢١:١٠٧
আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি। [সূরা আম্বিয়া, ২১: ১০৭]
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ [٣٤:٢٨
আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি;কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। [সূরা সাবা, ৩৪:২৮]
উপরোক্ত আয়াত ছাড়াও আরো অনেক আয়াত আছে, যা প্রমাণ করে, ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাঃ সমগ্র মানবজাতির প্রেরিত হয়েছেন। আর কোন নবী বা ধর্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছে মর্মে ধর্মগ্রন্থগুলোতে উদ্ধৃত হয়নি।
যা প্রমাণ করে ইসলামই সবার জন্য বর্তমানে পালনীয় ধর্ম।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-২
ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআন ছাড়া পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয় কোন ধর্ম নেই, যে ধর্মের কিতাবটি যেভাবে নাজিল হয়েছে, তা তার আপন ভাষায় অবিকৃত অবস্থায় সর্বত্র পাওয়া যায়।
পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে কুরআন তুলে নিন। আরব, আজম, স্প্যানিশ, ডেনিশ, ইরাক, ইরান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চিন, জাপান, উগান্ডা, আফ্রিকা, আমেরিকা, ফরাসী, যেকোন দেশে গমণ করুন। সারা বিশ্বের সর্বত্র কুরআন যে ভাষায় নাজিল হয়েছে, সেই ভাষায় হুবহু অবিকৃত আকারে সংরক্ষিত পাবেন।
কিন্তু ইহুদীদের তৌরাত, খৃষ্টানদের বাইবেল, হিন্দুদের বেদ আর বৌদ্ধদের ত্রিপিটক এমন পাবেন না। বরং তা কোন ভাষায় তাদের ধর্মের অবতারের উপর নাজিল হয়েছে? সে ভাষায় উক্ত কিতাবের কোন অস্তিত্বই পাবেন না।
আরেক একেক ভাষায় একেক বাইবেল পাবেন। একেক ভাষায় একেক বেদ পাবেন।
এতদূর যেতে হবে না। আপনি তৌরাত ও যবুর ও ইঞ্জিলের বাংলাদেশী ভার্সনই একাধিক প্রকাশনীরটি খুলে দেখুন না। দেখবেন একটির ভাষা আরেকটির সাথে মিল নেই। প্রচুর গড়মিল।
কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ। ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। পবিত্র কুরআনে তা পাবেন না। সারা বিশ্বের কুরআনের আরবী পাঠ একই। গুহার ভিতরে যদি কোন কুরআন পাওয়া যায়, সেই কুরআন, রাজ প্রসাদে থাকা কুরআন একই ভাষায়, একই শব্দে, একই সূরা আয়াতে উদ্ধৃত আছে।
কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন নেই।
যা পরিস্কার প্রমাণ করে, ইসলামই একমাত্র অবিকৃত ও সত্য ধর্ম।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-৩
সারা পৃথিবীতে কোন ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থের হাফিজ তথা পুরো কিতাব মুখস্ত এমন ব্যক্তি খুঁজে পাবেন না।
পবিত্র কুরআনের কোটি, কোটি হাফিজ বিদ্যমান। পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে হাফিজকে একত্র করুন। সকল হাফিজ একই শব্দে, একই পদ্ধতিতে পুরো কুরআন পড়ে শুনাবে। কিন্তু বাইবেল, বেদ বা ত্রিপিটকের এমন হাফিজ পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
যা প্রমাণ করে, কুরআন ও ইসলাম সত্য ধর্ম। এ কারণে এ ধর্মগ্রন্থকে অবিকৃত রাখা হয়েছে। এর সংরক্ষণ করা হয়েছে কোটি মানুষের সিনায় মুখস্তের মাধ্যমে সংরক্ষিত করে।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-৪
পৃথিবীর কোন ধর্মের অবতার কিভাবে জীবনাচার চালিয়েছেন? কিভাবে সংসার চালিয়েছেন? কিভাবে ইবাদত করতেন? কিভাবে ব্যবসা করতেন? কিভাবে সমাজ চালাতেন? কিভাবে বিচার করতেন?
এক কথায় তার জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিক নির্ভর হালাত, বিশুদ্ধ সূত্রসহ বর্ণিত হয়নি।
কিন্তু ইসলামই একমাত্র ধর্ম। যার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে বাথরুমে যেতেন, কিভাবে গোসল করতেন, কিভাবে বিয়ে করেছেন? কিভাবে সংসার চালাতেন? কিভাবে যুদ্ধ করেছেন? কিভাবে ব্যবসা করেছেন? আখলাক কেমন? কিভাবে ইবাদত করতেন? মোটকথা, তার পূর্ণাঙ্গ জীবনের প্রতিটি হালাত, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সঠিক ও বিশুদ্ধ সূত্রসহ সংরক্ষিত আছে।
আর কোন ধর্মের অবতারের ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান নেই।
যদি বলা হয়, ঈসা আঃ ও মুসা আঃ নামায কিভাবে পড়তেন? রুকুতে গিয়ে কী পড়তেন? এর কোন জবাব ইহুদী ও খৃষ্টানরা দিতে পারবে না।
একই হালাত হিন্দু ও বৌদ্ধদের। তারাও তাদের অবতারের পূর্ণ জীবন বিশুদ্ধ সূত্র উল্লেখ করে বর্ণনা করতে পারবে না। কিন্তু মুসলমানদের নবীর সর্ব হালাত, বিশুদ্ধ সূত্রসহ সংরক্ষিতি আছে।
যা প্রমাণ করে ইসলামই একমাত্র বিশুদ্ধ ধর্ম।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-৫
ইসলাম ধর্ম ছাড়া আর কোন ধর্ম গ্রন্থে মানুষের জীবন চলার পূর্ণাঙ্গ কোন বিবরণ নেই। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র, বিয়ে, তালাক, মিরাছ, ব্যবসা, বাণিজ্য, এক কথায় একটি মানুষ কিভাবে চলবে? কিভাবে জীবন যাপন করবে? কিভাবে খাবে? কিভাবে কামাই করবে? কিভাবে সংসার করবে? কিভাবে ব্যবসা করবে? কিভাবে যুদ্ধ করবে? কিভাবে ইবাদত করবে?
এসব কিছু বিশদ আকারে কোন ধর্ম গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। বরং ইহুদী, খৃষ্ট, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম শুধু কিছু আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষের জীবন ঘনিষ্ট যুগ জিজ্ঞাসার কোন জবাব বিদ্যমান নেই।
বিশ্বাস না হলে, তৌরাত, ইঞ্জিল, বেদ, গীতা আর ত্রিপিটক খুলেই দেখুন না।
এসব গ্রন্থে কিছু নীতি বাক্য ছাড়া আর কিছুই নেই। মানুষের জীবন চলার পথের যুগ সমস্যার কোন সমাধানই বিদ্যমান নেই।
কিন্তু ইসলাম এমন ধর্ম নয়। ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ ও এ ধর্মের নবী থেকে মানুষের পূর্ণ জীবনের বিধানাবলী, জীবন ঘনিষ্ট সকল সমস্যার সমাধান নবী পর্যন্ত বিশুদ্ধ সূত্রসহ উল্লেখ করা আছে।
যা প্রমাণ করে, ইসলামই একমাত্র মানবতার সমাধান। সকল মানুষের জন্য নাজিলকৃত ধর্ম। ইসলামই একমাত্র নির্বাচিত ধর্ম।
ইসলাম ধর্মেরই অবিকৃত ঐশী গ্রন্থ বিদ্যমান। আর কোন ধর্মের ঐশী গ্রন্থ অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান নেই।
সহজ লজিক হলঃ যেটি স্রষ্টার নাজিলকৃত কিতাব হবে, সেটির মাঝে যার উপর নাজিল হল, তার মৃত্যুর সময়, মৃত্যুর ঘটনা, তার কবরের বিবরণ ইত্যাদি থাকবে না।
যদি এসব থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এটি স্রষ্টার নাজিলকৃত কিতাব নয়। বরং পরবর্তীতে লিখিত ব্যক্তির জীবনী।
উদাহরণতঃ
আমরা জানি, তৌরাত কিতাব হযরত মুসা আঃ এর উপর নাজিল হয়েছে। যেটি তার উপর নাজিল হয়েছে, উক্ত কিতাবে তার মৃত্যুর বিবরণ কিছুতেই থাকতে পারে না। যদি তা বিদ্যমান থাকে, তাহলে বুঝা যাবে, তা তার উপর নাজিলকৃতি ঐশীবানীময় কিতাব নয়। বরং পরবর্তীতে লিখিত মুসা আঃ এর জীবনীগ্রন্থ।
অথচ তৌরাতে দেখুনঃ
মাবুদ যা বলেছিলেন সেই অনুসারে মাবুদের গোলাম মুসা ঐ মোয়াব দেশেই ইন্তেকাল করলেন। মোয়াব দেশের বৈৎ পিয়োরের কাছে যে উপত্যাকা ছিল সেখানে মাবুদই তাকে দাফন করলেন।, কিন্তু তার কবরটা যে কোথায় তা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। ইন্তেকাল করবার সময়ে মুসার বয়স ছিল একশো বিশ বছর। তখনও তার দেখবার শক্তি দুর্বল হয়নি কিংবা তার গায়ের জোরও কমে যায়নি। বনি ইসরাইলরা মোয়াবের সমভূমিতে ত্রিশ দিন পর্যন্ত মুসার জন্য কান্নাকাটি করেছিল। [তৌরাত, দ্বিতীয় বিবরণ ৩৪:৫-৮]
তৌরাতের এসব বিবরণ পরিস্কার প্রমাণ করে, বর্তমানের বিদ্যমান তৌরাত মুসা আঃ এর উপর নাজিলকৃত ঐশী গ্রন্থ নয়। বরং পরবর্তী কারো লিখিত মুসা আঃ এর জীবনী গ্রন্থ। জীবনী গ্রন্থেই কেবল মৃত্যুর সময়, এবং কোথায় দাফন করা হয়েছে? মৃত্যুর পর তার উম্মতের কী করেছেন? তা বিধৃত হয়। যে মারা গেছেন, তার জীবদ্দশায় নাজিলকৃত কিতাবে এসব আসতেই পারে না।
বুঝা গেল, বর্তমানের তৌরাত মূলত মুসা আঃ এর জীবনী গ্রন্থ। তার উপর নাজিলকৃত ঐশী কিতাব নয়।
আগ্রহী পাঠকগণ নিজেই যাচাই করে দেখতে পারেন। বর্তমানের তৌরাতকে কিছুতেই ঐশী গ্রন্থ মনে হবে না, বরং তা নিরেট মুসা আঃ এর জীবনী গ্রন্থ বলেই প্রতিয়মান হবে।
একই অবস্থা ঈসা আঃ এর উপর নাজিলকৃত ইঞ্জিলের বর্তমান ভার্সনের। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোন ভাষায় প্রচারিত ঈঞ্জিল বইটি খুলুন, দেখবেন এটা মূলত ঐশী কিতাব নয়। বরং তা ঈসা আঃ এর জীবনী গ্রন্থ মাত্র।
কারণ ঐশীগ্রন্থ যার উপর নাজিল হল, তার মৃত্যু সংবাদ, কবরের বিবরণ আসতে পারে না, কিন্তু বর্তমানের বিদ্যমান ইঞ্জিলে তা আছে।
যেমন-
“সন্ধ্যা হলে পর অরিমাথিয়া গ্রামের ইউসুফ নামে একজন ধনী লোক সেখানে আসলেন। ইনি ঈসার উম্মত হয়েছিলেন।
পীলাতের কাছে গিয়ে তিনি ঈসার লাশটা চাইলেন। তখন পীলাত তাকে সেই লাশটা দিতে হুকুম দিলেন।
ইউসুফ ঈসার লাশটা নিয়ে গিয়ে পরিস্কার কাপড়ে জড়ালেন, আর যে নতুন কবর তিনি নিজের জন্য পাহাড়ের মধ্যে কেটে রেখেছিলেন সেখানে সেই লাশটা দাফন করলেন। পরে সেই কবরের মুখে বড় একটা পাথর গড়িয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন।” [ইঞ্জিল, মথি, ২৭:৫৭-৬০, মার্ক, ১৫: ৪২-৪৭, লূক, ২৩: ৫০-৫৩, ইউহোন্না, ১৯: ৩৮-৪২]
একই অবস্থা দেখতে হিন্দু ও বৌদ্ধতের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে। কিন্তু ইসলামের ধর্মগ্রন্থ এমন নয়। এখানে উক্ত ধর্মের নবী মারা যাবেন একথা বিদ্যমান আছেন? কিন্তু কোথায় মারা গেছেন? কিভাবে মারা গেছেন? কবর কোথায়? তা ধর্মগ্রন্থ কুরআনে বিদ্যমান নেই।
অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থ আর মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ খুললেই যেকোন আকলমন্দ মানুষের বিবেক বলে দিবে, কোনটি অবিকৃত ঐশীগ্রন্থের মর্যাদা রাখে, আর কোনটি রাখে না।
ইসলামই ধর্ম সত্য হবার প্রমাণ-৭
ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কুরআন। যা একমাত্র ঐশীগ্রন্থ যাতে কোন অবৈজ্ঞানিক কথা নেই। যাতে এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যা হাজার বছর পূর্বে কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু কুরআন নাজিলের অনেক পর বৈজ্ঞানিকরা তা আবিস্কার করেছেন।
যা কুরআনকে সর্ববিষয়ে অবগত স্রষ্টার নাজিলকৃত বাণী হবার পরিস্কার স্বীকৃতি প্রদান করে। যেমন
বিগব্যাং
সমগ্র বিশ্ব ছিল একটি বস্তুপূঞ্জ। পাইমারী নেবুলা। তারপর বিগ ব্যাং অর্থাৎ একটা বড় বিস্ফোরণ হল, দ্বিতীয় বার সেফারেট হল, যাতে গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রপূঞ্জের সৃষ্টি হল।
এই বিগ ব্যাং থিউরী আবিস্কারের ফলে ১৯৭৩ ঈসাব্দে দু’জন বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।
অথচ সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কুরআনে এ বিগ ব্যাংগের কথা উদ্ধৃত হয়েছে-
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ [٢١:٣٠
কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এস সঙ্গে যুক্ত ছিল,অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম [সূরা আম্বিয়া, ২১: ৩০]
মাত্র ৫০ বা একশত বছর আগে যে থিউরী মাত্র আবিস্কৃত হল, সেই থিউরী হাজার বছর পূর্বে কোন গ্রন্থে থাকা প্রমাণ করে, উক্ত বিষয়টি স্রষ্টার কিতাব ছাড়া মানব রচিত কিতাব হতেই পারে না।
চাঁদের নিজের কোন আলো নেই!
চাদের নিজেস্ব আলো আছে কি না? তা বিজ্ঞান আবিস্কার করেছে এইতো সেদিন। কিন্তু পবিত্র কুরআন তা সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই জানিয়ে দিয়েছে, চাদের নিজের আলো নেই। বরং তা অন্যের থেকে ধার করা প্রতিফলিত আলো।
تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَقَمَرًا مُّنِيرًا [٢٥:٦١
কল্যাণময় তিনি,যিনি সৃষ্টি করেছেন নক্ষত্রপুঞ্জ এবং সেখানে একটি প্রদীপ স্থাপন করেছেন, এবং একটি চাঁদ যার প্রতিফলিত আলো আছে। [সূরা ফুরকান, ২৫: ৬১]
চাঁদ ও সূর্য স্থীর নয়!
বিজ্ঞানের আবিস্কার হল, চাঁদ ও সূর্য একেকটি গ্রহ। যা স্থীর নয়। অথচ একই কথা হাজার বছর পূর্বে পবিত্র কুরআনে বিধৃত হয়েছে। এটি স্রষ্টার বাণী না হলে, বিজ্ঞানীদের আবিস্কারের আগেই তা কিভাবে বলে দিল?
দেখুনঃ
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ [٢١:٣٣
তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন, আপন কক্ষপথে বিচরণ করে। [সূরা আম্বিয়া-২১: ৩৩]
প্রতিটি জীবন্ত প্রাণী পানি থেকে সৃষ্ট!
আজ তা বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু একথা সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান।
وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ [٢١:٣٠
এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? [সূরা আম্বিয়া-২১: ৩০]
বিজ্ঞানের বিভিন্ন থিউরী উল্টে গেছে, কিন্তু পবিত্র কুরআনে বর্ণিত কোন থিউরীই উল্টানো যায়নি। যা প্রমাণ করে পবিত্র কুরআন, কোন মানবরচিত গ্রন্থ নয়। বরং স্রষ্টার নাজিলকৃত কিতাব।
এরকম আরো অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। যা যেকোন বিবেকবান ব্যক্তিকে ইসলাম ধর্মই একমাত্র অবিকৃত ও ঐশী ধর্ম বলে প্রমাণ করবে।
তারপরও যদি কারো ইসলাম ধর্মকে সত্য ধর্ম হিসেবে মানতে সমস্যা হয়, তাহলে তাকে কপালপোড়া এবং হতভাগা ছাড়া আর কী’বা বলতে পারি?
আল্লাহ তাআলা আপনাকে হক দ্বীন গ্রহণও সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন।
বদ্বীনী জীবন, ফাসিক বন্ধু আপনার ঈমানের জন্য বিপদজনক। তাই ফাসিক বন্ধুর সংশ্রব এবং গোনাহের কাজ ছেড়ে দিন। দ্বীনী কাজের সাথে সম্পৃক্ত হোন।
সুযোগ হলে, তাবলীগের তিন চিল্লা দিয়ে আসুন। হ্ক্কানী পীর মাশায়েখ বা বিজ্ঞ আলেম উলামাদের সাথে সম্পর্ক রাখুন।
ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমানকে হিফাযত করবেন। আর সর্বদা দুআ করুন-
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ [٣:٨
হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করোনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদিগকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা। [সূরা আলেইমরান-৩: ৮]
---------------------------------------------------
রাসূল﴾ﷺ﴿ এর বহুবিবাহ সম্পর্কে নাস্তিকদের অপবাদের জবাব!
প্রশ্ন
সুরা নিসা ২৪-২৫ এবং আহযাব ৩৭, ৫০-৫২ আয়াতগুলোতে রাসুল সঃ এর বৈবাহিক জীবনের আলোচনা রয়েছে।একজন বিধর্মী উক্ত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করে বলেছে রাসুল সঃ নারীলোলুপ (নাউযুবিল্লাহ)। হযরত আমি আপনাদের কাছে উক্ত আয়াতগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা এবং উপযুক্ত জবাব আশা করি।দয়া করে সুন্দর ভাবে বোধগম্যভাবে জবাব দিবেন।
উত্তর
আমরা উক্ত আয়াতগুলো দেখে নেই।
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ۚ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِن بَعْدِ الْفَرِيضَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا [٤:٢٤]
এবং নারীদের মধ্যে তাদের ছাড়া সকল সধবা স্ত্রীলোক তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ; তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায়-এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর হুকুম। এদেরকে ছাড়া তোমাদের জন্যে সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য-ব্যভিচারের জন্য নয়। অনন্তর তাদের মধ্যে যাকে তোমরা ভোগ করবে,তাকে তার নির্ধারিত হক দান কর। তোমাদের কোন গোনাহ হবে না যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিজ্ঞ, রহস্যবিদ। {সূরা নিসা-২৪]
এ আয়াতে যে বিধান বর্ণিত হয়েছে। তা শুধু রাসূল সাঃ এর জন্য খাস নয়। এটি সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
এখানে কাকে, কাকে বিবাহ করতে পারবে? তা বর্ণনা করা হয়েছে।
যিনা ব্যাভিচারের দরজা বন্ধ করার জন্য উক্ত আয়াতে কারিমায় মহর দিয়ে বিবাহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে পরিস্কার বলা হয়েছে যে, বিবাহ করবে। যিনা বা ব্যাভিচার করার জন্য অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সহবাস করবে না।
وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ۚ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُم ۚ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ ۚ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ ۚ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ۚ ذَٰلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنكُمْ ۚ وَأَن تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٤:٢٥]
আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে-ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতঃপর যখন তারা বিবাহ বন্ধনে এসে যায়, তখন যদি কোন অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্যে, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে। আর যদি সবর কর, তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। [সূরা নিসা-২৫]
এ দু’টি আয়াতে কারিমায় যে বিধান বর্ণিত হয়েছে। তা শুধু রাসূল সাঃ এর জন্য খাস নয়। এটি সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
এখানে কাকে, কাকে বিবাহ করতে পারবে? তা বর্ণনা করা হয়েছে।
যিনা ব্যাভিচারের দরজা বন্ধ করার জন্য উক্ত আয়াতে কারিমায় মহর দিয়ে বিবাহ করার
---------------------------------------------------
বয়স্ক ব্যক্তিকে দুধপান করানো সম্পর্কিত একটি হাদীসের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: جَاءَتْ سَهْلَةُ بِنْتُ سُهَيْلٍ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي أَرَى فِي وَجْهِ أَبِي حُذَيْفَةَ مِنْ دُخُولِ سَالِمٍ وَهُوَ حَلِيفُهُ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَرْضِعِيهِ»، قَالَتْ: وَكَيْفَ أُرْضِعُهُ؟ وَهُوَ رَجُلٌ كَبِيرٌ، فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: «قَدْ عَلِمْتُ أَنَّهُ رَجُلٌ كَبِيرٌ»، زَادَ عَمْرٌو فِي حَدِيثِهِ: وَكَانَ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا، وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ أَبِي عُمَرَ: فَضَحِكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুহাইলের কন্যা সাহলা নবীজী সাঃ এর নিকট হাজির হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সাথে সালিমের দেখা সাক্ষাৎ করার কারণে আমি আবূ হুযায়ফার মুখমন্ডলে অসন্তুষ্টির আলামত দেখতে পাচ্ছি, অথচ সালিম হল তার হালীফ তথা পোষ্য পুত্র। নাবীজী সাঃ বললেন, তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও। তিনি বলেন, আমি কেমন করে তাকে দুধপান করাব? অথচ সে একজন বয়স্ক পুরুষ। এতে রাসূল সাঃ মুচকি হাসলেন এবং বললেন, আমি জানি সে একজন বয়স্ক পুরুষ।
আমর তার হাদীসে অতিরিক্ত বলেছেন, সালিম বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। আর ইবনে উমর রাঃ এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাঃ তখন হেসে দিলেন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৫৩, ইফা-৩৪৬৯]
এ হাদীসের ব্যাখ্যা কী?
উত্তর
দুগ্ধপান পদ্ধতি কেমন ছিল? তা তাবকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত রেওয়ায়েতের দ্বারা পরিস্কার।
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُمَرَ. حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ابْنِ أَخِي الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ:
كَانَ يَحْلُبُ فِي مِسْعَطٍ أَوْ إِنَاءٍ قَدْرَ رَضْعَةٍ فَيَشْرَبُهُ سَالِمٌ كُلَّ يَوْمٍ. خَمْسَةَ أَيَّامٍ. وَكَانَ بَعْدُ يَدْخُلُ عَلَيْهَا وَهِيَ حَاسِرٌ. رُخْصَةً مِنْ رَسُولِ اللَّهِ لِسَهْلَةَ بنت سهيل
সাহলা এক পাত্রে দুগ্ধ দোহন করে রাখলেন। সেখান থেকে সালেম পাঁচদিন এসে দুধ পান করে যায়। এরপর সালেম সাহলা এর সামনে পর্দা ছাড়াই সরাসরি প্রবেশ করতো। সাহলার বিন সুহাইয়েলের সহজতার জন্য রাসূল সাঃ এ সুযোগ প্রদান করেন। [আততাবক্কাতুল কুবরা-৮/২১২, দারুল কুতুব বৈরুত, রাবী নং-৪২১৯]
রাসূল সাঃ হেসে দিলেন কেন?
কারণ, রাসূল সাঃ বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাসূল সাঃ এর দুধ পান করানোর কথা শুনে সাহলা ভেবেছিল যে, রাসূল সাঃ বুঝি সালেমকে সরাসরি স্বীয় স্তন থেকে দুধ পান করাতে বলছিলেন। সাহলা এর এমন হাস্যকর সমঝ দেখে রাসূল সাঃ হেসে দিলেন।
কারণ রাসূল সাঃ এর উদ্দেশ্য সরসরি দুধ পান করানো ছিল না, বরং কোন মাধ্যমে দুধ পান করানো ছিল। একথাটি সাহলা বুঝতে না পারার করণে রাসূল সাঃ হেসে দিলেন। [তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম-১/৭১]
বয়স্ক ব্যক্তি হবার পরও সাহলা রাঃ এর জন্য এ বিশেষ পদ্ধতিতে দুধ পান করানোর বিধানটি উক্ত সাহাবীর সাথেই খাস ছিল। আর কারো ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য করা হয়নি। তাই উক্ত হাদীসকে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করে বয়স্ক ব্যক্তিকে দুধ পান করালে দুগ্ধপান সম্পর্কিত হুরমতের হুকুম আরোপিত হবে না।
এ বিধান ছিল ইসলামের শুরু যুগের। পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র দুই বা আড়াই বছরের মাঝে দুধ পান করলেই হুরমতে রিজাআত এর বিধান আরোপিত হবে। এর চেয়ে বেশি বয়স্ক ব্যক্তি তা পান করলে এ হুকুম আরোপিত হবে না।[বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন-তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম, আল্লামা তাকী উসমানী দা.বা.-১/৭১-৭৩, ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ, দারুল গাদ আলজাদীদ, কাহেরা-৯/২২০-২২১]
---------------------------------------------------
মুদ্রাস্ফিতির মারপ্যাঁচে ব্যাংক ৠণ সুদমুক্ত বলার জবাব
প্রশ্ন
“সুদ্ব”.. ক) আমাদের কুরান শরিফ এর সুরা- আল বাকারহ, ২-২৭৫, অনুসারে সুদ্ব খাওয়া হারাম।
খ) আমার কথা হলো আমারা যখন টাকা জমা রাখি ব্যাংকে তখন অনেক লম্বা সময়ই এর
জন্য রাখি, ১/২ বছর এর উপরে। Time Value of Money (TVM) নিয়ম অনুসার এ
আজকের ১ টাকার মান পরের বছর এর ১ টাকার সমান নই। আজকে যদি আমি ব্যাংক এ
১০,০০০ টাকা রাখি এবং ৮% হারে সুদ্ব নেই তাহলে বছর শেষ এ আমার মোট টাকার
পরিমাণ হবে ১০,৮০০ টাকা। যেখানে আমাদের দেশ এর আসল মুদ্রাস্ফীতি হার হল
৯.১৪%, সরকারি হিসেবে ৭.৩৫%। তার মানে আমি যদি মুদ্রাস্ফীতির হার ৯.১৪%
করে ধরি তাহলে ১ বছর শেষ এ আমার ১০,০০০ টাকার মূল্য হবে ৯,০৮৬ টাকা এবং
যদি ৮% করে সুদ্ব নেই ব্যাংক থেকে তাহলে তার আসল মূল্য ১ বছর পরে হবে
৯,৮৬০** টাকা। আমি ১০,০০০ টাকার পরিবর্তে পাইতেসি ৯,৮৮৬ টাকা।
**১০,০০০x(৯.১৪-৮)%= ১৪০
১০,০০০-১৪০= ৯,৮৬০.
*তাহলে আমাকে বলেন ব্যাংক থেকে সুদ্ব খাওয়া হারাম কেমন করে হই? (বেশ
কিছুদিন আগে আমাকে একজন এই প্রশ্ন করেছিলো)
উত্তর
মুদ্রাস্ফিতির এ উদ্ভট ছক একে তিনি বলতে চাচ্ছেন যে, ব্যাংকে টাকা রাখার পর প্রতি মাসে যে অতিরিক্ত টাকা প্রদান করা হয়, সেটি সুদ থাকে না?
আজীব কথা, আপনার ঐ লোকটি যে হিসেব দিয়েছে, সে হিসেব মতেও তা সুদ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, দেখুন মুদ্রাস্ফিতি ধরে বছর শেষে দশ হাজার টাকার মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৯,০৮৬,। তাই যুক্তির বিচারে উক্ত ৯,০৮৬ টাকাই মূলত গ্রাহক ব্যক্তি ব্যাংকে রেখেছে। যদিও সংখ্যায় দশ হাজার ছিল বছরের শুরুতে।
কিন্তু এখন তা আর দশ হাজারের মূল্যে নেই। হয়ে গেছে ৯,০৮৬, তাই এ হিসেবে গ্রাহক ব্যক্তির প্রাপ্য এ মূল্যমানের টাকা। কিন্তু সে পাচ্ছে ৯,৮৬০। অর্থাৎ ৭৭৪ টাকা বেশি।
এ অতিরিক্ত ৭৭৪ টাকা কি? সুদ নয়?
---------------------------------------------------
কালিমা তৈয়্যবা নিয়ে সংশয় কেন? একটি দালিলিক আলোচনা
আলোচনা
কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ নিয়ে সংশয় কেন? একটি দালিলীক আলোচনা
আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই নাম একত্মবাদ। ঈমানের মূল বাক্য এটিই। একত্মবাদ ব্যতীত বিফল যাবে সব মেহনত, উপায় উপকরণ। অফুরন্ত আমল নিয়ে আগুনে জ্বলতে হবে অনন্ত কাল। নিস্ফল হবে যাবতীয় আমল। পক্ষান্তরে শুধু একত্মবাদের স্বীকৃতি দিয়ে বেহেশতের সুসংবাদে ধন্য হয়েছেন কত ভাগ্যবান। আমলে যত ত্রুটিই হোক না কেন, একত্মবাদের স্বীকৃতির ফলে একদিন নাজাতের সুংসংবাদ তো আছেই। এই একত্মবাদের বাণী আমাদেরকে পৌঁছে দেন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তিনিই এ বিশ্বে একত্মবাদের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন। ভেঙে দেন শত সহ¯্র কল্পিত প্রভুর আস্তানা। লাত, উজ্জার পূজারীরা সেদিন বাতিলের তিমিরাধাঁর থেকে বেরিয়ে বলেছিল “নেই নেই তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ।” তাই আমাদেরকে আল্লাহর একত্মবাদের সাথে মহানবী (সা.)-কে স্বীকৃতি দিতে হবে প্রাণচিত্তে। আর এ দু’টি বিষয় এক সাথে গাঁথা আছে আমাদের প্রাণপ্রিয় কালিমাÑ
لا اله إلا الله محمد رسول الله
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”তে। নেই কোনো মাবূদ আল্লাহ ছাড়া, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।
এতে স্বীকৃতি হয়েছে, আল্লাহর একত্মবাদের। সাথে, সাথে মহানবী (সা.)-এর রাসূল হওয়ার স্পষ্ট ঘোষণা। এরই নাম ইসলাম। অন্যান্য যাবতীয় আমল এর উপরেই ভিত্তি ও নির্ভরশীল। এই ভিত্তি সঠিক হলেই সামনে অগ্রসর হওয়ার পালা। তাই ছোট শিশুদেরকে আমরা এই কালিমা শেখাই। সারা জীবন এরই জিকির করি। মরণকালে এই কালিমার তালক্বীন করি। মরতে চাই এই কালিমা জপতে জপতে। জীবনে মোদের এই কালিমা, মরণে থাকবে এই কালিমা, হাশরে মীযানেও চাই এই কালিমা। তাই এ কালিমার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম অতুলনীয়। আরব আজম বিশ্বজুড়ে সব মুসলমানের অন্তরে মুখে মুখে এই কালিমা। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে ব্যক্ত করতে হয়, সাম্প্রতিককালে কিছু লোক মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য মাঠে নেমেছে। মুসলিম জাতির শোচনীয় ক্রান্তিলগ্নে বিজাতীয় ফিরিঙ্গি হানাদারদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু সাঁজোয়া মুসলমান। তারা বিভিন্ন এনজিও সংস্থার ছত্রচ্ছায়ায় অর্থবলে, সেবার নামে অবান্তর চ্যালেঞ্জসমৃদ্ধ বিজ্ঞাপন বই পুস্তক বিতরণ করে সরলমনা মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করছে। এ পর্যায়ে ইসলামের মূল ভিত্তি কালিমায়ে তায়্যিবা থেকে দূরে সরিয়ে বিপদগামী করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে তারা। এ কালিমাটি হাদীসে নেই, একত্মবাদের এই কালিমা পড়লে মুশরিক হবে, কাফের হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি বই পুস্তক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জনমনে ধূ¤্রজাল সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তাই অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণ এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার আগ্রহ আমাদের কাছে ব্যক্ত করে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মুসলমান কালিমায়ে তায়্যিবা বিষয়ে কতিপয় চক্রান্তকারীদের ষড়যন্ত্রে বিব্রত হচ্ছে স্থানে, স্থানে নূরানী শিক্ষায় নিয়োজিত মুআল্লিমগণ। সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি বই আমার হস্তগত হয়েছে, যাতে কালিমায়ে তায়্যিবা সম্পর্কে জনগণকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভুল ধারণা দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি বইয়ের নাম “ইসলামের মূলমন্ত্র কালিমাহ তায়্যিবাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” লেখক আব্দুল্লাহ আল ফারুক বিন আব্দুর রহমান, ৩/১-বংশাল লেন, ঢাকা। প্রকাশক : নওফেল বিন হাবীব, পাঁচবাড়িয়া, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ। মুদ্রণ ও বাঁধাই : আল মদীনা প্রিন্টার্স, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা। ২৩০ পৃষ্ঠার এ বইটিতে লেখক প্রতি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়, লাইনে লাইনে এই কালিমা কোনো হাদীসে নেই, এই কালিমা পড়া শিরক, যারা পড়বে ওরা মুশরিক ইত্যাদি ইত্যাদি ভ্রান্ত মতবাদে ভরপুর করেছে। এমতাবস্থায় এই কালিমা সম্পর্কে হাদীসের অবস্থান, আরবী ভাষাগত বিশ্লেষণ ও আরব আজম তথা মুসলিম বিশ্বের অবস্থান আংশিক উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।
হাদীসে কালিমায়ে তায়্যিবা :
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এই কালিমাটি প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি নির্ভরযোগ্য হাদীসে আমার হস্তগত হয়েছে। এর মধ্যে আধা ডজন হাদীসকে হাদীস বিশারদ বিজ্ঞ ইমামগণ সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া এক ডজনের মতো আছে হাসান বা উত্তম ও নির্ভরযোগ্য হাদীস। আরম অনেকগুলো রয়েছে জয়ীফ হওয়া সত্ত্বেও আমল করার যোগ্য। সব মিলে এর মগ্রহণযোগ্যতা আরো অনেক অনেক গুণে মবৃদ্ধি পায়। বেড়ে যায় দলিল হিসেবে এর স্বচ্ছতা। নি¤েœ কয়েকটি হাদীস শুধু উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করার প্রয়াস পাব।
এক
হাদীস নম্বর এক
عن انس بن مالك قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: دَخَلْتُ الجَنَّةَ فَرَأيْتُ فِي عارِضَتِي الجَنَّةِ مَكْتُوباً ثلاثة أسطر بالذهب: السطر الأول لا إله إِلَّا الله محمَّدٌ رَسوُلُ الله والسَّطرُ الثَّانِي ما قدمنا وَجَدْنا وَمَا أكَلْنا رَبِحْنا وَمَا خَلَّفْنا خَسِرْنا والسَّطْرُ الثَّالِثُ أُمَّةٌ مُذْنِبَةٌ وَرَبٌّ غَفُورٌ
“হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] ইরশাদ করেন, মেরাজকালে আমি বেহেশতে প্রবেশের সময় এর দু’পাশে দেখি তিনটি লাইনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা :
এক. লা ইলাহা ইল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
দুই. আমরা যে ভালো কর্ম পেশ করেছি, তা পেয়েছি। যা খেয়েছি তা থেকে উপকৃত হয়েছি। যা ছেড়ে এসেছি, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
তিন. উম্মত হলো গোনাহগার, আর রব হলো ক্ষমাশীল।
(জামেউস সগীর সুয়ূতী ১/৮৭১ হাদীস নং ৪১৮৬, ইমাম সুয়ূতী লেখেন, হাদীসটি সহীহ)
দুই
হাদীস নম্বর দুই
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত লম্বা একটি হাদীসে রাসূল (সা.) তদানীন্তন কাফের ও সত্যিকারের মুসলমানদের অবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে নি¤œবর্ণিত আয়াতের আলোকে বলেন-
إِذْ جَعَلَ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَى وَكَانُوا أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَا وهى لا اله إلا الله محمد رسول الله”
কাফেররা মুসলমানদের সাথে সেই অজ্ঞ যুগের বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা’আ লা (মুসলমানদের একত্মবাদের ফলে) রাসূল (সা.) ও মুমিনদের ওপর স্বীয় প্রশান্তি অবতরণ করেন। আর তাদের জন্য তাকওয়ার কালিমা আবশ্যক করে দেন। যার সত্যিকার ধারক তারাই। এই তাকওয়ার কালিমাটি হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। (বায়হাকী পৃ. ১৩১ কিতাবুল আসমা ওয়াসসিফাত)
এই হাদীসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য, হাদীসটি সহীহ।
উল্লেখ্য, এই হাদীসটি মূলত কুরআনে কারীমের সূরায়ে ফাতহ-এর ২৬ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত كلمة التقوى (কালিমায়ে তাক্বওয়া)-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বর্ণিত অসংখ্য হাদীসের একটি মাত্র। এ ছাড়া তাফসীরের প্রায় সব কিতাবে কালিমায়ে তাক্বওয়ার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন, তা হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। প্রায় ৫০টিরও বেশি তাফসীর গ্রন্থ আমরা যাচাই করেছি। বিশেষ কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/১৬৫, রূহুল মা’আনী ১৩/২৯২, কুরতুবী ১৬/১৯০, তাবারী ১১/৩৬৫, বাগাবী ৫/১১৬)
তিন
হাদীস নম্বর তিন
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, কুরআনে কারীমের সূরায়ে কাহাফের ৮২ নম্বর আয়াত- “এর নিচে ছিল তাদের গুপ্ত ধন” গুপ্ত ধন বলতে একটি স্বর্ণের বোর্ড, এতে কয়েকটি বিষয় লেখা ছিল। সবশেষে লেখা ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। (তাবরানী কিতাবুদ দু’আ হাদীস নং ১৬২৯, বায়হাকী যুহদ, হাদীস নং ৫৪৪, সুয়ূতী আদদুররুল মনসূর ৯/৬০০)
এই হাদীসের সব বর্ণনাকারী পরিপূর্ণ নির্ভরযোগ্য বা ثقة শুধু বুশাইর নামক একজন যাকে صدوق বা গ্রহণযোগ্য
বলা হয়েছে। তাই হাদীসটি হাসান বা অন্যান্য হাদীসের সমন্বয়ে সহীহ।
চার
হাদীস নম্বর চার
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: «كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ» ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঝা-াটি ছিল কালো এবং পতাকাটি ছিল সাদা রঙের। এই পতাকায় লেখা ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। (আল মু’জামুল আওসাত তাবরানী ১/১২৫ হাদীস নং ২২১, শামায়েলে ইমাম বাগাবী হাদীস নং ৮৯৪) এই হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য। একজন বর্ণনাকারী “হাইয়্যান” কেউ কেউ অপরিচিত বলে আপত্তি করার সুযোগ খুঁজেছেন। কিন্তু এতে এমন কোনো সুযোগ নেই। তার সম্পর্কে হাদীস বিশারদ ইমাম আবু হাতেম (রহ.) বলেন صدوق নির্ভরযোগ্য। এ ছাড়া ইমাম বাযযার (রহ.) তাকে সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস বলে অবি হত ক রে ন। ( অ াল জা রহ ওয়াত্তা’দিল ৩/২৪৬)
পাঁচ
হাদীস নম্বর পাঁচ
عن يوسف بن صهيب، عن عبد اللَّه بن بريدة، عن أبيه، قال: انطلق أبو ذر ونعيم ابن عم أبي ذر، وأنا معهم يطلب رسول اللَّه صلّى اللَّه عليه وآله وسلّم وهو مستتر بالجبل، فقال له أبو ذر: يا محمد، أتيناك لنسمع ما تقول، قال: أقول لا إله إلا اللَّه محمد رسول اللَّه، فآمن به أبو ذر وصاحبه.
বুরাইদা (রা.) বলেন, আবুজর ও নুআইম তারা দুজন রাসূল (সা.)-এর খুঁজে বের হন। আমি তাঁদের সাথে ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন এক পাহাড়ের আড়ালে ছিলেন। তখন আবুজর তাঁকে বলেন, হে মুহাম্মদ আপনি কি বলেন আমরা শুনতে এসেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি বলি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। (আল ইসাবা ইবনে হাজর ৬/৩৬৫, হাদীস নং
৮৮০৯, যিয়াদাতুল মাগাযী ইউনুস ইবনে বুকাইর)
এই হাদীসের সনদ সহীহ, সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।
সংশয়ের অবতারণা :
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) এই কালিমা আরব আজম বিশ্বজুড়ে যুগ, যুগ ধরে চলে আসছে। এতে কারো কোনো সংশয় বা মতভেদ নেই। সাম্প্রতিক কালে গুটি কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গ জনমনে নানান সন্দেহের বীজ বপন করে যাচ্ছে। এদের অন্যতম দুটি সংশয় নি¤œরূপ :
সংশয় এক.
বর্তমানে কতিপয় ব্যক্তিবর্গ বলে বেড়াচ্ছে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” কলিমাটি এভাবে কোনো
হাদীসে নেই। এসব মিথ্যা কাহিনী। (ইসলামের মূলমন্ত্র কলিমায়ে তায়্যিবাআব্দুল্লাহ ফারুক ৪৩, ৪৭) সম্মানিত পাঠকগণ! আশা করি উপরোল্লিখিত হাদীসগুলোর আলোকে আপনারা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছেন যে, তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সংশয় দুই.
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এই কলিমাটিতে দুটি বাক্য আছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- একটি বাক্য। আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ দ্বিতীয় বাক্য। সব ভাষাতেই দুটি বাক্যের মাঝে পৃথক করার কোনো না কোনো বিভাজন শব্দ ব্যবহার করতে হয়। আরবীতে حرف عطف বা বিভাজন শব্দের ব্যবহার আছে। তাই এই দুটি বাক্যের মধ্যে বিভাজন শব্দ
থাকার প্রয়োজন ছিল। অন্যথায় দুটি বাক্য এক হয়ে এতে শিরকের অর্থ সৃষ্টি হবে। বিষয়টি বোঝার জন্য মনে করেন মুহসিন ও চোর বললে দুজনকে বোঝায়। আর ‘ও’ ব্যতীত মুহসিন চোর বললে একই ব্যক্তি বা যে মুহসিন সেই চোর এবং যে চোর সেই মুহসিন বোঝাবে।
এভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’-এর মধ্যে কোনো বিভাজন শব্দ না থাকায় দুটি বাক্য একই অর্থে রূপান্তরিত হবে, যা শিরক ব্যতীত আর কিছুই না। তাই যারা এই কলিমা পড়বে ও এ অনুযায়ী আমল করবে তারাও মুশরিক। বরং তাদের ভাষ্যে যারা এই কালিমা পড়ে তারা আল্লাহ ও রাসূলকে দু’ভাইয়ে পরিণত করে থাকে। (নাউজু বিল্লাহ) (কালিমায়ে তাইয়্যিবা – আব্দুল্লাহ ফারুক ১০)
নিরসন :
প্রিয় পাঠক! আরবী ভাষা, বাংলা ভাষাসহ সব ভাষাতেই বিভাজন শব্দ আছে ঠিক। কিন্তু যেকোনো দুটি শব্দের মধ্যে অথবা যেকোনো দুটি বাক্যের মধ্যে বিভাজন শব্দ ব্যবহার করতেই হবে এমন দাবি সম্পূর্ণরূপে ভুল। এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং তা আরবী ভাষায় فصاحت ও بلاغت বা আরবী ভাষার সৌন্দর্য এবং মাধুর্যপূর্ণ ধারাবাহিকতা ও বর্ণনা বিন্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গ্রন্থসমূহে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করা হয়েছে। জানার বিষয়, পাঁচটি স্থান আছে, যেখানে বিভাজন শব্দ ব্যবহার না করাই সৌন্দর্য ও মাধুর্যতা। তার পরও দুটি শব্দ বা দুটি বাক্য ভিন্ন ভিন্ন অর্থে গণ্য হবে। এমন স্থানগুলোর অন্যতম হলো-
ان يكون بين الجملتين تباين تام…. بأن لا يكون بينهما مناسبة فى المعنى كقولك على كاتب الحمام طائر
দুটি শব্দ বা বাক্য যদি অর্থগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত বা ভিন্ন, ভিন্ন হয় তাহলে এর মধ্যে বিভাজন শব্দ ছাড়াই স্পষ্ট
বিভাজন বোঝা যায়। যেমন আলী লিখক পাখিটি উড়ন্ত। (দুরুসুল বালাগা ১৪৭, মুখতাসারুল মা’আনী ২/২৩৮) এইভাবে আগুন পানি, আকাশ-পাতাল, আসমান-জমীন, ইত্যাদি বহুল প্রচলিত বিপরীতমুখী শব্দ বা বাক্যের মাঝে বিভাজন শব্দ না হওয়াই ভাষার
মাধুর্যতা। এগুলোতে বিভাজন শব্দ না থাকা সত্ত্বেও দুটিকে কেউ এক গণ্য করবে না। তেমনিভাবে আল্লাহ রাসূল দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ হলেন ¯্রষ্টা রাসূল হলেন সৃষ্টি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এই বাক্যে আল্লাহর একত্মবাদের আলোচনা আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এই বাক্যে রাসূল (সা.)-এর রিসালাত বা রাসূল হওয়ার আলোচনা হয়েছে। তাই ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে যেমন ব্যবধান ও বৈপরীত্ব, ঠিক তেমনি বাক্য দুটিতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এ জন্য দুটি বাক্যের মধ্যে কোনো বিভাজন শব্দ
حرف عطف না থাকা সত্ত্বেও পরিপূর্ণ বিভাজন বোঝা যাচ্ছে। তাই এই দুই বাক্যের মধ্যে বিভাজনমূলক শব্দ ব্যবহার না করাই ভাষার সৌন্দর্য ও মাধুর্যতা বৃদ্ধি করে।
ইজমা :
মুসলিম বিশ্বে আরব ও আজমে এই কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। যুগ, যুগ ধরে চলে আসছে। এতে কারো কোনো মতভেদ নেই। দ্বিধা নেই। নেই কোনো ভুল বুঝাবুঝি ও সংশয়ের লেশমাত্র। আজ থেকে প্রায় একশত বছর পূর্বে বাদশা সাউদ সৌদি আরবে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সে দিন তাঁর ধর্মবিষয়ক প্রাইম উপদেষ্টা ছিলেন কট্টর সালাফী ও আহলে হাদীসপন্থী নেতা বর্তমান সালাফীদের ইমাম আব্দুল ওয়াহাব নজদী। সেসময়েও আরবের জাতীয় পতাকায় খচিত ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। আজো তা বহাল আছে। আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গবেষক আহলে হাদীস মতবাদের মান্যবর ইমাম, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেন
دين الاسلام مبنى على اصلين، من خرج عن واحد منها فلا عمل له ولا دين: ان نعبد الله وحده ولا نشرك به شيئا وعلى ان نعبد بما شرع، لا بالحوادث والبدع هو حقيقة قول: “لا اله إلا الله محمد رسول الله:
ইসলামের মূল ভিত্তি দু’টি। যে এর কোনো একটি পরিত্যাগ করবে তার যাবতীয় আমল বৃথা। তার কোনো দ্বীন ধর্ম নেই। আল্লাহর কোনো শরীক না করে তাঁর ইবাদত করা এবং বিদআত ও কুসংষ্কার পরিহার করে রাসূল (সা.) আনীত দ্বীন গ্রহণ করা। যা এক বাক্যে : “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। (আর রাদ্দু আলাল বিকরি-৫৩, তরজামানুস সুন্নাহ ২/৪৫)
এ পরিসরে আব্দুল ওয়াহাব নজদীর একটি বাক্য নিম্নে উল্লেখ করছি। তিনি লিখেন-
قاتل ابو بكر مانعى الزكاة وهم يقولون : لا اله إلا الله محمد رسول الله
যাকাত আদায় না করার ফলে তাদের সাথে আবু বকর যুদ্ধ করেন, অথচ তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” পড়ত। এখানে আব্দুল ওয়াহাব নাজদী একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তবে এতে তিনি কালিমাটি পরিপূর্ণ লিখেছেন। তার কোনো আপত্তি থাকলে তিনি তা উল্লেখ করতেন। তাই যারা ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও আব্দুল ওয়াহাব নজদীর অনুসারী বলে দাবি করে তাদের আরো ভেবে দেখা প্রয়োজন। (মাজমূআতুত তাওহীদ-৪)
আফগানিস্তানের পতাকায় এই কালিমা অঙ্কিত দেখেছি। দেখেছি কা’বা ঘরের গিলাফেও অঙ্কিত আছে এই কালিমা।
মোট কথা, আরব আজম ও সমগ্র বিশ্বে কোনো ধরনের মতানৈক্য ছাড়াই এ কালিমা চলে আসছে। তাই বলা যায় এই কালিমা বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সমগ্র উম্মতের ঐক্যমত বা ইজমা চলে আসছে। আর ইজমা হলো শরীয়তে ইসলামিয়ার একটি প্রমাণ্য দলিল।
মোট কথা, কালিমায়ে তায়্যিবার ইঙ্গিত কুরআনে কারীমে উল্লেখ আছে। তাফসীর গ্রন্থসমূহে এর উদ্ধৃতি আছে।
সহীহ হাদীসে এর সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। আছে আরবী ভাষার রূপমাধুর্যে এর শ্রেষ্ঠতম সাবলীলতা। আরো আছে, আরব আজম মুসলিম বিশ্বের অনড় ঐক্যমত ও ইজমায়ে উম্মত। এহেন পরিস্থিতিতে চিহ্নিত একটি চক্র মুসলমানদেরকে বিভ্র াš Í করার অপপ্রয়াসে কেন লিপ্ত হয়েছে? কী এর রহস্য? এসব ভেবে দেখার সময় এসেছে। এসেছে এদের সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সঠিক সময়।
---------------------------------------------------
মুযিজা দেখানোর জন্য নবী নেই তাই এখন ইসলাম সত্য ধর্ম বুঝবো কিভাবে?
প্রশ্ন
আসসালামুআলাইকুম। আমার নাম মোঃ আলশাহারিয়ার। আমার পরিচিত খুব কাছের একজন বন্ধু আমাকে প্রায়ই কিছু প্রশ্ন করে, যেই প্রশ্নগুলো আমাকে সবসময় পেরেশানিতে ডুবিয়ে রাখে। এমনকি আমার ঈমান ও আমলের ব্যাঘাত ঘটায়। প্রশ্নগুলো হলঃ (প্রশ্নগুলো আমার নিজের ভাষায় ব্যক্ত করলাম)
নবী (সঃ) যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন মানুষ তাঁর কাছে নানা কেরামত ও অলৌকিক ঘটনা দেখতে চাইত, এইটা প্রমাণ করার জন্য যে, তিনি আসলেই নবী কিনা এবং ইসলাম ধর্ম সত্যি কিনা। কিন্তু বর্তমানে তো নবী বেঁচে নেই। তাই আমাদের তো আর অলৌকিক কিছু দেখার সৌভাগ্য নেই। তাহলে এখন আমরা কিভাবে প্রমাণ করবো যে, নবী সত্যি কথাই বলেছিলেন। অর্থাৎ, তিনিই যে আল্লাহ্র নবী এবং আল্লাহ্ যে এই সৃষ্টি জগতের স্রস্টা এই কথা আমরা কিভাবে বিশ্বাস করবো?
উত্তর
অলৌকিক ঘটনা দেখেই ঈমান আনতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং বাস্তবতা হিসিবে ঈমান আনাই শরীয়তের মূল মাকসাদ।
হযরত আবু বকর রাঃ, হযরত উমর রাঃ, হযরত খাদিজা রাঃ, হযরত আলী রাঃ, কোন আশ্চর্য ঘটনা দেখে ঈমান আনেননি। রাসূল সাঃ এর কাছে আসা ওহীর বাস্তবতা বুঝে ঈমান এনেছেন।
তাই অলৌকিক ঘটনা দেখে ঈমান আনতে হবে আপনার এ ধারণাটি ঠিক নয়।
সাহাবায়ে কেরামের সামনে যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সেই কুরআন অবিকৃত অবস্থায় এখনো বাকি আছে। বাকি আছে নবীজী সাঃ এর ইশারায় দ্বিখন্ডিত হওয়া চাঁদ এখনো দ্বিখন্ডিত অবস্থায়।
এ দু’টি ছিল প্রকাশ্য মুজিযা। যা এখনো বিদ্যমান।
আর একজন স্রষ্টা ছাড়া কোন কিছু সৃষ্টি হতে পারে না এটি স্বাভাবিক আকলের বিষয়। পাগল ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারবে না যে, বিমান এমনিতেই চলছে, কিন্তু চালক কেউ নেই। গাছের একটি পাতা, বাতাসের ধাক্কা কিংবা কারো গাছ ঝাঁকানো ছাড়া নড়া অসম্ভব।
যদি সামান্য গাছের পাতা এমনিতে নড়তে না পারে, কেউ না নড়ালে, তাহলে এ বিশাল ভূবন এমনিতেই চলছে? কোন চালক নেই?
সারা বিশ্ব জাহান এমনিতেই চলছে কিন্তু একে পরিচালকারী কেউ নেই এমনটি ধারণা করা মুর্খতা বৈ কিছু নয়। তাই আল্লাহ তাআলার দেয়া বিবেক বুদ্ধিই মানুষকে স্রষ্টা চিনতে সহায়ক হবে।
যখন মানুষ তার স্বাভাবিক ব্রেইন দিয়ে চিন্তা করবে, তখনি সে একজন স্রষ্টর অস্তিত্ব অনুভব করে নিবে। সেই সাথে দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যাবে একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি সব কিছু সৃজন করেছেন। যিনি সব কিছুকে পরিচালনা করছেন।
তারপর প্রশ্ন হল, সেই স্রষ্টাটা কে?
তা যখন মানুষ যাচাই করবে, থুঁজবে স্রষ্টার বাণী সম্বলিত গ্রন্থ। তখন একজন সুস্থ্য বিবেক সম্পন্নের কাছে পবিত্র কুরআনই সর্বোৎকৃষ্ট মনে হবে। কারণ-
১- পবিত্র কুরআনই একমাত্র অবিকৃত ঐশী কিতাব। যা তার বর্ণনাভঙ্গি এবং গোটা বিশ্বে একই ধরণের কুরআন পাওয়া পরিস্কার প্রমাণ করে। পৃথিবীর সমস্ত স্থানে কুরআনের সব কপি একই। কোটি হাজারো হাফেজ একইভাবে কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্ত তিলাওয়াত করে। এর কোন নজীর আর কোন আসমানী গ্রন্থের নেই।
২ কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যা সবার জন্য নাজীল হয়েছে মর্মে ঘোষণা আছে। আর ইঞ্জিল তাওরাত ও জবুরের কোথাও একথা নেই।
৩ কুরআনই একমাত্র আসমানী গ্রন্থ, যা যে নবীর উপর নাজিল হয়েছে, সেই নবীর আদ্যোপান্ত জীবনী এবং উক্ত নবীর পরিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, ইবাদত পালন পদ্ধতি, মোটকথা সর্বাঙ্গীন জীবনের যাবতীয় বিষয়ের সমাধান সরাসরি নবী থেকে সংরক্ষিত অবস্থায় সূত্রসহ লিপিবদ্ধ আছে।
যা আর কোন নবী বা রাসূলের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। খৃষ্টানরাতো তাদের নবী নামাযে দাঁড়িয়ে কী পড়তেন, তাও জানে না। জানে না ইহুদীরাও। কিন্তু ইসলামের নবী পেশাব করতে কিভাবে প্রবেশ করতেন, কি দুআ করতেন তাও লিপিবদ্ধ আকারে সূত্রসহ রয়েছে।
৪ কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যা মানুষের জীবন চলার যাবতীয় বিধান এবং কুরআন যে নবীর উপর নাজিল হয়েছে, তার হাদীসের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে।
আর কোন নবীর উপর নাজিলকৃত ঐশী গ্রন্থে এর কোন নজীর নেই। দুই একটা বিধান ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না গোটা বাইবেল তন্ন তন্ন করে খুজলেও।
এরকম অসংখ্য বৈশিষ্ট্য পবিত্র কুরআনকে ঐশী গ্রন্থের স্বীকৃতি প্রদান করবে। যে কুরআন হল এক জীবন্ত মুযিজা। যাতে এমন সব বৈজ্ঞানিক কথা রয়েছে যা একজন স্রষ্টা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। যে কুরআন মানুষকে সঠিক স্রষ্টা মহান আল্লাহকে চিনতে সহায়ক হবে।
আর কুরআনকে চিনে গেলে মহানবীকে চিনা আরো সহজ হয়ে যাবে। অসংখ্য হাদীসের ভান্ডার। সূত্রসহ সূত্রের প্রতিটি ব্যক্তির জীবনীসহ যে মহান ব্যক্তিত্বের প্রতিটি কথা, কাজকর্ম মুহাদ্দিসরা রেকর্ড করে লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন, তা দেখে একজন স্বাভাবিক বুদ্ধি বিবেক সম্পন্ন মানুষ এখনো আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর পরিচয় খুঁজে পাচ্ছে। পাবেও কিয়ামত পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।
এভাবে একজন সুস্থ্য বিবেক সম্পন্ন মানুষ একটু চিন্তা করলেই আল্লাহ তাআলা এবং তার শেষ নবী মুহাম্মদ সাঃ কে চিনতে পারবেন।
সুতরাং মুজিজা দেখতে পাই না, এমন খোড়া যুক্তি দেখিয়ে ইসলাম থেকে বিমুখ থাকার কোন সুযোগ নেই।
মানুষ সর্বশ্রেষ্টই হয়েছে আকল তথা বুদ্ধি বিবেকের কারণে। সেই বিবেক বুদ্ধি না থাকলে পশু আর মানুষে কোন তফাৎ থাকে না। আর এ বুদ্ধি বিবেক দেয়াই হয়েছে আল্লাহকে চিনার জন্য। আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হবার শিক্ষা অর্জনের জন্য। তা’ই বাহ্যিক মুযিজা নয়, প্রকাশ্য নিদর্শনই হল আল্লাহ ও তার রাসূলকে চিনার মূল মাধ্যম। যা এখনো পুরো মাত্রাই বিদ্যমান। এসব দেখে ও ফিকির করে আমরা আল্লাহ ও তার রাসূল সাঃ কে চিনে নিতে পারি।
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنزَلَ هَٰؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّي لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُورًا [١٧:١٠٢]
তিনি বললেনঃ তুমি জান যে, আসমান ও যমীনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ নাযিল করেছেন। হে ফেরাউন, আমার ধারণায় তুমি ধ্বংস হতে চলেছো। [সূরা ইসরা-১০২]
رَّبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ ۚ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا [١٩:٦٥]
তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডলে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবার পালনকর্তা। সুতরাং তাঁরই বন্দেগী করুন এবং তাতে দৃঢ় থাকুন আপনি কি তাঁর সমনাম কাউকে জানেন? [সূরা মারইয়াম-৬৫]
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ ۚ وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ [٦:١٦٤]
আপনি বলুনঃ আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রতিপালক খোঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক? যে ব্যক্তি কোন গোনাহ করে, তা তারই দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অতঃপর তোমাদেরকে সবাইকে প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অনন্তর তিনি তোমাদেরকে বলে দিবেন, যেসব বিষয়ে তোমরা বিরোধ করতে। [সূরা আনআম-১৬৪]
قَالَ بَل رَّبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَىٰ ذَٰلِكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ [٢١:٥٦]
তিনি বললেনঃ না, তিনিই তোমাদের পালনকর্তা যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের পালনকর্তা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; এবং আমি এই বিষয়েরই সাক্ষ্যদাতা। [সূরা আম্বিয়া-৫৬]
رَبُّ الْمَشْرِقَيْنِ وَرَبُّ الْمَغْرِبَيْنِ [٥٥:١٧]
তিনি দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের মালিক।
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ [٥٥:١٨]
অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন, কোন অবদানকে অস্বীকার করবে? [সূরা আররহমান-১৭,১৮]
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ [٣٤:٢٨]
আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। [সূরা সাবা-২৭]
ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম হওয়া বিষয়ে এ বয়ান দু’টি শুনতে পারেন-
ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম
ইসলামই একমাত্র মুক্তির ধর্ম
---------------------------------------------------
সাবধান! উদারতার অর্থ আক্বিদার বিসর্জন নয়
ইসলামের সঠিক পরিচয়টুকুও যাদের নেই তাদেরকেও বলতে শোনা যায় ‘ইসলাম উদারতার ধর্ম’। আসলে এ বাক্যের ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক। কিন্তু বাক্যটির মর্ম বুঝে কিংবা সঠিক অর্থে বাক্যটির প্রয়োগকারী অনেক কম।
বাস্তবতা হল, উদারতা যদি থাকে তবে তা শুধু ইসলামেই আছে। কেননা ইসলামই হচ্ছে একমাত্র সঠিক ও আল্লাহর নিকট মনোনীত দ্বীন। এছাড়া অন্য সকল ধর্মই বাতিল ও আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত। সুতরাং অন্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝে কোনো উদারতা দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে তা উদারতা নয়। কেননা ভূ-পৃষ্ঠে নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো অধিকারই তাদের নেই। এরপরও তারা মুসলিম উম্মাহর অধিকার লুণ্ঠনকারী ও তাদের প্রভু রাববুল আলামীনের বিদ্রোহী হয়ে পৃথিবীতে শাসন করে চলেছে। এজন্য তারা উদারতার দাবিদার হওয়ার যোগ্য নয়।
ইসলামই একমাত্র সঠিক ধর্ম এবং নেককার মুসলিমই হল ভূ-পৃষ্ঠের উত্তরাধিকারী। সুতরাং তারা যদি ভূ-মন্ডল ও আকাশমন্ডলের সৃষ্টিকর্তা রাববুল আলামীনের বিদ্রোহীদের জন্য কিছু অধিকার স্বীকার করে নেয় তাহলে এটিই হবে উদারতা। আর নিঃসন্দেহে ইসলাম অমুসলিমদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহর আমীর, খলীফা ও প্রত্যেক ব্যক্তি সে অধিকারগুলো আদায় করে আসছে।
উদারতার অর্থ হচ্ছে, ইসলাম অমুসলিমদের জন্য যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছে, যে শ্রেণীর অমুসলিমের জন্য যেসব অধিকার স্থির করেছে সেগুলো যথাযথভাবে আদায় করা। অমুসলিম হওয়ার কারণে তাদের প্রতি জুলুম না করা ও তাদের কোনো অধিকার খর্ব না করা। তারা যেন পূর্ণ নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারে সে ব্যবস্থা করা। তাদের মধ্যে কেউ কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে শুধু অমুসলিম হওয়ার কারণে তার সাহায্য সহযোগিতা কিংবা দান-সদকা (নফল) থেকে বিরত না থাকা। তবে ইসলামের দন্ডবিধি (হুদূদ-তাযীর-কিসাস) যে কোনো অপরাধীর জন্যই প্রযোজ্য। ইসলামী রাষ্ট্রের অধিবাসী হিসেবে ইসলামী ফিকহে উল্লেখিত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা অমুসলিম অপরাধীর উপরও প্রয়োগ হবে।
আর ইসলামের জিহাদ তো হয় যুদ্ধবাজ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠির বিরুদ্ধে, অমুসলিম দেশের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নয়। তবে এর জন্যও ইসলামে রয়েছে পৃথক বিধান ও নির্দিষ্ট সীমারেখা, যার যথার্থ অনুসরণের মাধ্যমেই জিহাদ হয় রহমত। বলাবাহুল্য যে, অমুসলিমদের যুদ্ধটা বাস্তবতা, হিকমত ও বিধান-সকল দিক থেকে ইসলামী জিহাদ থেকে ভিন্ন। তাই সেটি কখনো রহমত হয় না; বরং তা হল আগাগোড়া ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা।
এটাই হল উদারতার শরঈ মর্ম। কিন্তু আফসোসের বিষয় এই যে, ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে সাধারণ উদাসীনতার কারণে আর কিছুটা পশ্চিমা প্রচার-প্রোপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ আজ উদারতার ভুল অর্থ বুঝতে শুরু করেছে। কেউ কেউ মনে করে, উদারতার অর্থ হল সব ধর্মকেই সঠিক বলা ও যে কোনো ধর্মের অনুসরণকেই বৈধ বলা। (নাউযুবিল্লাহ)
আবার অনেকে মনে করে, উদারতা প্রমাণের জন্য মুসলিমদেরকে অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন, তাদের ধর্মীয় শাআইর ও প্রতীক এবং আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে!! অনেকে তো এমনও বলে যে, শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে হবে। তাদের আকাইদ ও দর্শনকে ভালো চোখে দেখা বা উপস্থাপন করাও কাম্য। (নাউযুবিল্লাহ, ছুম্মা নাউযুবিল্লাহ)
কেউ আবার উদারতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে, ইসলাম শুধু এবং শুধু শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। এতে জিহাদ নামে কিছু নেই। তাদের হয়তো জানা নেই যে, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ইসলাম জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদকে ফরয করেছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত এক অমোঘ বিধান। এর বিধান ও সীমারেখা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহয় পূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আর অত্যন্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বিস্তারিতভাবে ফিকহী কিতাবসমূহে ‘কিতাবুল জিহাদ’ কিংবা ‘কিতাবুস সিয়ার’ (জিহাদ বা সিয়ার অধ্যায়) শিরোনামে উল্লেখ রয়েছে। এসকল বিধান ও সীমারেখার যথার্থ পালনের মাধ্যমেই কেবল জিহাদ হয় রহমত এবং সকল ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা বন্ধের একমাত্র রববানী প্রতিষেধক।
মোটকথা, আলোচনার শুরুতে উদারতার যে অর্থটি উল্লেখ করা হয়েছে এটিই হল সঠিক অর্থ, এছাড়া অন্য যেসব অর্থ উপরে বলা হয়েছে, যেগুলো দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা তৈরি করেছে তা স্পষ্ট কুফর। এগুলোর কোনো একটি অর্থকে সঠিক মনে করা কিংবা এটাকে ইসলামের শিক্ষা আখ্যা দেওয়া মূলত কুরআনের সরাসরি বিরোধিতা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিদ্রোহের শামিল।
বিশদ আলোচনার পরিবর্তে আমরা পাঠকদের সামনে এ বিষয়ে কুরআন মজীদের কিছু আয়াতের শুধু তরজমা পেশ করছি :
(তরজমা) এবং (সেই সময়কে) স্মরণ কর, যখন সে তার পুত্রকে উপদেশচ্ছলে বলেছিল, ওহে আমার বাছা! আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চিত জেন, শিরক চরম জুলুম। আমি মানুষকে তার পিতা-মাতা সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছি-(কেননা) তার মা কষ্টের পর কষ্ট সয়ে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’ বছরে-তুমি শুকর আদায় কর আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। আমারই কাছে (তোমাদেরকে) ফিরে আসতে হবে।
তারা যদি এমন কাউকে (প্রভুত্বে) আমার সমকক্ষ সাব্যস্ত করার জন্য তোমাকে চাপ দেয়, যে সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের কথা মানবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদ্ভাবে থাকবে। এমন ব্যক্তির পথ অবলম্বন করো, যে একান্তভাবে আমার অভিমুখী হয়েছে। অতপর তোমাদের সকলকেই আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদেরকে অবহিত করব তোমরা যা কিছু করতে। (সূরা লুকমান ( ৩১) : ১৩-১৫)
(তরজমা) হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভাই যদি ঈমানের বিপরীতে কুফরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে তাদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানিও না। যারা তাদেরকে অভিভাবক বানাবে তারা জালেম সাব্যস্ত হবে।
‘(হে নবী! মুসলিমদেরকে) বল, তোমাদের কাছে যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের খান্দান, তোমাদের সেই সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের সেই ব্যবসায়, যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং বসবাসের সেই ঘর, যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ ফায়সালা প্রকাশ করেন। আল্লাহ অবাধ্যদেরকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না। (সূরা তাওবা (৯) : ২৩-২৪)
(তরজমা) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার পথে জিহাদের জন্য (ঘর থেকে) বের হয়ে থাক, তবে আমার শত্রু ও তোমাদের নিজেদের শত্রুকে এমন বন্ধু বানিও না যে, তাদের কাছে ভালবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তারা তা এমনই প্রত্যাখ্যান করেছে যে, রাসূলকে এবং তোমাদেরকেও কেবল এই কারণে (মক্কা হতে) বের করে দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ।
তোমরা গোপনে তাদের সাথে ঙবন্ধুত্ব কর, অথচ তোমরা যা কিছু গোপনে কর ও যা কিছু প্রকাশ্যে কর আমি তা ভালোভাবে জানি। তোমাদের মধ্যে কেউ এমন করলে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হল। তোমাদেরকে বাগে পেলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং নিজেদের হাত ও মুখ বিস্তার করে তোমাদেরকে কষ্ট দেবে। তাদের কামনা এটাই যে, তোমরা কাফের হয়ে যাও।
‘কিয়ামতের দিন তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহই তোমাদের মধ্যে ফয়াসালা করবেন। তোমরা যা কিছু করছ আল্লাহ তা ভালোভাবে দেখছেন।
‘তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সঙ্গীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ আছে, যখন সে নিজ সম্প্রদায়কে বলেছে, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করছ তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের (আকীদা-বিশ্বাস) অস্বীকার করি। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে। যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। তবে ইবরাহীম তার পিতাকে অবশ্যই বলেছিল, আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য মাগফিরাতের দুআ করব, যদিও আমি আল্লাহর সামনে আপনার কোনো উপকার করার এখতিয়ার রাখি না।
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনারই উপর নির্ভর করেছি, আপনারই দিকে আমরা রুজু হয়েছি এবং আপনারই কাছে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফেরদের পরীক্ষার পাত্র বানাবেন না এবং হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই কেবল আপনিই এমন, যার ক্ষমতা পরিপূর্ণ, হেকমতও পরিপূর্ণ।
‘(হে মুসলিমগণ!) নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য তাদের (কর্মপন্থার) মধ্যে আছে উত্তম আদর্শ, প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে (সে যেন মনে রাখে), আল্লাহ সকলের থেকে মুখাপেক্ষিতাহীন, আপনিই প্রশংসার্হ। (সূরা মুমতাহিনা (৬০) : ১-৬)
(তরজমা) ‘বস্ত্তত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ এর বিনিময়ে খরিদ করে নিয়েছেন যে, তাদের জন্য জান্নাত আছে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে হত্যা করে ও নিহতও হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীলেও নিয়েছেন এবং কুরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা বেশি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য তোমরা আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য।
‘(যারা এই সফল সওদা করেছে, তারা কারা?) তারা তওবাকারী, আল্লাহর ইবাদতকারী, তাঁর প্রশংসাকারী, সওম পালনকারী, রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা ও অন্যায় কাজে বাধাদানকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী। (হে নবী!) এরূপ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।
‘এটা নবী ও মুমিনদের পক্ষে
শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তা তারা আত্মীয়-স্বজনই হোক না কেন, যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, তারা জাহান্নামী।
‘আর ইবরাহীম নিজ পিতার জন্য যে মাগফিরাতের দোয়া করেছিলেন তার কারণ এছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, সে তাকে (পিতাকে) এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরে যখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করল। ইবরাহীম তো অত্যধিক উহ্-আহকারী ও বড় সহনশীল ছিল।’ (সূরা তাওবা (৯) : ১১১-১১৪)
একটু ভেবে দেখুন, আল্লাহর কোনো বান্দা, কুরআন মজীদের এ সকল আয়াতের প্রতি যার ঈমান আছে, সে কি প্রচলিত অর্থে ‘উদারতা’র প্রবক্তা হতে পারে? কোনো মুমিন উদারতার নামে মুদাহিন ও শৈথিল্যবাদী হতে পারে না। সে তো মনে করে, উদারতা ঈমান-আকীদা বিসর্জন দেওয়া নয়; সৃষ্টিকে খুশি করার জন্য স্রষ্টার প্রতি নিজের ঈমানকে ধ্বংস করা নয়। আর তা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। মুমিন তো তার ঈমান-আকীদায় পর্বতমালার চেয়েও বেশি মজবুত ও দৃঢ়পদ। তার নিকট ঈমান তো নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। মুমিন তো নিজ মন-প্রাণ, কথা ও কাজে ঘোষণা করে-
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থাৎ বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমুহের প্রতিপালক। (সূরা আনআম (৬) : ১৬২)
সে তো বলে-
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
অর্থাৎ আমি সম্পূর্ণ একনিষ্ঠভাবে সেই সত্ত্বার দিকে নিজের মুখ ফেরালাম, যিনি আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি শিরককারীদের
অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা আনআম (৬) : ৭৯)
একজন মুমিনের সামনে তো রয়েছে দ্বীনে তাওহীদের ইমাম হযরত ইবরাহীম আ., অন্য সকল নবী ও সাইয়্যেদুল মুরসালীন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ। সে তো কখনো শিরক ও শিরককারীদের সাথে আপোষ করতে পারে না। তার সামনে সর্বদা কুরআনের এই বিধান উদ্ভাসিত থাকে-(তরজমা) এবং (তারপর এই ঘটল যে,) তার সম্পদ্রায় তার সাথে হুজ্জত শুরু করে দিল। ইবরাহীম (তাদেরকে) বলল, তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে আমার সঙ্গে হুজ্জত করছ, অথচ তিনি আমাকে হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা যে সকল জিনিসকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করছ (তারা আমার কোনো ক্ষতি সাধন করবে বলে) আমি তাদেরকে ভয় করি না। অবশ্য আমার প্রতিপালক যদি (আমার) কোনো (ক্ষতি সাধন) করতে চান (তবে সর্বাবস্থায়ই তা সাধিত হবে)। আমার প্রতিপালকের জ্ঞান সবকিছু পরিবেষ্টন করে রেখেছে। এতদসত্ত্বেও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আনআম (৬) : ৮০-৮২
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সীরাতে মুস্তাকীমে দৃঢ়পদ রাখুন। আমীন।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ !
(সূরা আলইমরান (৩) : ৮)
رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آَمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَصْنَامَ !
সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৩৫
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ! رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ !
সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৪০-৪১
---------------------------------------------------
কাবা ঘর শ্রেষ্ঠ না বাইতুল মুকাদ্দাস? কাবা শ্রেষ্ঠ হলে নবীজী শেষ জীবন মদীনায় কাটালেন কেন?
প্রশ্ন
১- আল্লাহর ঘর কোনটি? কাবা না বাইতুল মুকাদ্দাস?
২- আল্লাহর কাছে কোন ঘর বেশি প্রিয়?
৩-মেরাজের রাতে বাইতুল মুকাদ্দেস নামায পড়লেন কেন? এ সংক্রান্ত হাদীস কি কথিত?
৪- মুকাদ্দাসের তুলনায় কাবা শ্রেষ্ঠ হলে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কুরআনে বরকতময় বলা হল কেন?
৫-কাবা শ্রেষ্ঠ হলে নবীজী সাঃ কাবার কাছে না থাকিয়া বাকি জীবন মদীনায় থাকলেন কেন?
---------------------------------------------------
সবকিছু আল্লাহর হুকুমে হলে বান্দার পাপের শাস্তি হবে কেন?
প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম!
আল্লাহ তাআলা আমাকে দাওয়াতের কাজে মাঝে মধ্যে ব্যবহার করেন। এ সুবাধে আমাকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। তার মধ্যে একটি প্রশ্নের প্রায়ই সম্মুখিন হতে হয়। এটি হল, “আল্লাহ তাআলার হুকুমে সব কিছুই হয়, তার মানে এই যে, গোনাহ করি তা’ও আল্লাহ তাআলার হুকুমে। তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে জাহান্নামে দিবেন কেন? আমি কী কী কাজ করবো তা’ও তো আল্লাহ তাআলা আমার তাকদীরে লিখে ফেলেছেন, তকদীরতো পরিবর্তন হবার নয়। তাহলে আমি কেন জাহান্নামে যাবো? বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে খুবই উপকৃত হবো।
উত্তর
এরকম লোকদের সোজা উত্তর না দিয়ে উল্টো করে উত্তর দিতে হয়। তাদের ধরে আচ্ছা করে ধোলাই করে বলতে হবে যে, তোমাকে প্রহার করাতো আল্লাহ তাআলা তোমার তকদীরে লিখে রেখেছেন, তো তুমি কেন আমার বিরুদ্ধে বিচার দায়ের করতে চাও?
এসব লোকদের ধরে ঘরে বন্দী করে খানা বন্ধ করে দেয়া উচিত। তারপর ক্ষুধা তৃষ্ণায় যখন কাতরাতে থাকবে, তখন বলতে হবে যে, তোমার তাকদীরে এমন লিখা ছিল, তুমি কেন আফসোস করছো?
আসলে আমল থেকে বিরত থাকতে এরকম কথা হল একটি শয়তানী ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়।
আল্লাহ তাআলা সমস্ত কর্মের স্রষ্টা কথা সত্য। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বান্দাকে সকল কাজ করতে আল্লাহ তাআলা বাধ্য করেন। বরং ভাল মন্দ উভয কাজ করতেই বান্দার সক্ষমতা রয়েছে। এ সক্ষমতা আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বান্দা বান্দিকেই দান করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করেন না। বরং দুনিয়াতে তাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যেহেতু সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত। তাই তিনি আগে লিখে রেখেছেন বান্দা কী করবে? এটাই তাকদীর। আর আল্লাহর এ লিখে রাখা বান্দার কর্মের উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করে না। তাই, বান্দা তার কর্ম অনুপাতে ফল পাবে।
আরেক শব্দে বলি, দুনিয়াতে বান্দা ভাল এবং মন্দ উভয় কাজের জন্য স্বাধীন। এখানে আল্লাহ তাআলা কাউকে কোন কাজ করতে বাধ্য করেন না সরাসরি। বাকি বান্দা কী করবে? তা আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন। সেই হিসেবে আগেই সব কিছু লিখে রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার উক্ত লিখে রাখার দ্বারা বান্দার কাজে কোন প্রভাব সৃষ্টি করে না। তা’ই বান্দা তার কর্ম অনুপাতে বদলা পাবে। ভাল করলে ভাল। আর মন্দ করলে মন্দ। আর বান্দা যেহেতু জানে না, আল্লাহ তাআলা কী লিখে রেখেছেন, তাই বান্দার উচিত ভাল কর্ম করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকা। এবং মন্দ কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর এ বিষয়ে অতিরিক্ত আলোচনা মোটেই উচিত নয়। যা রাসূল সাঃ এর পরিস্কার নির্দেশ।
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ، فَذَكَرَ لَهَا شَيْئًا مِنَ الْقَدَرِ، فَقَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَكَلَّمَ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقَدَرِ سُئِلَ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيهِ لَمْ يُسْأَلْ عَنْهُ»
হযরত ইয়াহইয়া বনি আব্দুল্লাহ বিন আবী মুলাইকা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা হযরত আয়শা রাঃ এর নিকট গেলেন। তখন তিনি তাকদীর বিষয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তখন হযরত আয়শা রাঃ বলেন, আমি রাসুল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি তাকদীর বিষয়ে কথা বলে, কিয়ামতের ময়দানে এ কারণে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আর যে এ বিষয়ে আলোচনা না করবে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৮৪}
والقدر سر من أسرار الله تعالى، لم يطلع عليه ملكا مقربا ولا نبيا مرسلا، ولا يجوز الخوض فيه، والبحث عنه بطريق العقل، (مرقاة المفاتيح، كتاب الإيمان، باب الإيمان بالقدر-1/256)
واصل القدر سر فى خلقه لم يطلع على ذلك ملك مقرب ولا نبى مرسل، والتعمق والنظر فى ذلك ذريعة الخذلان وسلم الحرمان، ودرجة الطغيان، فاحذر كل الحذر من ذلك، نظرا وفكرا ووسوسة، فإن الله تعالى طوى علم القدر عن أنامه، ونهاهم عن مرامه كما قال فى كتابه: لا يسئل عما يفعل وهم يسئلون (الانبياء-23) فمن سأل: لم فعل؟ فقد رد حكم كتاب الله، ومن رد حكم كتاب الله تعالى كان من الكافرين….. وقال على رضى الله عنه “القدر سر الله فلا تكشفه، (العقيدة الطحاوية-180)
মোটকথা, তাকদীর বিষয়ে প্রশ্ন করা, আলোচনা করা, গবেষণা করা সম্পূর্ণ হারাম। আমাদের যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটিতেই মগ্ন থাকা উচিত। তাকদীর এটি আল্লাহ তাআলার গোপন রহস্য। এ রহস্য সম্পর্কে কোন ফেরেশতা বা কোন নবীও ওয়াকিফহাল নন। তাই এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা ফিকির করা নিজের ঈমানের ক্ষতি করা ছাড়া আর কোন ফায়দা নেই। তাই এ বিষয়ে প্রশ্ন করা ও আলোচনা করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক।
আরেক হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ نَتَنَازَعُ فِي القَدَرِ فَغَضِبَ حَتَّى احْمَرَّ وَجْهُهُ، حَتَّى كَأَنَّمَا فُقِئَ فِي وَجْنَتَيْهِ الرُّمَّانُ، فَقَالَ: أَبِهَذَا أُمِرْتُمْ أَمْ بِهَذَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ؟ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حِينَ تَنَازَعُوا فِي هَذَا الأَمْرِ، عَزَمْتُ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تَتَنَازَعُوا فِيهِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল সাঃ আমাদের কাছে আসলেন এমতাবস্থায় যে, আমরা তাকদীর বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। তখন রাসূল সাঃ প্রচন্ড রেগে গেলেন।রাগে চেহারা আনারের মত রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, তোমরা এ এসব করতে আদিষ্ট হয়েছো? নাকি আমি এসবের জন্য আবির্ভূত হয়েছি? ইতোপূর্বের লোকজন এ বিষয়ে আলোচনা করে ধ্বংস হয়েছে, আমি তোমাদের দৃঢ়তার সাথে বলছি, তোমরা এ বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। {তিরমিজী, হাদীস নং-২১৩৩}
সুতরাং এমন অপরিণামদর্শী প্রশ্ন করা ও এর উত্তরের পিছনে পড়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
---------------------------------------------------
রমজানে শয়তান বন্দী হবার পরও মানুষ পাপ করে কিভাবে?
প্রশ্ন
রমজান মাসে শয়তানকে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা সত্বেও কেন আমরা নামাজ রোজা ত্যাগ, যেনা ব্যভিচার, অন্যায় অশ্লীলতা সহ সব ধরনের পাপাচারে লিপ্ত হই? আল্লাহ আপনাকে নেক হায়াত দান করুন। আমিন
উত্তর
হাদীসের বর্ণনা দ্বারা শয়তান বন্দি থাকার বিষয়টি পরিস্কার হবার পরও রমজানে মানুষ কেন পাপ করে তার বেশ কিছু জবাব মুহাদ্দিসীনে কেরাম দিয়েছেন। যেমন-
১.মানুষ পাপ করে দুই কারণে। এক হল তার মনের কুপ্রবৃত্তির কারণে। আরেকটি হল শয়তানের প্ররোচনায়। শয়তান বন্দি থাকলেও মনের কুপ্রবৃত্তির কারণে মানুষ পাপ করে থাকে।
২.সকল শয়তান বন্দী করা হয় না, কিছু শয়তান বন্দি করা হয়। তাই অন্য শয়তানদের প্ররোচনায় মানুষ পাপ করে।
৩.রমজানের আগে করা পাপের প্রভাবে মানুষ পাপ করে থাকে। যেমন গরম থেকে আসলে শরীর থাকে তেমনি।
৪.রমজানে শয়তানের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ বন্ধ থাকলেও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ বন্ধ থাকে না। তাই মানুষ পাপ করে।
৫.কারো মতে রাতে শয়তান বন্দি থাকে, দিনের বেলা নয়।
৬.শয়তান বন্দি হয়, মানে মানুষের মনে ইবাদতের আকাংখা বৃদ্ধি পায়। মূলত শয়তান বন্দি হয় না।
বিস্তারিত জানতে দেখুন- ফাতহুল বারী, উমদাতুল কারী, মিরকাতুল মাফাতীহ, উমদাতুল কারী, শরহে মুসলিম লিননাবাবী, শরহুজ যুরকানী লিলমুয়াত্তা, ফায়জুল বারী}
---------------------------------------------------
সব কিছু তাকদীরে লিপিবদ্ধ থাকলে বান্দার কর্মের শাস্তি হবে কেন? তাকদীর বিষয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ!
প্রশ্ন
আল্লাহ তাআলা যে তাকদীর নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, সে হিসেবে মানুষ দুনিয়াতে আসার পর আমল করে থাকে। অর্থাৎ ভাল কাজ করুক আর মন্দ কাজ করুক সবই আল্লাহর হুকুমের অধীনেইতো হয়ে থাকে। কেনন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, তার হুকুম ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না। সুতরাং মানুষ দুনিয়াতে এসে যেসব পাপকর্ম করছে, এজন্য আখেরাতে শাস্তি হবে কেন? কোন জ্ঞানীর জ্ঞান যত বড়ই হোক না কেন, সেতো আল্লাহর আল্লাহর লিখিত তাকদীর পাল্টাতে পারবে না তাই না?
উত্তর
তাকদীর বিষয়ে আলোচনা করার অনুমতি নেই। হাদীসে পরিস্কার নিষেধাজ্ঞা এসেছে-
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ، فَذَكَرَ لَهَا شَيْئًا مِنَ الْقَدَرِ، فَقَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَكَلَّمَ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقَدَرِ سُئِلَ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيهِ لَمْ يُسْأَلْ عَنْهُ»
হযরত ইয়াহইয়া বনি আব্দুল্লাহ বিন আবী মুলাইকা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা হযরত আয়শা রাঃ এর নিকট গেলেন। তখন তিনি তাকদীর বিষয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তখন হযরত আয়শা রাঃ বলেন, আমি রাসুল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি তাকদীর বিষয়ে কথা বলে, কিয়ামতের ময়দানে এ কারণে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আর যে এ বিষয়ে আলোচনা না করবে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৮৪}
والقدر سر من أسرار الله تعالى، لم يطلع عليه ملكا مقربا ولا نبيا مرسلا، ولا يجوز الخوض فيه، والبحث عنه بطريق العقل، (مرقاة المفاتيح، كتاب الإيمان، باب الإيمان بالقدر-1/256)
واصل القدر سر فى خلقه لم يطلع على ذلك ملك مقرب ولا نبى مرسل، والتعمق والنظر فى ذلك ذريعة الخذلان وسلم الحرمان، ودرجة الطغيان، فاحذر كل الحذر من ذلك، نظرا وفكرا ووسوسة، فإن الله تعالى طوى علم القدر عن أنامه، ونهاهم عن مرامه كما قال فى كتابه: لا يسئل عما يفعل وهم يسئلون (الانبياء-23) فمن سأل: لم فعل؟ فقد رد حكم كتاب الله، ومن رد حكم كتاب الله تعالى كان من الكافرين….. وقال على رضى الله عنه “القدر سر الله فلا تكشفه، (العقيدة الطحاوية-180)
মোটকথা, তাকদীর বিষয়ে প্রশ্ন করা, আলোচনা করা, গবেষণা করা সম্পূর্ণ হারাম। আমাদের যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটিতেই মগ্ন থাকা উচিত। তাকদীর এটি আল্লাহ তাআলার গোপন রহস্য। এ রহস্য সম্পর্কে কোন ফেরেশতা বা কোন নবীও ওয়াকিফহাল নন। তাই এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা ফিকির করা নিজের ঈমানের ক্ষতি করা ছাড়া আর কোন ফায়দা নেই। তাই এ বিষয়ে প্রশ্ন করা ও আলোচনা করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক।
আরেক হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ نَتَنَازَعُ فِي القَدَرِ فَغَضِبَ حَتَّى احْمَرَّ وَجْهُهُ، حَتَّى كَأَنَّمَا فُقِئَ فِي وَجْنَتَيْهِ الرُّمَّانُ، فَقَالَ: أَبِهَذَا أُمِرْتُمْ أَمْ بِهَذَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ؟ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حِينَ تَنَازَعُوا فِي هَذَا الأَمْرِ، عَزَمْتُ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تَتَنَازَعُوا فِيهِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল সাঃ আমাদের কাছে আসলেন এমতাবস্থায় যে, আমরা তাকদীর বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। তখন রাসূল সাঃ প্রচন্ড রেগে গেলেন।রাগে চেহারা আনারের মত রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, তোমরা এ এসব করতে আদিষ্ট হয়েছো? নাকি আমি এসবের জন্য আবির্ভূত হয়েছি? ইতোপূর্বের লোকজন এ বিষয়ে আলোচনা করে ধ্বংস হয়েছে, আমি তোমাদের দৃঢ়তার সাথে বলছি, তোমরা এ বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। {তিরমিজী, হাদীস নং-২১৩৩}
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে কোন কাজ করতে বাধ্য করেন না। বরং দুনিয়াতে তাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যেহেতু সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত। তাই তিনি আগে লিখে রেখেছেন বান্দা কী করবে? এটাই তাকদীর। আর আল্লাহর এ লিখে রাখা বান্দার কর্মের উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করে না। তাই, বান্দা তার কর্ম অনুপাতে ফল পাবে।
আরেক শব্দে বলি, দুনিয়াতে বান্দা ভাল এবং মন্দ উভয় কাজের জন্য স্বাধীন। এখানে আল্লাহ তাআলা কাউকে কোন কাজ করতে বাধ্য করেন না সরাসরি। বাকি বান্দা কী করবে? তা আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন। সেই হিসেবে আগেই সব কিছু লিখে রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার উক্ত লিখে রাখার দ্বারা বান্দার কাজে কোন প্রভাব সৃষ্টি করে না। তা’ই বান্দা তার কর্ম অনুপাতে বদলা পাবে। ভা করলে ভাল। আর মন্দ করলে মন্দ। আর বান্দা যেহেতু জানে না, আল্লাহ তাআলা কী লিখে রেখেছেন, তাই বান্দার উচিত ভাল কর্ম করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকা। এবং মন্দ কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর এ বিষয়ে অতিরিক্ত আলোচনা মোটেই উচিত নয়। যা ইতোপূর্বে উল্লেখিত হাদীস ও মুহাক্কিকদের বক্তব্যের দ্বারা পরিস্কার হয়ে গেছে।
---------------------------------------------------
মসজিদের গম্বুজ নির্মাণ অগ্নিপূজকদের থেকে ধার করা?
প্রশ্নঃ
আসসালামু আলাইকুম। আমি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছি। এখানে এসে আমি বিভিন্ন ভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছি। যেমন আজকের বিষয়টি। আমাদের এক ম্যাম ক্লাসে বলল, "মসজিদের গম্বুজ নির্মাণ করেছিল পারসিকরা আর তারা অগ্নি পূজারী ছিল বিধায় ঐগুলিকে আগুনের আকৃতিতে তৈরি করেছে (আমরা ছোটবেলায় যেভাবে আগুনের ছবি আঁকতাম)। মুসলিম প্রধান স্থাপত্য হল কাবা শরীফ আর এর আকৃতি হল চতুর্ভুজ। গম্বুজগুলি এর আকৃতিতে নয় বরং আগুনের আকৃতিতে তৈরি।" এ ব্যাপারে একটি ছবি এড করছি।
উত্তর
গম্বুজ সংস্কৃতি বিধর্মীদের থেকে নয়। মুসলমানদের থেকেই শুরু হয়েছে। আর এর সাথে আগুনের যে সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে। তা কেবল প্রমাণবিহীন একটি ধারণা ছাড়া কিছু নয়।
কুরআনের কারীমের আয়াত:
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ
এবং (সেই সময়ের কথা চিন্তা কর) যখন ইবরাহীম বাইতুল্লাহর ভিত উঁচু করছিল এবং ইসমাঈলও। [সূরা বাকারা-১২৭]
ভিতকে উঁচু করা এটা গম্বুজের চিহ্ন। গম্বুজ মূল ভিত থেকে উঁচু হয়।
এর দ্বারা বুঝা যায় যে, গম্বুজের ধারণাটি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জমানা থেকেই আছে।
উক্ত আয়াতের ভিত উঁচু করা বলতে কী বুঝানো হয়েছে? এর কয়েকটি অর্থের মাঝে একটি ইমাম তাবারী রহঃ লিখেন:
وَجَائِزٌ أَنْ يَكُونَ ذَلِكَ كَانَ الْقُبَّةَ الَّتِي ذَكَرَهَا عَطَاءٌ مِمَّا أَنْشَأَهُ اللَّهُ مِنْ زَبَدِ الْمَاءِ (تفسير الطبرى-2-5، سورة البقرة-127)
এটাও হতে পারে যে, সেটি ছিল ঐ গম্বুজ, যার কথা আত্বা রহঃ উল্লেখ করেছেন। যা আল্লাহ তাআলা পানির ফেনা দ্বারা তৈরী করেছেন। [তাফসীরে কুরতুবী-২/৫৫৫]
সুতরাং গম্বুজ সংস্কৃতি বিধর্মীদের থেকে নেয়া হয়েছে এটা সঠিক কথা নয়।
والله اعلم بالصواب
---------------------------------------------------------
জোহর আসর নামাযে কিরাত আস্তে পড়া হয় কেন?
প্রশ্ন
জোহর আসর নামাযে কিরাত আস্তে পড়া হয় কেন?
উত্তর
শরীরের যে অঙ্গ দিয়ে ময়লা বের হয়, তা পরিস্কার করে নামায আদায় করতে হয়। কিন্তু বাতকর্ম পিছনের রাস্তা দিয়ে করলেও তা পরিস্কার না করে হাত পা, মুখ পা ইত্যাদি ধৌত করে ওজু করতে হয় কেন?
আপনি কি এমন উদ্ভট প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন?
আসলে এর জবাব একটাই। আল্লাহর আদেশ। ব্যস। আমরা মেনে নিয়েছি। তেমনি জোহর ও আসরের নামাযে কিরাত আস্তে পড়া ও মাগরিব, ইশা এবং ফজরের নামাযে কিরাত জোরে পড়া এটাই রাসূল সাঃ এর আমল দ্বারা প্রমানিত। তাই সকল মুসলমানদের জন্য এভাবে আমল করার বিধান। কেন এই বিধান তা জানার কোন প্রয়োজনই নেই। আর মৌলিকভাবে এর কোন কারণও নেই। বাকি একটি হিকমত এই ছিল যে, দিনের বেলা জোরে কিরাত পড়লে আরবের মুশরিকরা কিরাতকে ঠাট্টা করে জোরে জোরে আওয়াজ করে ডিষ্টার্ব করতো। যা রাতের বেলা হতো না। তাই দিনে আস্তে কিরাতের বিধান এসেছে আর রাতে জোরের।
বাকি এটি কেবলি একটি হিকমত। মূলত আল্লাহর নবী এভাবে নামায পড়েছেন, তাই আমরা এভাবে নামায পড়ি।
আরো একটি হিকমত বলা হয়ে থাকে, দিনের বেলা সূর্যের তীব্র প্রখরতার মাধ্যমে আল্লাহর জালালিয়্যাতের প্রকাশ করে থাকে। আর জালালিয়্যাত প্রকাশিত হলে মানুষ চুপ হয়ে যায়, তাই ইমামও আস্তে কিরাত পড়ে। আর রাতে বেলা চাঁদের স্নিগ্ধতার মাধ্যমে আল্লাহর জামালিয়্যাত এর জানান দেয়, আর জামালিয়্যাত সত্তার সামনে সবাই কথা বলে উঠে। তেমনি রাতের বেলার মুসল্লি জোরে কিরাত পড়ে থাকে।
আবারো বলছি এসবই মানুষের গবেষণা করা হিকমত। আল্লাহর আদেশ ও রাসুল সাঃ এর তরীকার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহর নবী যে নামাযে জোরে কিরাত করেছেন, আর যে নামাযে আস্তে কিরাত পড়েছেন, তা’ই আমাদের জন্য মানা আবশ্যক। হিকমত বা কারণ খোঁজা নিরর্থক।
عَنْ أَبِي مَعْمَرٍ، قَالَ: سَأَلْنَا خَبَّابًا أَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي الظُّهْرِ وَالعَصْرِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قُلْنَا: بِأَيِّ شَيْءٍ كُنْتُمْ تَعْرِفُونَ؟ قَالَ: «بِاضْطِرَابِ لِحْيَتِهِ»
হযরত আবু মামার রহঃ হযরত খাব্বাব রাঃ কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসুল সাঃ যোহর ও আসরে কিরাত পড়তেন কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ পড়তেন। আবু মামার পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিভাবে বুঝা যেত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসুল সাঃ এর দাড়ি নড়াচড়া দেখে বুঝা যেত। {বুখারী, হাদীস নং-৭৬০}
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَرَأَ فِي المَغْرِبِ بِالطُّورِ»
হযরত মুহাম্মদ বন যুবায়ের বিন মুতয়িম রাঃ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুল সাঃ কে মাগরিব নামাযে সূরা তূর পড়তে শুনেছেন। {বুখারী, হাদীস নং-৭৬৫}
البَرَاءَ: ” أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ فِي سَفَرٍ فَقَرَأَ فِي العِشَاءِ فِي إِحْدَى الرَّكْعَتَيْنِ: بِالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ
হযরত বারা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ এক সফরে ইশার দুই রাকাতের এক রাকাতে সূরা তীন পড়তেন। {বুখারী, হাদীস নং-৭৬৭}
---------------------------------------------------------
ইসলামী রাষ্ট্রে নবী অবমাননার শাস্তি কী?
প্রশ্ন
যে দেশে শরিয়াহ আইন প্রচলিত নেই সেই দেশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কটুক্তিকারীদের সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর
ইসলামী খিলাফত থাকলে এমন কটূক্তিকারীকে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি দেয়া হতো। যার অসংখ্য নজীর ইসলামী খিলাফতের সময়কার পাওয়া যায়।
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٩:١١]وَإِنْ نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ۙ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ [٩:١٢]أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُّوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُمْ بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ۚ أَتَخْشَوْنَهُمْ ۚ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوْهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ [٩:١٣]
অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। আর যদি ভঙ্গ করে তারা তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তবে কুফর প্রধানদের সাথে যুদ্ধ কর। কারণ, এদের কেন শপথ নেই যাতে তারা ফিরে আসে। তোমরা কি সেই দলের সাথে যুদ্ধ করবে না; যারা ভঙ্গ করেছে নিজেদের শপথ এবং সঙ্কল্প নিয়েছে রসূলকে বহিস্কারের? আর এরাই প্রথম তোমাদের সাথে বিবাদের সূত্রপাত করেছে। তোমরা কি তাদের ভয় কর? অথচ তোমাদের ভয়ের অধিকতর যোগ্য হলেন আল্লাহ, যদি তোমরা মুমিন হও। {সূরা তওবা-১১-১৩}
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহঃ এ আয়াতের দ্বারা দলিল দিয়ে বলেন- যে ব্যক্তি ইসলাম বা কুরআনের বিরুদ্ধে খারাপ মন্তব্য করে, অথবা রাসূল সাঃ এর ব্যাপারে মন্দ কথা বলে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। {মাহাসিনুত তাওয়ীল-৫/১৪২}
ابن عباس أن أعمى كانت له أم ولد تشتم النبى -صلى الله عليه وسلم- وتقع فيه فينهاها فلا تنتهى ويزجرها فلا تنزجر – قال – فلما كانت ذات ليلة جعلت تقع فى النبى -صلى الله عليه وسلم- وتشتمه فأخذ المغول فوضعه فى بطنها واتكأ عليها فقتلها فوقع بين رجليها طفل فلطخت ما هناك بالدم فلما أصبح ذكر ذلك لرسول الله -صلى الله عليه وسلم- فجمع الناس فقال ্র أنشد الله رجلا فعل ما فعل لى عليه حق إلا قام গ্ধ. فقام الأعمى يتخطى الناس وهو يتزلزل حتى قعد بين يدى النبى -صلى الله عليه وسلم- فقال يا رسول الله أنا صاحبها كانت تشتمك وتقع فيك فأنهاها فلا تنتهى وأزجرها فلا تنزجر ولى منها ابنان مثل اللؤلؤتين وكانت بى رفيقة فلما كانت البارحة جعلت تشتمك وتقع فيك فأخذت المغول فوضعته فى بطنها واتكأت عليها حتى قتلتها. فقال النبى -صلى الله عليه وسلم- ্র ألا اشهدوا أن دمها هدر
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। এক অন্ধ সাহাবীর একটি উম্মে ওয়ালাদ বাদি ছিল। সে বাদিটি রাসূল সাঃ কে গালাগাল করতো। অন্ধ সাহাবী তাকে নিষেধ করেন, কিন্তু সে নিষেধ অমান্য করে, তিনি তাকে হুমকি দেন, তাতেও সে বিরত থাকে না। তিনি বলেন, একদা রাতে বাদিটি রাসূল সাঃ কে গালাগাল শুরু করে, তখন সাহাবী খঞ্জর নিয়ে তার পেটে চেপে ধরলেন। এবং জোরে চাপ দিলেন। ফলে বাদিটি মারা গেল। এমনকি বাদিটি দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পেটের বাচ্চা বের হয়ে যায়। বাচ্চাটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। সকালে বিষয়টি রাসূল সাঃ এর কাছে উপস্থাপিত হয়। তখন রাসূল সাঃ সবাইকে একত্র করে বলেন, যে এ কাজ করেছে তাকে আল্লাহর কসম ও আমার উপর থাকা তার হকের কসম দিচ্ছি সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। তখন সেই অন্ধ সাহাবী দাঁড়ালেন। তিনি লোকদের ভীর ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলেন। রাসূল সাঃ এর সামনে গিয়ে বসে পড়লেন। তারপর বললেন-হে আল্লাহর রাসূল! সে আপনাকে গালাগাল করতো, আপনার কুৎসা রটাতো। আমি তাকে এসব করতে বাঁধা দিতাম। কিন্তু সে বিরত হতো না। তাকে হুমকি ধামকি দিতাম, তবু সে থামতো না। আর আমার হীরার টুকরোর মত দু’টি সন্তান তার গর্ভ থেকে আছে। আমি তাকে খুব ভালবাসতাম। গতরাতে সে যখন সে আপনাকে গালাগাল শুরু করে, কুৎসা বলতে থাকে, তখন আমি একটি খঞ্জর তার পেটে চেপে ধরি। তারপর তা চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করি। তখন রাসূল সাঃ বললেন- লোকেরা! তোমরা স্বাক্ষ্যি থাক! এর প্রাণটা বেঘোরে গেল। (কোন বদলা নেয়া ছাড়া অনর্থক প্রাণ বিসর্জিত হল)। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৬৩, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১০৩, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং-১১৯৮৪, বুলুগুল মারাম, হাদীস নং-১২০৪}
----------------------------------------------------------
হাশরের ময়দানের বিচারকার্য সমাধা হওয়ার আগেই কবরে আযাব হবে কেন?
প্রশ্ন
বিচারকার্য সমাধা হবার আগেই কবরে আজাব হবে কেন? এটিতো বিচার হবার আগেই শাস্তির সমতূল্য। এটি কতটুকু যৌক্তিক?
উত্তর
কবরের আজাব এটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সত্য।
এখন প্রশ্ন হল বিচার হবার আগে শাস্তি কেন? এর ৩টি জবাব হতে পারে-
১.দুনিয়াতে ব্যক্তি ভাল মন্দ কাজ করার দ্বারাই উক্ত ব্যক্তির পরিণাম নির্দিষ্ট হয়ে যায়। ভাল কাজ করে থাকলে আরামের আর মন্দ কাজ করে থাকলে শাস্তির অধিকারী হয়ে যায়।
সেই হিসেবে কবরে গমণ করার দ্বারা দুনিয়াতে করা কৃতকর্মের শাস্তি পাওয়া এটি কোন অযৌক্তিক বিষয় নয়।
২.এটি আসলে মূল শাস্তি নয়। বরং দুনিয়াতে যেমন ফাঁসি বা অন্যান্য শাস্তি প্রদান করার আগে ব্যক্তিকে কয়েদ করে রাখা হয়, যা এক প্রকার শাস্তি। কবরের আজাবও তেমনি। মূল শাস্তির আগে লঘু শাস্তি প্রদান করা হয়। এটি দোষণীয় নয়।
৩.এটি বান্দার উপকারের জন্য করা হয়। হাশরের ময়দানের ফায়সালার পর যে শাস্তি রয়েছে তা খুবই ভয়াবহ। সেই তুলনায় কবরের শাস্তি কিছুই নয়।
দুনিয়াতে যেমন আল্লাহ তাআলা কোন বান্দাকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করার জান্য মাঝে, মাঝে বিপদে ফেলেন, কষ্ট দেন, এর দ্বারা উক্ত ব্যক্তির গোনাহ মাফ হয়। সে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়। তেমনি কিছু বান্দার কবরে আজাব হবার দ্বারা তার গোনাহগুলো আল্লাহ মাফ করে দিবেন। হাশরের ময়দানে উক্ত ব্যক্তি গোনাহহীন অবস্থায় উঠবে। তারপর সে শাস্তি পাওয়া ছাড়াই জান্নাতের অধিকারী হয়ে যাবে। তাই কবরের আজাব গোনাহগারের জন্য খারাপ নয় মঙ্গলের জন্যই নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া আরো যৌক্তিক জবাব হতে পারে।
তবে সব যুক্তির বিপরীতে মূল কথা হল, গ্রহণযোগ্য দ্বারা উক্ত বিষয়টি প্রমাণিত। তাই এর উপর ঈমান আনা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَبْرَيْنِ، فَقَالَ: ” إِنَّهُمَالَيُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا: فَكَانَ لَا يَسْتَنْزِهُ مِنَ البَوْلِ – قَالَ وَكِيعٌ: مِنْ بَوْلِهِ – وَأَمَّا الْآخَرُ: فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ “.
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূল সাঃ দু’টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম হচ্ছিলেন। বললেন, এ দু’টি কবরে আযাব হচ্ছে। কোন বড় কারণে আজাব হচ্ছে না। একজনের কবরে আজাব হচ্ছে সে পেশাব থেকে ভাল করে ইস্তিঞ্জা করতো না। আরেকজন চোগোলখুরী করতো। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৮০, বুখারী, হাদীস নং-১৩৬১}
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدْعُو وَيَقُولُ: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ، وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ، وَمِنْ فِتْنَةِ المَحْيَا وَالمَمَاتِ، وَمِنْ فِتْنَةِ المَسِيحِ الدَّجَّالِ»
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ দুআ করে বলতেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই। জাহান্নামের আজাব থেকে আশ্রয় চাই। জীবিত ও মৃত ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। {বুখারী, হাদীস নং-১৩৭৭}
---------------------------------------------------------
বুখারীর হাদীসে কি অর্থে নারীদের অপয়া বলা হয়েছে?
প্রশ্ন
আমি বুখারী শরীফের একটি হাদীসের ব্যাখ্যা জানতে চাই। যেখানে বলা হয়েছে যে, নারীদের ভিতর অলক্ষুনে বা অপায়া থাকতে পারে। অলুক্ষুনে বলতে কি বুঝায়? কিভাবে বুঝবো কোন মেয়ে অলুক্ষুন কি না? দয়া করে একটু বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর
আমরা প্রথমে এ বিষয়ক হাদীসগুলো দেখে নেই।
ইমাম বুখারী রহঃ তার বুখারীতে শিরোনাম কায়েম করেছেন
بَابُ مَا يُتَّقَى مِنْ شُؤْمِ المَرْأَةِ
তথা অশুভ স্ত্রীলোকদের থেকে দূরে থাকা।
তারপর কুরআনে কারীমের আয়াত এনেছেন-
وَقَوْلِهِ تَعَالَى: {إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلاَدِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ} [التغابن: 14]
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীগণ এবং সন্তান সন্তুতিদের মাঝে তোমাদের শত্রু রয়েছে। {সূরা তাগাবুন-১৪}
এরপর তিনি হাদীস এনেছেন-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الشُّؤْمُ فِي المَرْأَةِ، وَالدَّارِ، وَالفَرَسِ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রী, বাড়িঘর এবং ঘোড়ার মাঝে অশুভের লক্ষণ আছে। {বুখারী, হাদীস নং-৫০৯৩}
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: ذَكَرُوا الشُّؤْمَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ كَانَ الشُّؤْمُ فِي شَيْءٍ فَفِي الدَّارِ، وَالمَرْأَةِ، وَالفَرَسِ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ এর কাছে লোকেরা অশুভ স্ত্রীলোক সম্পর্কে আলোচনা করলে তিনি বলেন, কোন কিছুর মধ্যে যদি অপয়া থাকে, তা হলো বাড়ি ঘর, স্ত্রীলোক এবং ঘোড়া। {বুখারী, হাদীস নং-৫০৯৪}
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ»
হযরত উসামা বিন জায়েদ রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ বলেন, পুরুষের উপরে মেয়েলোকের অপেক্ষা অন্য কোন বড় ফিতনা আমি রেখে গেলাম না।{বুখারী, হাদীস নং-৫০৯৬}
বুখারীর শিরোনাম তারপর কুরআনের আয়াত এবং উপরে দেয়া তিনটি হাদীস একত্রে দেখলে পরিস্কার হয়ে যায় আসলে মহিলাদের অপয়া এবং অশুভ লক্ষণ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?
শেষ হাদীসটিতে দেখুন। রাসূল সাঃ বলেছেন, পুরুষদের উপর সবচে’ বড় ফিতনা হল নারী।
এ নারীর কারণেই মানুষ খুনের মত ঘটনা ঘটায়। বাড়ি ঘর ছেড়ে দেয়। পিতা-মাতার অবাধ্য হয়। অনেকে অবৈধ উপায়ে উপার্জন করে। মিথ্যা বলে। গোনাহে লিপ্ত হয়। জিনায় লিপ্ত হয়।
তাহলে যে নারীর কারণে মানুষ গোনাহে প্রলুব্ধ হয় কেবল সেই নারীই অপয়া এবং অলুক্ষুণে। সকল নারী নয়।
ঘোড়াকেও অলুক্ষুণে বলা হয়েছে। অথচ ঘোড়া দিয়ে জিহাদ করা হয়। রাসূল সাঃ নিজেও ঘোড়ার পিঠে চড়েছেন। তাহলে এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য হল যে ঘোড়া দিয়ে দ্বীনী বা দুনিয়াবী কোন কাজ করা যায় না, তাই অপয়া এবং অলুক্ষূনে ঘোড়া।
ঘরবাড়িকেও অলুক্ষুনে বলা হয়েছে। এর মানে হল, যে ঘর নির্মানের লোভ মানুষকে অসৎ পথে উপার্জন করতে প্রলুব্ধ করে সেটিই অপয়া এবং অলুক্ষুনে ঘর।
মোটকথা, আমাদের সমাজে প্রচলিত অলুক্ষনে বা অপয়া পরিভাষা হাদীসে উদ্দিষ্ট নয়। আমাদের সামাজিক পরিভাষায় অপয়া বা অলুক্ষুনে বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যার দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয়। যাকে দেখলে মানুষের ধ্বংস নেমে আসে। এমন আকিদা রাখা জায়েজ নেই। কোন ব্যক্তিই আমাদের পরিভাষায় যে অপয়া বা অলুক্ষুনে বলা হয় সেই অপয়া বা অলুক্ষুনে নয়।
হাদীসে যে অপয়া বা অলুক্ষুনের কথা বলা হয়েছে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল যার মাধ্যমে গোনাহে লিপ্ত হয় মানুষ। যার কারণে মানুষ গোনাহ করতে প্রলুব্ধ হয়।
হাদীসের দ্বারা কোন নারী অপয়া প্রমাণিত?
যে নারী স্বামীকে গোনাহ করতে প্রলুব্ধ করে। দ্বীন পালন করতে বাঁধা দেয়। হারাম উপার্জন করতে বাধ্য করে। স্বামীর হক আদায় করে না। স্বামী ও পরিবারের হক আদায় করে না।
এমন নাফরমান ও অবাধ্য নারী হল হাদীসের বক্তব্য অনুপাতে অপয়া বা অলুক্ষুনে।
এমন নাফরমান ও অবাধ্য নারী না হয়ে ভাল ও সাধ্বী নারী কিছুতেই অপয়া বা অলুক্ষুনে নয়।
রাসূল সাঃ অনেক স্থানে নারী জাতির প্রশংসা করেছেন। নারীর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত বলেছেন। যার পায়ের নিচে বেহেশত সে কি করে অপয়া হতে পারে?
তাছাড়া স্ত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার, উত্তম আচরণ করতে রাসূল সাঃ পরিস্কার ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, কোন মুমিন পুরুষ যেন কোন মুমিন নারীকে শত্রু মনে না করে। কেননা, যদি সে তার এক কাজকে নাপছন্দ করে, তার অপর কাজকে পছন্দ করবে। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৮৩৬৩}
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ مِنْ أَكْمَلِ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا، أَحْسَنَهُمْ خُلُقًا، وَأَلْطَفَهُمْ بِأَهْلِهِ
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিকতর পূর্ণ মুমিন, যে ব্যক্তি সদাচারী এবং নিজ পরিবারের জন্য কোমল এবং অনুগ্রহশীল। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৬১২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪২০৪}
আমাদের সমাজে যাকে অলুক্ষুনে বা অপয়া বলা হয়। সেই বিশ্বাস জায়েজ নয়। এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস দেখা যেতে পারে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «لَا عَدْوَى، وَلَا طَيْرَةَ،
হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, সংক্রামক ব্যাধি এবং কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। {মুসনাদুল হুমায়দী, হাদীস নং-১১৫০, বুখারী, হাদীস নং-৫৭০৭}
عَنْ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” الطِّيَرَةُ شِرْكٌ وَمَا مِنَّا إِلَّا، وَلَكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, অলক্ষী বা কুলক্ষণ মনে করা শিরক। এটি আমাদের আকিদা নয়। তবে কারো মনে এরূপ দুর্ভাবনার উদয় হলে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করলে তা দূরিভূত হয়ে যাবে। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৩৬৮৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৫৩৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৯১০}
এ সকল হাদীস একথাই প্রমাণ করছে যে, আসলে নারীদের মাঝে মূলত আমাদের সমাজের প্রচলিত কুলক্ষণ বিশ্বাস করা জায়েজ নয়। হাদীসে কুলক্ষণ বলতে বুঝানো হয়েছে। যে নারীর কারণে সংসারে অশান্তি আসে। যার কারণে পরিবারে ধর্মপালন কষ্টকর হয়ে যায়। যার কারণে স্বামী গোনাহের কাজ করতে বাধ্য হয়। যার কারণে সমাজের যুবকরা খারাপ কাজে লিপ্ত হয়। লম্পট হয়। স্বামী হারাম উপার্জন করতে বাধ্য হয়। এমন নারীকে হাদীসে অপয়া এবং অলুক্ষুনে বলা হয়েছে। সকল নারীকে নয়।
---------------------------------------------------------
হিজড়াদের বিষয়ে ইসলামী শরীয়তে কোন বিধান নেই?
প্রশ্ন
হিজড়াদের কি কোন ধর্ম আছে ?
ইসলাম ধর্মে হিজড়াদের ধর্ম পালন বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী কি??
হাশরের মাঠে পুরুষ রা এক দিকে বসবে আর মহিলারা আর এক দিকে বসবে, তবে হিজড়াদের ব্যাপারে কিছু বলা নাই। হিজড়াদের ব্যাপারে কোরআনের কোন আয়াত বা হদিস আছে কিনা ?? আমি আসলে নবী (সাঃ) এবং আল্লাহর এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট বানী শুনতে চাচ্ছিলাম।
উত্তর
হিজড়া সম্প্রদায় আল্লাহ তাআলারই বান্দা বা বান্দি। তারা আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি। তারাও আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব।
তাদের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তারাও মানুষ। আমাদের মতই মানুষ। তবে যেমন অনেক মানুষের শারিরিক ত্রুটি থাকে। এটিও তাদের তেমনি একটি ত্রুটি। এ ত্রুটির কারণে উক্ত ব্যক্তি মনুষত্ব থেকে বেরিয়ে যায় না। বরং অন্যান্য প্রতিবন্ধিদের মতই তারা আরো বেশি স্নেহ, মমতা ও ভালবাসা পাবার অধিকার রাখে। তাদের ঘৃণা নয় ভালবাসা ও স্নেহ দিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচতে দেয়া উচিত। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, খারাপ মন্তব্য করা মারাত্মক গোনাহের কাজ। যেকোন মুসলমানকে গালি দেয়া যেমন পাপ তাদের গালি দেয়া তার চেয়ে বেশি পাপ। কোন মুসলমানকে তাচ্ছিল্য করা যেমন পাপ তাদেরকে তাচ্ছিল্য করা এর চেয়ে কম পাপ নয় বরং আরো বেশি পাপ। কারণ তাদের এ দুর্বলতার কারণে তাদের ঠাট্টা করা মানে হল আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকে ঠাট্টা করা। আল্লাহর সৃষ্টিকে হাসি তামাশার বিষয় বানানো। তাই এটি খুবই গর্হিত গোনাহের কাজ।
মৌলিকভাবে ইসলামে পুরুষ ও নারীকেই গণ্য করে থাকে। আর যারা উভলিঙ্গ হয়ে থাকেন তারাও মূলত হয় নারী হোন বা পুরুষ হয়ে থাকেন। তাই তাদের ব্যাপারে আলাদা কোন বিধান আরোপ করা হয়নি। যে উভলিঙ্গের অধিকারী ব্যক্তির মাঝে যেটি বেশি থাকবে, তিনি সেই প্রজাতির অন্তর্ভূক্ত হবেন। তাই তাদের ব্যাপারে আলাদা কোন বিধান আরোপ হবার প্রয়োজনই।
أن عليا رضي الله عنه : سئل عن المولود لا يدري أرجل أم امرأة فقال علي رضي الله عنه يورث من حيث يبول
হযরত আলী রাঃ কে এমন বাচ্চা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যার ছেলে বা মেয়ে হওয়া পরিস্কার নয়। তখন হযরত আলী রাঃ বললেন, সে যেভাবে পেশাব করে সে হিসেবে মিরাস পাবে। {সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১২৯৪, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৩০৪০৩, মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-১৯২০৪}
হিজড়াদের ক্ষেত্রে বিধান হল তাদের নারী বা পুরুষের যে কোন একটি ক্যাটাগরিতে ফেলতে হবে। রাসূল সাঃ এ ব্যাপারে একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেটা হল, দেখতে হবে হিজড়ার প্রস্রাব করার অঙ্গটি কেমন? সে কি পুরুষদের গোপনাঙ্গ দিয়ে প্রস্রাব করে? না নারীদের মত গোপনাঙ্গ দিয়ে প্রস্রাব করে? গোপনাঙ্গ যাদের মত হবে হুকুম তাদের মতই হবে। অর্থাৎ গোপনাঙ্গ যদি পুরুষালী হয়, তাহলে পুরুষ। যদি নারীর মত হয়, তাহলে নারী। আর যদি কোনটিই বুঝা না যায়। তাহলে তাকে নারী হিসেবে গণ্য করা হবে। সেই হিসেবেই তাদের উপর শরয়ী বিধান আরোপিত হবে।
সুতরাং ইসলামে হিজড়াদের ব্যাপারে কিছু বলা নাই বলাটা মুর্খতা বৈ কিছু নয়।
---------------------------------------------------------
কুরআন দ্বারা কি পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রমাণিত?
প্রশ্ন
কতিপয় আহলে কুরআন দাবি করেন নামায ২ ওয়াক্ত। শুধু কুরআন দিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামায প্রমাণ করা যাবে?
উত্তর
পবিত্র কুরআন দ্বারাও ৫ ওয়াক্ত নামায প্রমাণিত। দুই নামাযের কথা কোথাও বলা হয়নি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
فَسُبْحَانَ اللَّهِ حِينَ تُمْسُونَ وَحِينَ تُصْبِحُونَ (17) وَلَهُ الْحَمْدُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَعَشِيًّا وَحِينَ تُظْهِرُونَ (18)
অনুবাদ- সুতরাং তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা কর সন্ধ্যায় [মাগরিব ও ইশার নামায দ্বারা] ও প্রভাতে [ফজর নামায দ্বারা] এবং অপরাহ্নে [আসরের নামাযের দ্বারা] ও যোহরের [যোহরের নামায দ্বারা] সময়। আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সকল প্রশংসা তো তাঁরই। {সূরা রূম-১৭-১৮}
সূরা রূমের উক্ত আয়াতে একই সাথে ৫ ওয়াক্ত নামাযের সময় আল্লাহর পবিত্র ও মহিমা প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর পবিত্রতা ও মহিমা প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম যে নামায একথা সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। {তাফসীরে রূহুল মাআনী-৮/২৯, মাআরিফুল কুরআন-৬ খন্ড, ২১ পারা, পৃষ্ঠা- ৪০)
সুতরাং একথা বলা যে, কুরআনে শুধু দুই ওয়াক্ত নামাযের কথা আছে। তাই নামায কেবল দুই ওয়াক্তই ফরজ। তা দ্বীনে ইসলাম অস্বিকারকারী কাফেরের বক্তব্য হতে পারে। কোন মুসলিমের হতে পারে না। যদি কোন মুসলমান এ দাবি করে তাহলে সে সুনিশ্চিতভাবে কাফের হয়ে যাবে।
যদি কুরআনে ৫ ওয়াক্ত নামাযের কথা বলা নাও হতো, তবু নামায ৫ ওয়াক্তই ফরজ বলতে হবে মুসলমানদের। কারণ রাসূল সাঃ থেকে বর্ণিত হাদীসে পরিস্কার ভাষায় নামায ৫ ওয়াক্ত হওয়ার কথা এসেছে। রাসূল সাঃ থেকে বর্ণিত হাদীস অস্বিকারকারী কাফের। কারণ রাসূল সাঃ এর কথাকে মানার নির্দেশ খোদ আল্লাহ তাআলাই দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে। তাই রাসূল সাঃ এর কথা মানা মানে কুরআন মানা। তাঁর কথা অস্বিকার করা মানে কুরআন অস্বিকার করা।
হাদীস অস্বিকারকারী কাফের। এতে কোন সন্দেহ নেই। পবিত্র কুরআন পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে রাসূল সাঃ যা এনেছেন, যা বলেছেন তা মানতে। আর যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে। আর রাসূল সাঃ এর কথা আমল সবই হাদীসে বর্ণিত। সুতরাং রাসূল সাঃ কে মানা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। তাই রাসূল সাঃ কে অস্বিকার করা, তার কথাকে অস্বিকার করা মানে কুরআনের নির্দেশকেই অস্বিকার করা। সুতরাং নাম আহলে কুরআন রাখলেও আসলে তারা কুরআন অস্বিকারকারী। আর কুরআন ও হাদীস অস্বিকারকারী কাফের এতে কোন সন্দেহ নেই।
রাসূল সাঃ বলেন, সবই মূলত আল্লাহ তাআলার বাণী। তবে যদি হুবহু আল্লাহর শব্দে নবীজী সাঃ বর্ণনা করেন, তাহলে উক্ত শব্দকে বলা হয় কুরআন। আর যদি বক্তব্য ঠিক রেখে নিজের পক্ষ থেকে শব্দ দিয়ে বলেন, তাহলে উক্ত বক্তব্যের নাম হয় হাদীস। কুরআন ও আল্লাহর বাণী। আবার হাদীসও মূলত আল্লাহর বাণী। শুধু পার্থক্য শব্দে। শব্দ আল্লাহর হলে কুরআন। আর বক্তব্য আল্লাহর আর শব্দ নবীর হলে তার নাম হাদীস। একথাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (4
তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলেন না, তবে তিনি তা’ই বলেন, যা তাকে আল্লাহ তাআলার জন্য প্রত্যাদেশ দিয়েছেন। {সূরা নাজম-৩-৪}
এ আয়াত পরিস্কার জানাচ্ছে যে, কুরআনও আল্লাহর বাণী এবং রাসূল সাঃ এর হাদীস ও আল্লাহর বাণী।
রাসূল সাঃ এর আদেশ নিষেধ অমান্য করে বা অস্বিকার করে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ (7
রাসূল সাঃ যা নিয়ে এসেছেন তা আঁকড়ে ধর, এবং যা থেকে বারণ করেন তা ছেড়ে দাও। আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রচন্ড শাস্তিদাতা। {সূরা হাশর-৭}
আরো ইরশাদ হচ্ছে- قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (31)
আপনি বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাহলে আমাকে [মুহাম্মদ সাঃ] অনুসরণ কর। তাহলেই আল্লাহ তাআলা তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু। {সূরা আলে ইমরান-৩১}
এক আয়াত মেনে আরেক আয়াত অস্বিকার করা কাফেরের কাজ। কোন মুসলমান একাজ করতে পারে না। পবিত্র কুরআনের আরেক আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে-
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (85)
তোমরা কি কুরআনের কিছু অংশের উপর ঈমান আন এবং কিছু অংশকে অস্বিকার করছো? তোমাদের মাঝে যারা এরূপ করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, এবং আখেরাতে তাদের নিক্ষিপ্ত করা হবে ভয়াবহ শাস্তিতে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের কর্মকান্ড বিষয়ে অনবহিত নন। {সূরা বাকারা-৮৫}
সুতরাং পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে, পবিত্র কুরআনে রাসূল সাঃ এর অনুসরণ, রাসূল সাঃ এর কথা মানার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা অস্বিকারকারী কুরআন অস্বিকার করার কারণে কাফের হিসেবে জাহান্নামী হবে।
আহলে কুরআন মুসলমানদের কোন দল নয়। এটি নাস্তিক ও কাফেরদের একটি দল। সরলপ্রাণ মুসলমানগণ এ কুফরী দলকে মুসলিম দল মনে করে বিভ্রান্ত হবেন না। আল্লাহ তাআলা আমাদের নাস্তিক-মুরতাদ, কাফের ও নামধারী মুসলিমদের হাত থেকে উম্মতে মুসলিমাকে হিফাযত করুন। আমীন।
---------------------------------------------------------
একটি অযৌক্তিক প্রশ্নঃ আল্লাহ তাআলাকে কে সৃষ্টি করেছেন?
প্রশ্ন
নাস্তিকরা প্রশ্ন করে থাকে যে, আল্লাহ তাআলাকে কে সৃষ্টি করেছে? এর জবাব কি?
উত্তর
আল্লাহ তাআলা সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। সব কিছুর স্রষ্টা যিনি তাকে আবার কে সৃষ্টি করবে? এটাতো বোকামীসূলভ প্রশ্ন। কারণ সৃষ্টি জগতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন। তিনি সব কিছুর স্রষ্টা যখন, তখন তার আগেতো কেউ নেই। তাহলে তাঁকে কেউ সৃষ্টি করবে কিভাবে? তাকে সৃষ্টির প্রশ্ন করাটাইতো অবান্তর প্রশ্ন।
আল্লাহ তাআলা সব কিছুর স্রষ্টা
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى [٨٧:١]الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ [٨٧:٢]وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ [٨٧:٣
আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন। {সূরা আলা-১-৩}
وَتَرَى الْجِبَالَ تَحْسَبُهَا جَامِدَةً وَهِيَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ ۚ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ ۚ إِنَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَفْعَلُونَ [٢٧:٨٨
তুমি পর্বতমালাকে দেখে অচল মনে কর,অথচ সেদিন এগুলো মেঘমালার মত চলমান হবে। এটা আল্লাহর কারিগরী,যিনি সবকিছুকে করেছেন সুসংহত। তোমরা যা কিছু করছ,তিনি তা অবগত আছেন। {সূরা আননমল-৮৮}
قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ [٢٠:٥٠
মূসা বললেনঃ আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন। {সূরা ত্বহা-৫০}
আল্লাহ তাআলাকে কে সৃষ্টি করেছেন? প্রশ্নটি স্ববিরোধী প্রশ্ন
আল্লাহ তাআলা স্রষ্টা। যিনি স্রষ্টা তিনি যদি সৃষ্টি হন, তাহলে মৌলিক স্রষ্টাতো আর তিনি বাকিই থাকেন না। কারণ তখন তাঁকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি হয়ে যাচ্ছেন মূল স্রষ্টা। এক্ষেত্রেতো আল্লাহ তাআলা মূল স্রষ্টা হিসেবে আর বাকি থাকবেন না। তাই আল্লাহ তাআলাকে স্রষ্টা মানার পর তাঁর স্রষ্টা কে? এ প্রশ্ন করাটাই অযৌক্তিক ও বোকামী।
এছাড়া এ প্রশ্ন করার দ্বারা ক্রমান্বয়িক অসীম প্রশ্নধারার পথ খোলা হয়। যার কোন শেষ কোনদিন হবে না। কারণ যদি বলা হয় যে, আল্লাহর স্রষ্টা ওমুক [নাউজুবিল্লাহ]।
তাহলে আবার প্রশ্ন হবে- ওমুকের স্রষ্টা কে? যদি কারো নাম উচ্চারণ করা হয়, তাহলে আবার প্রশ্ন আসবে- ওমুকের স্রষ্টা কে? এভাবে ক্রমধারায় অসীম প্রশ্নের দ্বার উন্মোচিত হবে। যার কোন সীমা-পরিসীমা আর বাকি থাকবে না। চলতেই থাকবে এ প্রশ্ন। তাই এরকম প্রশ্ন অযৌক্তিক ও বোকামীসূলভ প্রশ্ন।
এ প্রশ্নটি শয়তানের প্রশ্ন
قال أبو هريرة رضي الله عنه : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ( يأتي الشيطان أحدكم فيقول من خلق كذا من خلق كذا حتى يقول من خلق ربك ؟ فإذا بلغه فليستعذ بالله ولينته
হযতর আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কারো কাছে শয়তান আসতে পারে, এবং সে বলতে পারে যে, এ বস্তু কে সৃষ্টি করেছে? ঐ বস্তু কে সৃষ্টি করেছে? এরূপ প্রশ্ন করতে করতে শেষ পর্যন্ত বলে বসবে, তোমাদের প্রতিপালককে কে সৃষ্টি করেছে? যখন বিষয়টি এ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে তখন সে যেন অবশ্যই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং বিরত থাকে। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩১০২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩৬২, মুসনাদে আবী আওয়ানা, হাদীস নং-২৩৬}
عن عائشة عن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال : إن الشيطان يأتي أحدكم فيقول : من خلق السماوات ؟ فيقول : الله فيقول : من خلق الأرض ؟ فيقول : الله فيقول : من خلق الله ؟ فإذا كان ذلك فليقل : آمنت بالله ورسله
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কারো কাছে শয়তান এসে বলতে পারে- আসমানসমূহ কে সৃষ্টি করেছে? সে বলবে, আল্লাহ। তারপর শয়তান প্রশ্ন করবে- জমীন কে সৃষ্টি করেছে? জবাবে সে বলবে-আল্লাহ তাআলা। তারপর শয়তান বলবে- আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন বিষয়টি এ পর্যন্ত এসে যাবে তাহলে বলবে- আমি আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। {মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-৪৭০৪, মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বল, হাদীস নং-২১৯১৬, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ,হাদীস নং-২১৫, আলমুজামুল কাবীর, হাদীস নং-৩৭১৯}
---------------------------------------------------------
এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আক্বিদার লোকদের আরো কতিপয় প্রশ্ন- উত্তর দেখা যাক—
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনেকগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন?
সাধারণ মুসলিমের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়, তা হলো – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন? সাধারণ মুসলিম পুরুষ না ৪টার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? –বর্তমান সময় যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব। কিন্তু সেই উত্তরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকার অবতারণা করতে হচ্ছে।
উত্তর বুঝার প্রি-রিকুইসিট জ্ঞান:
আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হত না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।
বলুন, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। যার উপর প্রত্যাদেশ হয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্, তাই তাঁরই পথ অবলম্বন করো এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো”। (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৬)
আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারতেন, আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর (ﷻ) বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর (ﷻ) হুকুম মেনে চলেছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (বা যে কোন মানুষের) যে কোন কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে –
এক – যদি তা আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্ যদি কোন কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।
দুই – যদি কাজটি ঐ সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ,রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির (worldly affairs) ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)
উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর (ﷻ) কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বহুবিবাহ নিয়ে কোন মুসলিমের আপত্তি থাকবে না। আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহু বিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোন মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমার বাইরে।
এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে – মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।
উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।
প্রশ্ন- ইসলামের যেখানে ১জন পুরুষের জন্য ৪জন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে, সেখানে মুহাম্মাদ (ﷺ) কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেন? তাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ১১জন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে ৯ জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিল (বাকী ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)। তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে উম্মাহাতুল মু’মিনীন (ঈমানদারদের মাতা) বলে থাকি।
যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আল্লাহ্ চার এর বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে।
হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনি দেনমোহর দিয়েছেন … আর কোন ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদন করলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ। আর এ শুধু আপনারই জন্য, বাকী মুমিনদের জন্য নয়। [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দেয়ার কারণ কি? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাকে সুবিধা কিছু দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পড়ে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোক না কেন যাকাত নিতে পারবে না। এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল। অথচ বহুবিবাহ করা আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন। আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেন নি।
সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়
বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে / মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেহেতু আরবদের ৩ হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তার জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর (ﷺ) জন্য কোন সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।
নিচে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হল।
| | স্ত্রীর নাম | বিয়ের মূল কারণ | বিয়ের সাল | মন্তব্য |
| ১ | খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা) | সাধারণ সামাজিক বিয়ে | নবুয়তের ১০ম বছর | খাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে। খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র বয়স ছিল ৫০ বছর। তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন। |
| ২ | সাওদা বিনতে জাম’আ (রা) | সাধারণ সামাজিক বিয়ে | নবুয়তের ১০ম বছর | রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। |
| ৩ | আইশা (রা) বিনতে আবু বকর (রা) | সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন।এছাড়াও এতে আল্লাহর (ﷻ) পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি) | বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১ তম বছর। একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী | রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি রাসূলুল্লাহর (ﷺ) একমাত্র কুমারী স্ত্রী। |
| ৪ | হাফসা (রা) বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) | বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন | ৩য় হিজরী | এটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে। আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন। |
| ৫ | যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রা) | যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন | ৪র্থ হিজরী | এটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
|
| ৬ | উম্মে সালামা (রা) অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া | উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার | ৫ম হিজরী | এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। |
| ৭ | যাইনাব বিনতে জাহশ (রা) | আল্লাহর (ﷻ) নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা | ৫ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর (ﷺ) ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি কোরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর (ﷻ) হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিয়েটা করেন। |
| ৮ | যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা) | বানুল মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন | ৫ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানুল মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন। এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানুল মুস্তালিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
|
| ৯ | উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা) অন্য নাম: রামলা | কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ | ৭ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে। |
| ১০ | সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা) | ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন | ৭ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন ও এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোন জাতিগত বিদ্বেষ নেই। |
| ১১ | মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস(রা) ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ | চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন | ৮ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে। এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায় দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।
|
উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) তাঁর বিয়েগুলো যে সব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোন বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ, কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য। আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি (ﷺ) যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।
সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।” এভাবে করে বিয়ে কনসুমেট (স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে থাকা) করার আগেই রাসূলুল্লাহ উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ কে অপদস্থ করার জন্য কাফেররা মহিলাটাকে দিয়ে এরকম করিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলোতে এরকমও পাওয়া যায় যে এই মহিলা তার বাকী জীবন রাসূলুল্লার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আফসোস করতে করতে কাটিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জোর করে কোন স্ত্রীকে ধরে রাখেন নাই
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তো জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেন নাই। বরং, তাঁর যে কোন স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও বিলাসিতা কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই। আর তোমরা যদি আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্ম করে আল্লাহ্ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন”। (সূরা আহযাব ৩৩:২৮–২৯)
হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানই নি বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কতটা মহৎ ছিলেন।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর বিয়ে করেন নাই
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ৭টি বিয়েই হয়েছে ৩য় থেকে ৮ম হিজরীর সময়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, এই সময় এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশ বিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেঁচেছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরির হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্ নিজেই সূরা ফাতহ তে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোন বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি ঐ শেষের ২ বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।
তথ্য সূত্র:
১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার
২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই
৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই
৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস
--------------------------------------------------
অনেকের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়। তা হলো: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতগুলো বিয়ে করতে গিয়েছিলেন কেন? মুসলিম পুরুষ না চারটার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? বর্তমান সময়ে যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব।
তবে, তার আগে …
মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি কথা:
আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ ﷺ নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হতো না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:

(হে মুহাম্মাদ! মানুষকে) বলুন, “আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, যার উপর প্রত্যাদেশ হয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্। তাই তাঁরই পথ অবলম্বন কর এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর”। … [সূরা ফুসসিলাত ৪১:৬]
আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন; আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর (ﷻ) বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর (ﷻ) হুকুম মেনে চলেছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (বা যেকোনো মানুষের) যেকোনো কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে:
এক – যদি তা আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্ যদি কোনো কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।
দুই – যদি কাজটি ওই সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ, রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ (worldly affairs) যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)
উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর (ﷻ) কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বহুবিবাহ নিয়ে কোনো মুসলিমের আপত্তি থাকবে না। আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহুবিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোনো মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর (ﷻ) দেয়া সীমার বাইরে।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে – মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।
উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।
প্রশ্ন: ইসলামে যেখানে একজন পুরুষের জন্য চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে, সেখানে মুহাম্মাদ (ﷺ) কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেন? তাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?
উত্তর:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ১১জন স্ত্রী ছিলেন, যার মধ্যে নয়জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিলেন (বাকী দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল)। তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে “উম্মাহাতুল মু’মিনীন” (অর্থাৎ, বিশ্বাসীদের মাতা) বলে থাকি।
যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আল্লাহ্ চারের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে:

হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনিদেনমোহর দিয়েছেন … আর কোনো ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদন করলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ। আর এ শুধু আপনারই জন্য, বাকী মুমিনদের জন্য নয়। … [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দেয়ার কারণ কী? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –
১ — রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল যে
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাঁকে কিছু সুবিধা দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পরে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোন না কেন যাকাত নিতে পারবেন না। এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।
২ — রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিলেন। অথচ, বহুবিবাহ আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন। আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তাঁর জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেননি।
৩ — সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়
বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে বা মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেহেতু আরবদের তিন হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের মাধ্যমে প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তাঁর জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর (ﷺ) জন্য কোনো সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।
নিচে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হলো:
| | স্ত্রীর নাম | বিয়ের মূল কারণ | বিয়ের সাল | মন্তব্য |
| ১ | খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ | সাধারণ সামাজিক বিয়ে | নবুয়ত প্রাপ্তির ১৫ বছর পূর্বে | খাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে।খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র বয়স ছিল ৫০ বছর। তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন। |
| ২ | সাওদা বিনতে জাম’আ | সাধারণ সামাজিক বিয়ে | নবুয়তের ১০ম বছর | রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। |
| ৩ | আইশা বিনতে আবু বকর | সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন। এছাড়াও এতে আল্লাহর ﷻ পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি) | বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১তম বছর।একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী | রাসূলুল্লাহ (ﷺ)র খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী। তিনি রাসূলুল্লাহর (ﷺ) একমাত্র কুমারী স্ত্রী। |
| ৪ | হাফসা বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব | বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন | ৩য় হিজরী | এটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে। আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন। |
| ৫ | যাইনাব বিনতে খুযাইমা | যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন | ৪র্থ হিজরী | এটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
|
| উম্মে সালামা [অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া] | উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার | ৫ম হিজরী | এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। |
| ৭ | যাইনাব বিনতে জাহশ | আল্লাহর (ﷻ) নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা | ৫ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর (ﷺ) ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যদি কুরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর (ﷻ) হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বিয়েটা করেন। |
| ৮ | যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস | বানু-আল-মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন | ৫ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানু-আল-মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন। এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানু-আল- মুস্তালিক গোত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
|
| ৯ | উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান [অন্য নাম: রামলা] | কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ | ৭ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে। |
| ১০ | সাফিয়া বিনতে হুয়াই | ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন | ৭ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন এবং এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোনো জাতিগত বিদ্বেষ নেই। |
| ১১ | মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস [ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ] | চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন | ৮ম হিজরী | এটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে। এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায় দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।
|
উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর বিয়েগুলো যেসব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোনো বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ়করণ, কোনো গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছেন তাঁকে সম্মানিত করার জন্য। আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।
৪ — রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি (ﷺ) যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।
সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।” শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার আগেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন।
৫ — রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জোর করে কোনো স্ত্রীকে ধরে রাখেননি
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেননি। বরং, তাঁর যেকোনো স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।


হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও বিলাসিতা কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসেরব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই। আর তোমরা যদি আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে আল্লাহ্ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন”। [সূরা আহযাব ৩৩:২৮–২৯]
হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানইনি, বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কতটা মহৎ ছিলেন।
৬ — ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর তিনি আর বিয়ে করেননি
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাতটি বিয়েই হয়েছে তৃতীয় থেকে অষ্টম হিজরীর মধ্যে। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, ওই সময়কার এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশবিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেঁচে ছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরীর হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্ নিজেই সূরা ফাতহ-এ হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোনো বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি শেষের ওই দুই বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।
***
তথ্য সূত্র:
১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার
২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই
৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই
৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস
--------------------------------------------------
Comments
Post a Comment